বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মানুষ যান চালনায় নিয়ম না মানা এবং অদক্ষ শ্রমিকদের দিয়ে লঞ্চ বা ফেরি পরিচালনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্য পরিবহনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এবং যান্ত্রিক ত্রুটি—এমন নানা কারণে নৌপথে বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটে। গত ২০ বছরে বাংলাদেশের নৌপথে কমপক্ষে বড় ১২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, এতে হাজার তিনেকের বেশি মানুষের মরদেহ পাওয়া যায়। নিখোঁজদের হিসাব নেই। একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণ গেছে মোট সাতটি দুর্ঘটনায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অ্যাটলাস স্টার দুর্ঘটনা। ১৯৮৬ সালের এই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত ২০০ জন যাত্রীর মরদেহ পাওয়া যায়, ২০০০ সালের এমভি রাজহংসী দুর্ঘটনায় ১৬২ জন যাত্রীর লাশ মেলে। একইভাবে ২০০২ সালে এমভি সালাউদ্দিন-২ থেকে ৪০০ মরদেহ, ২০০৩ সালে এমভি নাসরিন-১ থেকে ৬৫০ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০০৫ সালে এমএল মিতালি ও এমএল মজলিশ নামে দুটি ছোট লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষের পর ডুবে গিয়ে প্রায় ৩০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৪ সালে আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে পদ্মা নদীতে ডুবে যায় পিনাক-৬। ৩০ জুন ২০২০ পোস্তগোলাসংলগ্ন এলাকায় লঞ্চডুবির ঘটনায় অন্তত ৩৩ জন নিহত হন। বড় বড় লঞ্চডুবির অনেকগুলোই ঘটেছে মেঘনা নদীতে।

১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত নৌ দুর্ঘটনার জন্য দেশে পাঁচ শতাধিক মামলা চলছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র একটির বেশি মামলার বিচার এখনো পর্যন্ত শেষ হয়েছে বলে জানা যায়নি। এ রকম এক প্রেক্ষাপটে পানির ওপর আগুনে পুড়েছে মানুষ। কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা এই ঘটনার খবর দিতে গিয়ে বলেছে, ‘বাংলাদেশে জতুগৃহ লঞ্চ, মৃত ৪১ জন’।

মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, পঞ্চপাণ্ডব ও কুন্তীকে আগুনে পুড়িয়ে মারার জন্য দুর্যোধনদের নির্দেশে স্থপতি পুরোচন বারণাবত নামের এক মনকাড়া জায়গায় সুশোভন প্রাসাদ ‘জতুগৃহ’ নির্মাণ করা হয়। কথা ছিল সেখানে কুন্তীসহ পাণ্ডবরা বিশ্রাম নেবেন, ছুটি কাটাবেন। বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ যেমন ঘি, লাক্ষা, মোম ইত্যাদি দিয়ে তৈরি জতুগৃহে তখন আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে। বলাবাহুল্য, মহাভারতের পাণ্ডবরা সব সংকট অবলীলায় কাটিয়ে ওঠেন। তাঁরা কৌশলে আগুন তথা জতুগৃহ থেকে রক্ষা পান এবং নৌকায় করে নদী পার হয়ে জঙ্গলে গা ঢাকা দিতে সক্ষম হন। কোনো দেবদূত তাঁদের নৌকার ব্যবস্থা করে থাকবেন।

কিন্তু কী অদ্ভুত মিল পৌরাণিক সেই কাহিনির সঙ্গে সুগন্ধা নদীর ঘটনার। সুগন্ধায় ভাসমান জতুগৃহ থেকে প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দেওয়া যাত্রীদের উদ্ধার করতে এক অলৌকিক নৌকা চলে আসে অন্ধকার ফুঁড়ে। যন্ত্রের নৌকা ট্রলার নিয়ে চলে আসেন মাঝি মিলন খান। সংবাদকর্মীদের তিনি বলেছেন, ‘রাত তিনটার দিকে দিয়াকুল গ্রামের সুগন্ধা নদীতে যাত্রীদের চিৎকার ও আগুন দেখে ট্রলার নিয়ে ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি আগুন থেকে বাঁচতে যাত্রীরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ভেসে আছেন। পরে তাঁদের উদ্ধার করে পাড়ে নিয়ে যাই। এলাকার লোকজন তাঁদের আশ্রয় দেন। গরম পোশাকের ব্যবস্থা করেন। তাঁদের অনেকেই দগ্ধ ছিলেন। হাত-পা ভাঙা ছিল। দ্রুত তাঁদের হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন ছিল। দিয়াকুল গ্রামের মানুষের সহায়তায় রাত থেকে সকাল পর্যন্ত অন্তত ৩০০ যাত্রী পারাপার করে তীরে ও হাসপাতালে পাঠাতে সহায়তা করেছি।’ সবটাই করেছেন তিনি বিনা ভাড়ায়। এটাই বাংলাদেশ।

তাহলে যাত্রী কত ছিল

প্রাণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা প্রথম থেকেই বলছিলেন, নৌযানটি ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী বহন করছিল। মিলন খানের দেওয়া হিসাবের সঙ্গে যাত্রীদের কথা মিলে যায়। ক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে পৌঁছালে আগুনের সূত্রপাত হয়। ক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী বহন করে মুনাফা বাড়ানোর জন্য মালিকেরা রোটেশন পদ্ধতি চালু করেছেন। ঢাকা-বরগুনা নৌপথে এখন ছয়টি লঞ্চের রুট পারমিট থাকলেও কোনো দিন দুটির বেশি লঞ্চ চালানো হয় না। মালিকদের মুনাফার তৃষ্ণা মেটাতে যাত্রীদের দম ফেলার জায়গা থাকে না ডেকে, বিক্রি হয়ে যায় কেবিনে ঢোকা বের হওয়ার চিকন পাতলা পথগুলো।

মাস কয়েক আগে আমাদের বন্ধু সাব্বির (অভিনেতা নন) তাঁর বয়োবৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে লঞ্চে ঢাকায় আসছিলেন। মাঝরাতে ভারী কিছু পড়ার শব্দে আর বিলাপের আওয়াজে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। দেখেন তাঁর বাবা পড়ে আছেন দরজার সামনে। তিনি টয়লেটে যাওয়ার জন্য কেবিন থেকে বেরিয়ে হোঁচট খান দরজায় সামনে শুয়ে থাকা একজনের সঙ্গে। মাথায় চোট পান তিনি। সাব্বির এই অব্যবস্থার কোনো বিচার পাননি। বাবার মাথার রক্তপাত বন্ধের জন্য ফার্স্ট এইড বক্সের খোঁজ করলে হাসির শব্দ শোনেন।

চলন্ত লঞ্চে চলে লঞ্চের শাসন

এত বড় বড় বিলাসবহুল লঞ্চ, কিন্তু সুষ্ঠুভাবে টিকিট কাটার কোনো ব্যবস্থা নেই। একে–ওকে ধরে টিকিট কাটতে হয়। তথাকথিত বিলাসবহুল নয় এমন লঞ্চের ঝক্কি আরও বেশি। রাত যত বাড়তে থাকে, বাথরুমে তত নিশ্বাস বন্ধ হতে থাকে, নিশ্বাস বন্ধ করেও সেখানে তখন যাওয়ার উপায় থাকে না। বিছানার চাদর বা লেপ থাকলেও সেগুলো এই করোনার সময় ঠিকমতো ধোয়া হয় না। ইঁদুর আরশোলা অনেক কেবিনে চিরস্থায়ী পত্তনি নিয়েছে। অনেকেই এখন কেবিনে উঠে নিজ দায়িত্বে ফাঁকফোকর বন্ধে ব্যবস্থা করেন। লঞ্চ কর্মচারীদের এসব নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে কেউ কোনো দিন কোনো ফল পেয়েছেন কি না, জানা নেই। স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া জেলা পর্যায়ের একজন বিচারক এটাকে বলেছেন, ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গোঁয়ার্তুমি।’

আগুন লাগা লঞ্চেও তা–ই ঘটেছে। ডেকের যাত্রীরা বারবার বলেছেন, অনেক অনেক তাপ বেড়েছে। আওয়াজ অন্য রকম লাগছে। লঞ্চের কর্মীরা তাতে কোনো পাত্তা দেননি, বরং ধমক দিয়ে ঠান্ডা করে দিয়েছেন। কিন্তু আগুন ঠান্ডায় মন দেয়নি।

লঞ্চে চলা অব্যবস্থাপনা আর গোঁয়ার্তুমির শাসন সম্পর্কে দক্ষিণের জেলাগুলোর হর্তাকর্তারা যে ওয়াকিবহাল নন, তা নয়। নিয়মিত যাতায়াত করেন এমন একজন যাত্রী বলেছেন, ‘তাঁরা ভিআইপি কেবিনে যাতায়াত করেন। দক্ষিণের জেলা–উপজেলার কর্মকর্তাদের জন্য ভিআইপি কেবিন ধরা থাকে, তারা ১০ মিনিটের নোটিশে, কোনো কোনো সময় কর্মকর্তার ভার অনুযায়ী হয়তো বিনা ভাড়ায় সবচেয়ে বিলাসবহুল কেবিনটাতে পরিবার–পরিজন নিয়ে চলে যেতে পারেন। তাহলে আর অব্যবস্থাপনা নিয়ে কে কার কাছে জবাব চাইবেন আর জবাব দেবেন?’

আগুন, এরপরের অব্যবস্থাপনা

একজন প্রতিমন্ত্রী বরিশাল মেডিকেলের অব্যবস্থাপনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন ঘটনার পরদিন। আগুন কেন লাগল কীভাবে তা ছড়াল, কার কীদায়দায়িত্ব, তা নিরূপণের জন্য গোটা চারেক কমিটি হয়েছে। এ যেন রুগ্‌ণ শিশুর গলায় ঝুলতে থাকা অজস্র মাদুলি। সুস্থ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পর তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, তারাও আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করবে। এত বর্ণের এত আকারের এতগুলো তদন্ত কমিটির কী দরকার, জানতে চেয়ে বরিশালের এক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ই–মেইল পাঠিয়েছিলেন। সে প্রশ্ন অনেকেরই। প্রশ্ন এসব তদন্ত কমিটির কাজের পরিধি আর কর্তব্য নিয়ে। তাদের কাজের ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ আমজনতা জানে না। তবে তদন্তের ফলাফলের আগেই বিভাগীয় কমিশনার বলেছেন, চালক অদক্ষ ছিলেন। তাহলে চার শতাধিক যাত্রী নিয়ে চলাচলকারী লঞ্চ চালানোর দায়িত্ব একজন অদক্ষ চালককে কেন দেওয়া হবে? মন্ত্রী বলেছেন, আগুন রহস্যজনক। মালিকেরা বলেছেন, ষড়যন্ত্রমূলক। জতুগৃহে পাণ্ডবদের সঙ্গে কুন্তীর আগুনে পুড়ে মরলে মহাভারতে হয়তো সে আগুনকে রহস্যজনকই বলা হতো।

বরিশাল মেডিকেলে আগুনে পোড়া মানুষ আসার পর জানা গেল সেখানকার বার্ন ইউনিট বন্ধ। এই দায়িত্ব কে নেবে? একজন আগুনে ঝলসানো রোগীর জন্য ‘ঝালকাঠি টু ঢাকা ভায়া বরিশাল’ যে কঠিন অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার শামিল, সেটা কে কাকে বোঝাবে।

নিখোঁজদের হন্যে হয়ে খুঁজছেন স্বজনেরা

নিখোঁজদের খোঁজ পেতে দিগ্‌বিদিক ছুটছেন স্বজনেরা। নিখোঁজদের সন্ধান পেতে স্বজনেরা বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল, ঝালকাঠি হাসপাতাল ও ঘটনাস্থলে হন্যে হয়ে ছুটছেন। এসব জায়গায় না পেয়ে কেউ কেউ ট্রলার নিয়ে নদীর বিভিন্ন প্রান্তে নিখোঁজদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিখোঁজের সংখ্যা নিশ্চিত করে কেউ কোনো তথ্য দিতে পারেনি। তবে স্বজনদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয় জেলা পুলিশ ৩৭ জন ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ঝালকাঠি ইউনিট নিখোঁজ হিসেবে ৫১ জনের তালিকা দিয়েছে। এ ধরনের দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে একটা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল কাজ করার কথা। নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থাকবে যেখানে গেলে স্বজনেরা পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য পাবেন। নিখোঁজদের নাম দিতে পারবেন। কে কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, সেটা জানতে ও জানাতে পারবেন। এগুলো শুরু হতে যত দেরি হবে মানুষের কষ্ট আর যন্ত্রণা ততই বাড়বে।

বিবিসিকে একজন যাত্রী বলেছেন, ‘আগুন লেগে বহু হতাহতের ঘটনার পর তিনি লঞ্চে যাতায়াতে ভয় পেতে শুরু করেছেন। বাসে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয়। কিন্তু লঞ্চে হাঁটাচলা করা যায়, বাথরুম আছে। রাতে উঠে ঘুম দিলে সকালেই ঢাকা। আগে ভালো করে খেয়াল করি নাই, কিন্তু এখন চিন্তা করে দেখতে পাচ্ছি, আমরা যেসব লঞ্চে চড়ি, তা তো পুরোপুরি নিরাপদ না। কেবিনে লাইফ জ্যাকেট থাকে না। বারান্দায় যে বয়া (জীবনরক্ষার সরঞ্জাম) ঝোলানো থাকে, সেগুলো সবার জন্য যথেষ্ট না। আগুন নেভানোর যন্ত্রও থাকে না।’

অনাস্থার এই উইপোকা কুরে কুরে খেতে থাকবে। তারপরও নিরুপায় মানুষ লঞ্চে চড়বে। বাড়ি যাবে, ঢাকায় ফিরবে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট শুয়ে থাকে আলমারিতে। উইয়ের খাদ্য হয় কখনো কখনো। বেশি চিল্লাবিল্লা করলে মাস্টার, সুকানিদের জরিমানা হয়। সমস্যা যে তিমিরে, সেই তিমিরেই থেকে যায়। সমাধান হয় না। নৌযানের ফিটনেস ঠিক নেই। চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। ৮–১০ জন সার্ভেয়ার দিয়ে কি ৭–৮ হাজার নৌযান দেখভাল করা সম্ভব? এসবই জানা কথা, পুরোনো বচন!! হাত দিতে হবে মূল জায়গায়। এখন প্রশ্ন সেই জায়গাটা আমরা চিনি কি না। চিনলেও হাত দিতে রাজি কি না। নাকি রহস্য আর ষড়যন্ত্রের ঘেরাটোপে আমাদের স্বাচ্ছন্দ্য বেশি?

লেখক: গবেষক [email protected]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন