গত বছর ১৫ সেপ্টেম্বর চীনের সঙ্গে জিটুজি পদ্ধতির প্রকল্প নিয়ে ‘চড়া সুদের ঋণে উন্নয়ন, প্রকল্পে বিলাসী ব্যয়’ শিরোনামে প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গত অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যয় কমানোর অনুশাসন দেন। একই সঙ্গে তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ, সুপারিশসহ সার্বিক বিষয়ে যথাযথ পর্যালোচনা করে প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ বিধি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয় অনুশাসনে। এ–সংক্রান্ত চিঠি গত বছরের ৫ নভেম্বর রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

এর বাইরে জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর মিশ্র গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পও জিটুজি পদ্ধতিতে হচ্ছে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনা ঠিকাদারের সঙ্গে মূল নির্মাণকাজের জন্য প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকায় রফা হয়েছে। এই প্রকল্প এখনো সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায়নি। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনে এই প্রকল্পের ব্যয়ও যৌক্তিক করার কথা বলা হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র বলছে, এই তিন প্রকল্পের অর্থায়ন, ঠিকাদার নিয়োগের শর্ত, ব্যয় নির্ধারণ প্রক্রিয়া একই। ফলে একটি প্রকল্প থেকে চীন সরে গেলে অন্য দুটি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

জানতে চাইলে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ও আখাউড়া-সিলেট প্রকল্প নিয়ে চীনকে আবার চিঠি দেওয়া হচ্ছে। জবাব পেলে করণীয় ঠিক করা হবে। এই দুই প্রকল্পের ওপর জয়দেবপুর-জামালপুর প্রকল্পের ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে।

জিটুজি প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন ও বেতন-ভাতাসহ স্থানীয় খরচ বহন করার কথা বাংলাদেশের। আর নির্মাণকাজের অর্থ দেবে চীন; যা প্রকল্প ব্যয়ের ৮০-৮৫ শতাংশের মতো। চীনের অর্থায়নের মূল শর্ত, উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা যাবে না। কাজ করবে চীনা ঠিকাদার।

রেলওয়ের অন্তত তিনজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিযোগিতাহীন কাজে এমনিতেই ব্যয় বেশি হয়। চীনের সঙ্গে জিটুজি পদ্ধতিতে এখন শুধু পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প চলমান আছে। এর ব্যয় প্রায় ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। এই প্রকল্পেও বাড়তি ব্যয়ের অভিযোগ আছে।

জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী মিশ্র গেজ ডাবল লাইন প্রকল্প

এই কাজের ঠিকাদার চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি)। প্রতি কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৬১ কোটি টাকা। আখাউড়া-লাকসাম পথে প্রায় একই ধরনের কাজ চলছে। যার প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ১৯ কোটি টাকা। এই প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগ হয়েছে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী প্রকল্পে প্রতিটি সরঞ্জামের মূল্য প্রতিবছর ২৫ শতাংশ হারে বাড়বে ধরে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন পেয়ে ব্যয় যৌক্তিকীকরণ কমিটি তা ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করে। এতেই ব্যয় কমে যায় ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। প্রতি ঘনমিটার মাটি ভরাটের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০০ টাকা। অথচ রেলের অন্য প্রকল্পে প্রতি ঘনমিটার মাটি ভরাট হচ্ছে ২৫০-৪০০ টাকা।

যৌক্তিকীকরণ কমিটি মাটি ভরাট কাজে ১৪৩, রেললাইন বসানোর কাজে ১২৭ এবং সেতু-কালভার্ট নির্মাণকাজে ১৫০ কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করে। এ ছাড়া স্টেশন ভবন নির্মাণের যে ব্যয় ধরা হয়েছিল, তা থেকে ৫ শতাংশ কমানোর কথা বলা হয়। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা ব্যয় কমানো হয়, যা মোট ব্যয়ের ১২ দশমিক ৯১ শতাংশ। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৪ হাজার ২৫১ কোটি টাকা। মূল নির্মাণকাজের জন্য ১১ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকায় চীনা ঠিকাদার ঠিক করা হয়।

রেল কর্তৃপক্ষ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে চীনা সরকারকে ব্যয় কমানোর বিষয়টি জানিয়ে চিঠি দেয় গত ১৭ জানুয়ারি। এরপর চীনই স্বাধীন সংস্থা দিয়ে প্রকল্পটি মূল্যায়ন করে জানায়, প্রকল্পের অনেক অংশের মূল্য বেশি। কারণ, পর্যাপ্ত কারিগরি প্রস্তুতি ও সমীক্ষা করা হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পণ্য পরিবহন করে যে আয় করার কথা বলা হয়েছে, তা অর্জিত হবে না। ফলে ঋণ পরিশোধের বিষয়টি বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। তাই প্রকল্পটি চীনা সরকারের মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হলো না। রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, এর মাধ্যমে মূলত চীন প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ানোর কথাই জানাল। আবার গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিসিইসিসিও জানায়, ব্যয় কর্তন মেনে তারা কাজ করতে পারবে না।

প্রকল্পের পরিচালক গোলাম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, চীনকে আবারও অর্থায়নের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লেখা হবে। জবাব নেতিবাচক হলে বিকল্প চিন্তা করা হবে।

আখাউড়া-সিলেট মিশ্র গেজ লাইন নির্মাণ

আখাউড়া-সিলেট মিশ্র গেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল নির্মাণকাজের জন্য ১২ হাজার ৭৯ কোটি টাকায় চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঠিক করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন মেনে এই প্রকল্পেও ঠিকাদারের অংশ থেকে ৩ হাজার ৩৫৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা কমানোর প্রস্তাব তৈরি করা হয়।

প্রকল্পে চীন ঠিকাদার হিসেবে অনুমোদন দেয় চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেডকে (সিআরবিজি)। প্রতি কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৫০ কোটি ৫১ লাখ টাকা। অথচ সিলেটের কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথে একই ধরনের কাজে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

যৌক্তিকীকরণ কমিটি একই প্রক্রিয়ায় ব্যয় কমানোর প্রস্তাব করে প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু তা মানতে রাজি হয়নি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এই প্রকল্পের ঋণ চীন সরকার অনুমোদন করেছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

এই প্রকল্প নিয়ে গত বছরের ২৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটি চিঠি লেখেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। চিঠিতে প্রকল্পের ব্যয় বেশি নয় বলে দাবি করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কাছাকাছি সময়ে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ এবং পরিবেশ ও বনমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন এই প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে পরিকল্পনামন্ত্রীকে চিঠি দেন।

জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি চিহ্নিত করেছে, এটা ভালো দিক। তবে দর–কষাকষির সময় বাড়তি ব্যয় ধরতে না পারা রেলের কর্মকর্তাদের অদক্ষতা। বিশ্বব্যাপী চীনা ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার নজির আছে। এ ক্ষেত্রেও এমনটা হয়েছে কি না, খতিয়ে দেখা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘চীন সিংহভাগ অর্থায়ন করছে বলে তাদের কিছু শর্ত থাকতে পারে। তবে একটা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে তা হওয়া উচিত। চীন বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার। তাই বাংলাদেশ সরকার ব্যয় কমানোর যে অবস্থান নিয়েছে, সে বিষয়ে চীন কোনো অযৌক্তিক অবস্থান নেবে না বলে আশা করছি।’