বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জানতে চাইলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী আবসার উদ্দীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে কিছু কাজ সময়মতো করা যায়নি। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মৌলিক ও প্রধান কাজগুলো শেষ হয়ে গেছে। কিছু আনুষঙ্গিক কাজ বাকি আছে। সেগুলো শেষ করে আমরা ২৬ মার্চ প্রথম ইউনিটটি চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছি।’

তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ফলে নতুন সময়সীমার মধ্যেও বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে মোট ১৬ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। এখান থেকে দুই ইউনিটে ৬৬০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কথা। প্রকল্পের মেয়াদকাল বাড়লেও এ জন্য নতুন করে আর বাজেট বাড়ানো হবে না বলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রাথমিকভাবে তিন লাখ টন কয়লা আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিআইএফপিসিএল। এ জন্য তারা ইন্দোনেশিয়া থেকে ওই কয়লা আনার জন্য প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। কিন্তু এরই মধ্যে গত সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়া আপাতত কয়লা রপ্তানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে রামপাল প্রকল্পের জন্য কয়লা আনা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে, যা টেকসই উন্নয়ন এবং পরিবেশ রক্ষায় সরকারের যে অঙ্গীকার আছে, তার সঙ্গে মেলে না।
সুলতানা কামাল, আহ্বায়ক, সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি

কাজী আবসার উদ্দীন আহমেদ অবশ্য দাবি করেন, ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আনা সম্ভব। এ জন্য তাঁরা প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। তবে এর বাইরেও দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকেও কয়লা আনার সুযোগ রয়েছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মূল অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (বিএইচইএল) নামের ভারতের একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা। ২০১০ সালে ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। ২০১২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় নির্মাণকাজ। পরিবেশবাদীরা শুরু থেকেই ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ নিয়ে বিরোধিতা করে আসছেন।

সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি এবং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, এই প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সাল থেকে জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো থেকে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে বলে অভিযোগ করা হয়।

তবে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলায় মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট (রামপাল) নামে ওই প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে সব সময় দাবি করা হচ্ছে।

সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক সুলতানা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতির বিষয়টি আমরা বিজ্ঞানীদের দিয়ে গবেষণা করে প্রমাণ করেছি। সরকারের কাছে তা তুলে ধরেছি। কিন্তু তারপরও এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে, যা টেকসই উন্নয়ন এবং পরিবেশ রক্ষায় সরকারের যে অঙ্গীকার আছে, তার সঙ্গে মেলে না।’

বিআইএফপিসিএলের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সর্বশেষ ২০১৯ সালের বার্ষিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে করা ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং ২০১৯ সালের জুলাই মাসের মাসিক প্রতিবেদন রয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন সেখানে নেই। ফলে এই প্রকল্পের নির্মাণ প্রায় শেষ হওয়ার আগে সুন্দরবন ও এর চারপাশে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা জানা যাচ্ছে না।

জানতে চাইলে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতা এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের শুরু থেকে ভুল তথ্য এবং লুকোচুরি চলছে। এ প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনের ক্ষতি এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু তার কোনো নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হচ্ছে না। ফলে এই প্রকল্প চালু করলে আরও ক্ষতির মুখে পড়বে সুন্দরবন ও বাংলাদেশ। দুই দেশই ভুল বুঝতে পেরে এই প্রকল্প থেকে সরে আসবে এবং সুন্দরবন রক্ষা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন