বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘১৮ বছর বয়সে তো ইউনিভার্সিটিতে চলে যায়। আমাদের আজকে মনে হয় ১৮ বছর সময়সীমাটা চিন্তা করার বিষয় আসছে।’ পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘১৮ বছরে পূর্ণ যুবকের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তাকেও কিন্তু শিশু হিসেবে কনসিডার করা হয়। কিশোর গ্যাং–এর বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে আমরা যেভাবে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি, সেভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না।’ আর র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘যদি কেউ এর পরেও জনসচেতনতামূলক আহ্বানে সাড়া দিয়ে সুপথে না আসে, তাদের বিরুদ্ধে যে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা, সেটা কিন্তু চলমান থাকবে।’

ওই দিন সন্ধ্যায় দু–একজন শিশু অধিকারকর্মীর সঙ্গে কথা হয়। বিজ্ঞাপন কেমন লাগল জানতে চাই। মোটাদাগে তাঁরা দু–তিনটি পর্যবেক্ষণের কথা বলেন, প্রথমত, বিজ্ঞাপনে পরিবার ও সমাজের ওপর শিশু–কিশোরদের ভালো থাকা, মন্দ থাকার দায় চাপানো হয়েছে। মনে হয়েছে, রাষ্ট্রের কাজ শুধু দমন করা, আর কোনো দায় নেই। যদিও শিশু আইন, ২০১৩–র যে মূল সুর, তার সঙ্গে এই ধারণা একেবারেই বেমানান। দ্বিতীয়ত, শিশু অধিকার নিশ্চিত করতে না পারা রাষ্ট্র আর কিছু না পেরে এখন শিশুদের বয়স নিয়ে অহেতুক আলোচনা তৈরি করেছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের সময়ও একবার এই জিগির তোলা হয়েছিল।

দমন প্রসঙ্গে আসি। বাংলা একাডেমির অভিধানে দমন শব্দের বেশ কিছু অর্থ পাওয়া যায়। বিজ্ঞাপনে যে অর্থে দমন শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, তার অর্থ শাসন, দণ্ডদান। শিশু আইনের ১০০টি ধারার কোথাও অবশ্য ‘দমন’ কথাটি ব্যবহৃত হয়নি।

এর আগেও আমরা ‘দমন’–এর একটা রূপ দেখেছি। বিজ্ঞাপনের শুরুতে সুমন নামে যে তরুণ উপুড় হয়ে পড়ে ছিল, ঠিক একইভাবে বছর দুয়েক আগে সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে ‘নয়ন বন্ড’কে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। তাঁর পরনে ছিল নীল রঙের শার্ট। পুলিশ দাবি করেছিল, বরগুনার রিফাত হত্যাকাণ্ডের এক নম্বর আসামি নয়ন বন্ডের সাঙ্গপাঙ্গরা গুলি ছুড়েছিল, তারাও ছুড়েছিল। পরে নয়ন বন্ডের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ ঝোপ থেকে উদ্ধার করা হয়। নয়ন কী করে নয়ন বন্ড হলেন, সে সম্পর্কেও নানা খবর বেরিয়েছিল সে সময়। নয়ন বন্ডের ব্যাংকার বাবা যখন মারা যান, তখন তাঁর বয়স ৯–১০। খারাপ সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। কৈশোরে মাদক সেবনে জড়ান, পরে মাদক কেনাবেচায়। ওই মামলার অন্যান্য আসামির অনেকেই শিশু। তাদের বিচার চলছে শিশু আদালতে। ওই দিনের অনুষ্ঠানেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তাঁরা আর মিন্নি, নয়ন বন্ড বা ঐশীদের দেখতে চান না।

default-image

শিশু আইনে কিন্তু শিশুদের ‘অসৎ পথে পরিচালনা করানো বা করিতে উৎসাহ দেওয়া’র অপরাধে পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধানও আছে। কখনো এই দণ্ডের প্রয়োগ হয়েছে কি না, জানা যায়নি। তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন কিশোর অপরাধ কীভাবে দমন করতে চায়? ওই দিনের অনুষ্ঠানে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গণমাধ্যমে যেভাবে এসেছে, তাতে বিষয়টি পরিষ্কার নয়। যদিও বিজ্ঞাপনচিত্রে র‌্যাবকে অস্ত্র হাতে দৌড়ে আসতে দেখা যাচ্ছিল।

এবার আসি বয়স প্রসঙ্গে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী এশিয়ার প্রথম দুটি দেশের একটি বাংলাদেশ। ওই সনদ অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলে ও মেয়েরা শিশু। এর ওপর ভিত্তি করে শিশু আইন, বাল্যবিবাহ নিরসন আইন, শ্রম আইন তৈরি হয়েছে। শিশু আইন, ২০১৩–র শুরুতে বলা হয়েছে, ‘বিদ্যমান অন্য কোন আইনে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের উদ্দেশ্যপূরণকল্পে, অনূর্ধ্ব ১৮ (আঠার) বৎসর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসাবে গণ্য হইবে।’ নতুন করে শিশুর বয়স নির্ধারণের উদ্যোগ নিলে আরও যে আইনগুলোয় ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু বা কিশোর বলা হয়েছে, সে আইনগুলোর কী হবে?

তা ছাড়া বয়সসীমা বেঁধে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে ১৮ বছর বয়সের নিচে আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়ালে কোনো শিশুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। আইন অনুযায়ী নয় বছরের নিচে কোনো শিশুর অপরাধের দায় নেই। ৯–১২ বছরের শিশুর মানসিক পরিপক্বতার ওপর নির্ভর করে তার ওপর অপরাধের দায় দিতে বলা হয়েছে। তাহলে ১৮ বছর নিয়ে এত মাতামাতি কেন? ১৮ বছর বয়সীদের শিশু বলায় কিশোর গ্যাংকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না কেন?

default-image

গলদ কোথায় জানতে একজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। কেন কিশোরদের গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তিনি বললেন, আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুদের ব্যাপারে সরকারের প্রস্তুতিই নেই। আইন করে বসে আছে। যেমন আইনে পুলিশি প্রতিবেদনের পাশাপাশি সরেজমিন অনুসন্ধান করে শিশু ও তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে একটি সামাজিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে বলা হয়েছে। আদালতে ওই প্রতিবেদন কি জমা হচ্ছে? যদি না–ই জানা গেল, শিশু কেন আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়াচ্ছে, তাহলে এর সমাধান হবে কী করে? আবার যখন একজন শিশু আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে আটক হচ্ছে, তখনো যেভাবে এগোনোর কথা, সেভাবে এগোনো যাচ্ছে না। এই আইনের মূল সুর হলো, অপরাধপ্রবণ শিশু পুলিশের কাছে আসবে। পুলিশ আর সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তা মিলে শিশুকে সুপথে আনার জন্য নির্দেশনা দেবেন। আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়া নয়, বরং অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় শিশুর সংশোধনে তাঁরা ব্রতী হবেন। পুলিশের দিক থেকে কোনো কিছুর অভাব নেই। কিন্তু প্রবেশন কর্মকর্তা পাওয়া যায় না।

তবে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে শুধু সমাজসেবা অধিদপ্তরের গাফিলতি আছে, বিষয়টা এমনও নয়। এই তো সপ্তাহ কয়েক আগে মোহাম্মদপুরের এক হেরোইন কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথমবার গ্রেপ্তার হয়েছিল সে, নামের পাশে বয়স লেখা হয়েছিল ১৯। উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় আবারও গ্রেপ্তার হয়। দুবারই তার জায়গা হয়েছিল কারাগারে। শিশু আইনে যেহেতু সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হয়, তাই ‘ঝামেলা’ এড়াতে মামলায় প্রকৃত বয়স না লিখে গড়পড়তা ১৯ বছর বলে চালানোর নজির আছে। বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়েও কথা আছে। কিছুদিন আগে হাইকোর্টে হৃদয় বনাম রাষ্ট্র মামলায় এম ইনায়েতুর রহিম ও মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দৈনন্দিন বিচারিক কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে এ কথা উচ্চারণে আমাদের দ্বিধা নেই যে শিশু আইন ও আদালত নিয়ে বর্তমানে নিম্ন আদালত ও হাইকোর্ট বিভাগে একধরনের বিচারিক বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে।’

সরকার তাহলে করছে কী? সবশেষ উদ্যোগ নিয়ে খোঁজখবর করি। গত ২ মার্চ সাতটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে যাওয়ার। তাঁরা যাবেন, শিশুদের সাক্ষাৎকার নেবেন, কেন আইনের সঙ্গে সংঘাত ঘটেছে জানবেন এবং উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যেন আবার কোনো অপরাধপ্রবণ দলে না জড়ান, সে সম্পর্কে শিশুদের বোঝাবেন। এই কমিটি গঠন করার দায়িত্ব ছিল সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবানী ভট্টাচার্য বলেন, কোভিডের কারণে কমিটি যেতে পারেনি। তা ছাড়া এই যুগে শারীরিকভাবে উপস্থিত হওয়ার তেমন প্রয়োজনও নেই। তাঁরা প্রতিদিনই হোয়াটসঅ্যাপ–জুমে কথা বলেন। তা ছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের লোকজন নিয়মিত যাচ্ছেন।

অন্যদিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক শহীদুল ইসলাম জানান, তাঁরা একটা কৌশলপত্র তৈরি করেছেন। আরও বেশ কিছু জেলায় উন্নয়ন কেন্দ্র হচ্ছে। শিশুরা যেন আইনের সঙ্গে সংঘাতে না জড়ায়, তা নিয়ে সরকারের ভাবনা কিংবা জড়িয়ে গেলে দমন কীভাবে করা হবে, তা–ও জানা গেল না। প্রশ্ন ওঠে, আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো শিশুরা আসলে কার—শুধু মা–বাবার? পরিবার বা সমাজের? সমাজসেবা অধিদপ্তরের কিংবা পুলিশের? তারা কি তাহলে রাষ্ট্রের নয়?

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন