বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বেলা তিনটায় শুরু হয়ে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা এ বৈঠক চলে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে বলেন, সম্মিলিতভাবে মালিক ও শ্রমিকেরা যাত্রীবাহী লঞ্চের বিদ্যমান ত্রুটি নিরসনের আগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিপক্ষে মতামত দিয়েছেন। এ জন্য তাঁরা একটি নির্দিষ্ট সময় চেয়েছেন। একই সঙ্গে কোনো লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটলেই ‘আইওয়াশ’ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা না করার অনুরোধ জানিয়েছেন মালিকেরা।

বৈঠকে উপস্থিত বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক মালিকদের উদ্দেশে বলেন, বৈঠকে যেসব সমস্যার কথা উঠে এসেছে, তা সমাধানে সময় দেওয়া হবে।

গোলাম সাদেক বলেন, ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর বিশৃঙ্খলার কারণে একটি লঞ্চের যাত্রা বাতিল করা হয়েছিল। পরে সেই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কম জরিমানা করে সচেতনতা তৈরি করা কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য বলে মালিকদের জানান বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান।

বৈঠকে আলোচিত ত্রুটিগুলো লঞ্চমালিকদের লিখিতভাবে জানানো হবে। লঞ্চের ত্রুটি শোধরাতে লঞ্চমালিকেরা সময় পাবেন। তবে এ জন্য ঠিক কত দিন পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে না, তা এখন পর্যন্ত মালিকদের জানানো হয়নি।

সদরঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া সব লঞ্চ তদারক করতে ৫ জানুয়ারি পাঁচটি কমিটি করেছিল বিআইডব্লিউটিএ। এসব কমিটি প্রয়োজন বোধ করলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা ও লঞ্চের যাত্রা বাতিল করতে পারবে বলে বিআইডব্লিউটিএর দপ্তর আদেশে বলা হয়েছিল।

২ জানুয়ারি পৃথক এক বৈঠকে এক মাসের মধ্যে লঞ্চের সব ত্রুটি সারাবেন বলে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের জাহাজ জরিপকারক মাহবুবুর রশিদকে জানিয়েছিলেন মালিকেরা।

default-image

গতকালের বৈঠকের শুরুতেই অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল সংস্থার প্রেসিডেন্ট মাহবুব উদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে দোষারোপ করেন। তিনি বলেন, আগে বছরে চার-পাঁচটি দুর্ঘটনা ঘটত। এখন এ সংখ্যা কমে এসেছে। তবে একটি দুর্ঘটনা হওয়া মানেই ৫০ জন ‘নাই’ হয়ে যাওয়া। ফলে সারা দুনিয়ায় হইচই পড়ে যায়। তাঁদের মাথার ওপর ৪০ থেকে ৫০টি টেলিভিশন এসে দাঁড়িয়ে থাকে। আর বাংলাদেশে এখন কমপক্ষে দুই হাজার পত্রিকা রয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কথা শুনে, মিত্রপক্ষের কথা শুনে, বুঝে না বুঝে নানা রকম গল্প তৈরি করে। নানা রকম গুজব শুনে যাঁর যা খুশি লেখা শুরু করেন। ফলে মালিকদের অনেকের ঘুম হারাম হয়ে যায়।

উপস্থিত মালিকদের একজন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করে বলেন, ‘আমরা অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল অধ্যাদেশের অধীন, ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন নই। দুর্ঘটনা ঘটলেই আমাদের গ্রেপ্তার করবেন না। তদন্ত কমিটি কথা বলবে। যদি তদন্তে দোষী প্রমাণিত হয়, তখন গ্রেপ্তার করতে পারেন।’

গন্তব্যে আগে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতার কারণেই বেশি ক্ষমতার ইঞ্জিন লঞ্চে লাগাতে হয় বলে উল্লেখ করেন এই মালিক। দেরিতে গন্তব্যে পৌঁছালে বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট বন্দর ও স্থানীয় প্রশাসনসহ সবাই লঞ্চের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জবাবে বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কমবেশি সব লঞ্চেই লাইফ বয়া আছে। কিন্তু এগুলো হাতের নাগালে থাকে না। তিনি লঞ্চের কেবিনে লাইফ জ্যাকেট রাখতে মালিকদের অনুরোধ করেন। মালিক-শ্রমিক উভয়কেই প্রতিযোগিতা করে লঞ্চ না চালানোর অনুরোধ জানান তিনি। মালিকদের চাহিদামতোই লঞ্চের সময়সূচি অনুমোদন করা হয়, সময়সূচি চাপিয়ে দেওয়া হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহ আলম ভূঁইয়া বলেন, অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতিকে আইওয়াশ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে লঞ্চকে জরিমানা করার প্রবণতা তাঁরা সমর্থন করেন না।

শাহ আলম ভূঁইয়া বলেন, ক্ষমতার বেপরোয়া প্রয়োগ শৃঙ্খলা আনতে পারে না। বাংলাদেশের নৌযানে অনেক সুযোগ-সুবিধা না থাকার পরও শ্রমিকেরা সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল থেকে কর্তব্য পালন করেন। এর চেয়ে বেশি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পৃথিবীর কোথাও কাজ হয় না। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার আগে মালিকদের ত্রুটি শোধরানোর সময় দিতে বিআইডব্লিউটিএ ও অধিদপ্তরকে পরামর্শ দেন তিনি।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম বলেন, ‘জাতিকে আইওয়াশ করার জন্যই এ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা। আমরা কি এত ফালতু হয়ে গেছি! আমাদের কি গোনায় নেওয়া যায় না! পরিবেশ-পরিস্থিতি নষ্ট হোক, তা চাইনি বলে তখন কিছু বলিনি। দোষারোপের কথা আলোচনা করব না। তবে দোষ যদি ধরতে চান, তাহলে আপনারাও (কর্তৃপক্ষ) ধরবেন, আমরাও ধরব। তাহলে দেখবেন, পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে চলে যাবে।’

নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সার্ভেয়ার জানান, তিনি মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছিলেন।

অগ্রিম টিকিট কেটে লঞ্চে যাত্রী ওঠানো প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি আদেশের মতো করে অনুরোধ করছি, আমরা টিকিট কেটে লঞ্চে উঠব। আমরা বেশি সময় দিতে পারব না। টিকিট ছাড়া আমি লঞ্চে উঠতে দেব না। একটা লোক মরে গেল, আমি তাঁর ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছি না। আমি জানি না, আমার জাহাজে কে ছিল। ৫০০ লোক নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমার লঞ্চে কে ছিল, আমি তা জানি না।’

মালিকদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বিষয়টি গণবিজ্ঞপ্তি হিসেবে প্রচার করতে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করেন। চেয়ারম্যান বলেন, ‘শুধু গণবিজ্ঞপ্তি নয়, কী কী করতে হবে বলেন। সব করা হবে।’

default-image

বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বিআইডব্লিউটিএর সদস্য (পরিকল্পনা) দেলোয়ার হোসেন। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর বৈঠকে আসার কথা থাকলেও পরে জাহাজ জরিপকারক মাহবুবুর রশিদ তাঁর প্রতিনিধিত্ব করেন।

গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৪৭।

অভিযান-১০ লঞ্চে আগুনের সূত্রপাত ইঞ্জিন থেকে বলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি মানতে নারাজ অনেক লঞ্চমালিক। বৈঠকে উপস্থিত মালিকেরা দাবি করেন, এ আগুন ষড়যন্ত্র করে লাগানো হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।

মালিকদের উদ্দেশে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘আপনাদের কাছে তথ্য থাকলে আমাকে জানান। তদন্ত করা হবে।’

বৈঠকে মালিকেরা ১০টি বিষয়ে আলোচনা করেন। এ বিষয়ে তাঁরা বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রয়োজনীয় যোগ্যতার মাস্টার-ড্রাইভার পাওয়া না গেলে ডিসপেনশেসান সনদের মাধ্যমে কম যোগ্যতার মাস্টার-ড্রাইভার দিয়ে লঞ্চ চালানোর প্রক্রিয়া সহজীকরণ। লঞ্চে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত সাপেক্ষে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো লঞ্চের সময়সূচি/যাত্রা বাতিল না করা ও হয়রানি বন্ধ করা। লঞ্চের মধ্যে অশুভ প্রতিযোগিতা বন্ধ করা। সংশ্লিষ্ট রুটের মালিক ও সংস্থার মতামত গ্রহণ ছাড়া যে সময়সূচি দেওয়া হয়েছে, তা বাতিল করা। ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলাচলরত লঞ্চে একজন মাস্টার ও একজন ড্রাইভার দ্বারা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া।

অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে লঞ্চমালিকদের আলোচনার অ্যাজেন্ডাপত্রে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনা কখনো বলেকয়ে আসে না। কারও অসতর্কতা ও অসচেতনতার কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। অভিযান-১০ লঞ্চটি ঢাকা থেকে ঝালকাঠি পর্যন্ত নিরাপদে পৌঁছায়। লঞ্চটিতে একই সময়ে সর্বত্র আগুন লাগে। এতে পুরো লঞ্চ ভস্মীভূত হয়ে যায়। এটা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। এতে কোনো ধরনের নাশকতা আছে কি না, বিভিন্ন মহল থেকে তা সুষ্ঠু তদন্তের দাবি উঠেছে। লঞ্চের মালিককে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লঞ্চটি অরক্ষিত অবস্থায় নদীতে পড়ে আছে। সেটি মেরামত করা প্রয়োজন। তাই লঞ্চটি মালিক/সংস্থার জিম্মায় দিয়ে মেরামত করার সুযোগ দেওয়া অত্যাবশ্যক। এ ছাড়া লঞ্চের মালিক ও শ্রমিকদের মুক্তি দিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন