প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত রেফারাল পদ্ধতিতে অসংক্রামক রোগে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে হবে
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত রেফারাল পদ্ধতিতে অসংক্রামক রোগে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে হবে

এক নজিরবিহীন সময়ের মুখোমুখি হয়েছি আমরা, যখন বাংলাদেশের মতো অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে দুটি মহামারি চলছে। একটি হচ্ছে বর্তমান বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯– এর মহামারি। আর অন্যটি হলো হৃদ্​রোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগের মতো অসংক্রামক রোগ, যেগুলো ধীরে ধীরে মহামারিতে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ৪ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষের কোভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে এবং ১২ লাখের বেশি মানুষ মারা গেছেন। অন্যদিকে, অসংক্রামক রোগে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ৪ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করেন, যা মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ। আরও দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এসব অসংক্রামক রোগে প্রতিবছর দেড় কোটি মানুষ মারা যান, যাঁদের বয়স ৩০ থেকে ৬৯–এর মধ্যে। এই অকালমৃত্যুর ৮৫ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে।

বাংলাদেশে গত মার্চ মাসে প্রথম কোভিড রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় চার লাখ রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছয় হাজারের কাছাকাছি। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে ২০১৬ সালে অসংক্রামক রোগে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। এসব মৃত্যুর ২২ শতাংশই অকালমৃত্যু। অর্থাৎ, ওই সব মানুষ ৩০ থেকে ৬৯ বছর বয়সের মধ্যে মারা গেছেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

নতুন ধরনের করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মাত্রা অনেক বেশি। আক্রান্ত ব্যক্তি মৃদু থেকে তীব্র উপসর্গে ভুগতে পারেন এবং এতে মৃত্যুর ঝুঁকিও বেশি। মহামারির প্রথম দিকে এই রোগের নির্দিষ্ট চিকিত্সা সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় মৃত্যুর হারও তুলনামূলক বেশি ছিল। ফলে অতি দ্রুত কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোতে ভালো স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সেসব দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার অনেক বেশি ছিল। বিশেষত বয়স্ক এবং উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্​রোগ, ক্যানসার, ফুসফুসের রোগের মতো অসংক্রামক রোগসমূহে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তীব্র উপসর্গে ভুগছিলেন অথবা বেশি মারা যাচ্ছিলেন।

আমরা জানি, ধূমপান ও অন্যান্য তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, যেমন উচ্চ লবণ, চিনি ও ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাদ্য গ্রহণ; অল্প পরিমাণে ফল ও শাকসবজি খাওয়া, কায়িক শ্রমের অভাব ও বায়ুদূষণ উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিক ও শ্বাস কষ্টের মতো অসংক্রামক রোগের জন্য দায়ী। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রোগগুলো প্রতিরোধের দিকে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি এবং হচ্ছে না। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতের পেছনে যে বরাদ্দ থাকে, তার বেশির ভাগই চিকিৎসাসেবার পেছনে খরচ করা হয়। কিন্তু স্বাস্থ্যকর জীবনাচরণের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধিসহ যথাযথ আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং প্রয়োগের পেছনে নজর কম দেওয়া হয়। সাধারণত এসব রোগের পেছনে দায়ী কারণগুলো অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জীবনাচরণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা অনুধাবন করে জীবনাচরণ পরিবর্তন করা কঠিন হয়ে থাকে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে অস্বাস্থ্যকর জীবনাচরণের পর সাধারণত মধ্য বয়সে গিয়ে অসংক্রামক রোগগুলো হয়ে থাকে। এ জন্য একদম কম বয়স থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে উৎসাহিত করা দরকার, যা কিনা কয়েক দশক পর অসংক্রামক রোগসমূহ কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে।

এখানে বলা দরকার, সচেতনতা বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, এর জন্য যথাযথ আইন ও নীতিমালার সহায়তা প্রয়োজন; যেমন তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন, শিল্পজাত খাদ্যে লবণ ও ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা নির্ধারণ করা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে দেশের বর্তমান অবস্থায় যেসব রোগ বেশি অকালমৃত্যু ও বৈকল্য ঘটায়, সেগুলো ঠিকমতো নির্ধারণ করে প্রতিরোধ এবং আধুনিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করা প্রয়োজন।

কোভিড-১৯ মহামারি অসংক্রামক রোগ, সংক্রামক রোগ এবং জরুরি স্বাস্থ্যসমস্যার মধ্যে বিদ্যমান যোগসূত্র উন্মোচন করেছে।

কোভিড-১৯ মহামারির তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অসংক্রামক রোগসমূহে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোভিড হলে তাঁদের গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার ও মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজের হিসাব অনুসারে, বাংলাদেশে হৃদ্​রোগ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের সংখ্যা যথাক্রমে ৮৭ লাখ, ৬১ লাখ, ৩২ লাখ এবং ২ কোটি। সুতরাং একটি ব্যাপকসংখ্যক অসংক্রামক রোগী কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। কোভিড মহামারি নিয়ন্ত্রণে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে অবশ্যই অসংক্রামক রোগে আক্রান্তদের, বিশেষত উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্​রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ এবং মানসিক ও স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

কোভিড-১৯ মহামারি অসংক্রামক রোগ, সংক্রামক রোগ এবং জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে বিদ্যমান যোগসূত্র উন্মোচন করেছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে বিদ্যমান স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাগুলোকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কোভিড-১৯ ও অসংক্রামক রোগ উভয়ই প্রাণঘাতী এবং একটি অন্যটিকে জটিলতর করে তোলে। এসব রোগ বিশ্বজুড়ে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদেরই বেশি দুর্দশায় ফেলে। গবেষণায় দেখা যায়, ইউরোপে কোভিড মহামারির সময় যত লোক মারা গেছেন, তাঁদের সবাই শুধু কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মারা যাননি; বরং এই মহামারিকালে বহু রোগী চিকিৎসা না পেয়ে হৃদ্​রোগে মারা গেছেন কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। কারণ, দেখা গেছে, মহামারি শুরুর দিকে উত্তর ইতালিতে হৃদ্​রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির হার ৩০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মহামারির কারণে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ না করায় অনেকেরই হয়তো শেষ পর্যায়ের ক্যানসার ধরা পড়তে পারে, যা কিনা ভবিষ্যতে অতিরিক্ত মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন
default-image

অনেক দেশ ইতিমধ্যে কোভিড-১৯ জনিত বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যরা করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ঝুঁকির বিরুদ্ধে লড়াই করছে। বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রগুলো করোনার সংক্রমণ কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে। এসব পদক্ষেপ কোভিড-১৯–এর স্বাস্থ্যক্ষতি এবং ইতিমধ্যে সক্ষমতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যাওয়া স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ভেঙে পড়া থেকে বাঁচাতে অত্যন্ত জরুরি। তবে সংক্রমণের হার বাড়লেও এবং যতটা বোঝা যাচ্ছে, কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত রোগটি আরও বেশ কিছুদিন থাকবে। এ সময় সরকারকে অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবাও চালু রাখতে হবে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিশেষত জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলো মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং সংক্রামক রোগসমূহের সেবাদানের দিকে নজর দেয়।

অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যের উদ্যোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে টিকাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিশেষ করে হাসপাতালগুলোতে কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর আগেই রোগীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন অনুসারে, কোভিড চিকিত্সার জন্য হাসপাতালগুলোতে আধুনিক সুবিধাসহ উচ্চ প্রবাহের অক্সিজেন, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর ইত্যাদি থাকা প্রয়োজন। তবে অনেক হাসপাতালে আধুনিক সুবিধা, ওষুধ এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নেই! যদিও এখন সরকার কোভিড রোগীদের সেবাদানের জন্য হাসপাতালগুলোর উন্নয়নে বেশ বিনিয়োগ করছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দ্রুত হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। সেই সঙ্গে অতি জরুরি স্বাস্থ্যসেবাসমূহ জোরদার করা উচিত। যেমন টিকাদান, ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মা রোগ নিয়ন্ত্রণ, ইনসুলিন, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ, প্রজনন, মা ও শিশু স্বাস্থ্য; যা অসংখ্য প্রাণ বাঁচাবে।

গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজের হিসাব অনুসারে, বাংলাদেশে হৃদ্​রোগ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের সংখ্যা যথাক্রমে ৮৭ লাখ, ৬১ লাখ, ৩২ লাখ এবং ২ কোটি

জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুসারে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন, বিশেষত শহরাঞ্চলে। তাই জনসাধারণকে মাস্ক ব্যবহার, জনসমাগম এড়িয়ে চলা, বয়স্ক এবং বেশি ঝুঁকিপূর্ণ লোকদের সাবধানে রাখতে সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে অসংক্রামক রোগে আক্রান্তদের এই ধরনের সাবধানতা বেশি করে পালন করা দরকার এবং ভ্যাকসিন বের হওয়ার পর তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের চেষ্টা করছে। এসডিজির ৩.৪ লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগে অকালমৃত্যুর হার ২০১৫ সালের তুলনায় এক–তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনতে হবে। সেই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বরাদ্দের বিশাল একটি অংশ অনাকাঙ্ক্ষিত কোভিড মহামারি সামাল দিতে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে, যা এই লক্ষ্য অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই এসডিজির লক্ষ্য ৩.৪ অর্জনে দুটি দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, বিদ্যমান জাতীয় অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কৌশল যথাযথভাবে প্রয়োগ করা। দ্বিতীয়ত, একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে জোরদার করবে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত রেফারাল পদ্ধতিতে অসংক্রামক রোগে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধকে গুরুত্ব প্রদান, অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজের মাধ্যমে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই অসংক্রামক রোগে অকালমৃত্যুর এই মহামারি রোধ করা যাবে।


ড. সোহেল রেজা চৌধুরী ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক

মন্তব্য পড়ুন 0