রাজাকার বাহিনীর 'প্রতিষ্ঠাতা' ইউসুফের মৃত্যু

এ কে এম ইউসুফ
এ কে এম ইউসুফ

মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ কে এম ইউসুফ (৮৯) গতকাল রোববার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত ইউসুফ হূদেরাগ ও বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন।
ইউসুফের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটির বিচারকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলায় যুক্তি উপস্থাপন শুরুর দিন ধার্য রয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, যেহেতু মৃত্যুর পর কোনো ব্যক্তির বিচার হয় না, তাই হয়তো স্বাভাবিক নিয়মে মামলাটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
বিএসএমএমইউয়ের পরিচালক আবদুল মজিদ ভূঁইয়া জানান, গুরুতর হূদেরাগে আক্রান্ত অবস্থায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার (পার্ট-১) থেকে ইউসুফকে বিএসএমএমইউতে আনা হয়। তখন তাঁর রক্তচাপ ও নাড়ির স্পন্দন পাওয়া যাচ্ছিল না। হূদেরাগ বিভাগের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
এদিকে ইউসুফের চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করেন তাঁর জামাতা মেজর (অব.) আবদুল ওহাব ও আইনজীবী তাজুল ইসলাম। তাঁরা অভিযোগ করেন, একজন রোগী হিসেবে ইউসুফের যে ধরনের চিকিৎসা পাওয়ার কথা ছিল, তা তিনি পাননি। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা তাঁকে সিসিইউতে স্থানান্তর করতে বললেও সিসিইউ থেকে জানানো হয় সিট ফাঁকা নেই।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে আবদুল মজিদ ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা তাঁকে রিসিভ করেছি বেলা ১১টায়। আর তিনি মারা গেছেন সাড়ে ১১টায়। ৮৯ বছর বয়স্ক এক ব্যক্তি হূদেরাগে আক্রান্ত হলে কত সময় পাওয়া যায়? তাজুল ইসলামের অভিযোগ সঠিক নয়। সিসিইউতে নেওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়।’
দুপুরে ইউসুফের পরিবারের পক্ষে আইনজীবী গাজী তামিম মরদেহ ময়নাতদন্ত না করার জন্য ট্রাইব্যুনাল-২-এ আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল যথাযথ প্রক্রিয়া ও কারাবিধি মেনে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। আদেশে আরও বলা হয়, ইউসুফের মৃত্যুর যথাযথ ও বিস্তারিত কারণ ট্রাইব্যুনাল কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চান।
বিকেল চারটা ৪০ মিনিটে ইউসুফের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক মো. ফরমান আলী বলেন, কারাবন্দী অবস্থায় কোনো কয়েদির মৃত্যু হলে কারাবিধি অনুসারে তাঁর ময়নাতদন্ত করা হয়। যেহেতু ট্রাইব্যুনাল বিধি মেনে মরদেহ হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন, সেহেতু মরদেহ ময়নাতদন্ত করার পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যায় ইউসুফের ছেলে এ কে এম মাহবুবুর রহমানের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও কারা কর্তৃপক্ষ। পরে মরদেহ তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনে নেওয়া হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইউসুফের প্রবাসী পুত্র ও কন্যারা দেশে ফিরলে দাফনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ময়নাতদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইউসুফের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে, স্ট্রোক হলে এমন হয়। এ ছাড়া তাঁর পাকস্থলীর ভিসেরা পরীক্ষার জন্য মহাখালীর রাসায়নিক পরীক্ষাগারে এবং হূদ্যন্ত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজের পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।
ইউসুফ মারা যাওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলার কী হবে, জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি তুরিন আফরোজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের আইনে যেহেতু আসামির মৃত্যু হলে বা মরণোত্তর বিচার হয় না, তাই এই মামলাও হয়তো ক্লোজ (বন্ধ) করে দেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন ট্রাইব্যুনাল। যেহেতু এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে শুধু যুক্তি উপস্থাপন বাকি ছিল, তাই আদালত পর্যবেক্ষণ রেখে মামলা নিষ্পত্তি করতে পারেন।’
তুরিন আফরোজ বলেন, ‘যদিও আসামিপক্ষ বলছে, ইউসুফের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, তার পরও একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করে তাঁর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করা দরকার। না হলে এ নিয়ে দেশে-বিদেশে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হতে পারে।’
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১৩ সালের ১২ মে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইউসুফকে গ্রেপ্তার করলে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে কারাগারে পাঠান। ১ আগস্ট তাঁর বিরুদ্ধে গণহত্যার সাতটি, মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে হত্যার পাঁচটি ও নিপীড়নের একটিসহ মোট ১৩টি অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর রাষ্ট্রপক্ষে ২৭ জন ও আসামিপক্ষে একজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুসারে, বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার রাজৈর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী এ কে এম ইউসুফ ১৯৫২ সালে জামায়াতের রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের ডেপুটি আমির ছিলেন। একাত্তরে বৃহত্তর খুলনার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় তিনি ৯৬ জন জামায়াত সদস্য ও স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে খুলনার আনসার ও ভিডিপি ক্যাম্পে সর্বপ্রথম সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া তিনি একাত্তরের বিতর্কিত মালেক মন্ত্রিসভায় রাজস্ব, পূর্ত, বিদ্যুৎ ও সেচমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।