লাখো পুণ্যার্থীর ঢল সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ধামে

শিবচতুর্দশী মেলার দ্বিতীয় দিনে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আসা পুণ্যার্থীদের ঢল নেমেছে চন্দ্রনাথ মন্দিরে। এখানে ওঠার পথে জনজটের সৃষ্টি হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে তীর্থযাত্রীদের। তারপরও মানুষের কমতি নেই।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে পূর্ব দিকে দিকে তাকালে দুই পাহাড়ের চূড়ায় চোখে পড়ে দুটি মন্দির। এর একটি বিরুপাক্ষ মন্দির, অন্যটি চন্দ্রনাথ মন্দির। দুটি পাহাড়ের মধ্যে চন্দ্রনাথ মন্দিরই বেশি উঁচুতে। ১২০০ ফুট উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে লাখো পুণ্যার্থীর অভীষ্ট স্থল। ফাগুন মাসে শিবচতুর্দশী বা শিবরাত্রিকে উপলক্ষ করে প্রতিবছরই জমে ওঠে মেলা।
সীতাকুণ্ড বাজার থেকে শুরু হয়ে পাহাড় পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার পথে দোকানপাটের সারি। শাঁখা-সিঁদুর-শঙ্খ-পূজার তৈজসপত্রের দোকান, মিষ্টি-জিলাপির দোকান, ভাতের রেস্তোরাঁ, খেলনা, কাঠের সামগ্রীর দোকান, নিত্য ব্যবহার্য নানা সামগ্রীর দোকান। অভাব নেই কোনো কিছুর।
তিন দিন ধরে চলে মূল মেলা। এরপরও দোল পূর্ণিমা পর্যন্ত চলে এই মেলা।

মেলার লাখো মানুষের অনেকেই শংকর মঠ, শ্মশান, গিরিশ ধর্মশালা, ননী গোপাল তীর্থ মন্দির, ভৈরব ধর্মশালায় এসব জায়গায় থাকে।
সীতাকুণ্ড বাজার থেকে রেললাইন হয়ে প্রথমে পড়বে শংকর মঠ। এর সামনেই ব্যাস কুণ্ড। এখানে এখন দিনভর চলে পুণ্যস্নান ও তর্পন। এটি পার হয়ে পাহাড়ের দিকে উঠতেই পাওয়া যায় রামসীতার মন্দির। সেখানে আছে সীতাকুণ্ড। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, ভ্রাতৃবধূ সীতাকে রেখে লক্ষ্মণ যে কুণ্ড তৈরি করেছিলেন, এটি তা-ই। রামায়ণে বর্ণিত সেই ১৪ বছরের বনবাস আসলে হয়েছিল এখানেই।
মেলা আর ছোটখাটো মন্দির পেরিয়ে পাহাড়ে ওঠার পালা। ওঠার জন্য সেই পাহাড়ে আছে আছে সিঁড়ি। তবে সেই সিঁড়ি ভাঙতেও হাঁপিয়ে উঠবে যে কেউ।
হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, সতীর একান্ন পীঠের একটি পিঠ এখানে। পাহাড়ে উঠে প্রথম পড়ে বিরুপাক্ষ মন্দির। এটিকে ছেড়ে পূর্বদিকে আঁকাবাঁকা যে পথ চলে গেছে, সেখানে পাহাড়ের একেবারে চূড়ায় চন্দ্রনাথ মন্দির। গতকাল শুক্রবার সারা দিন উপবাস থেকে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে মন্দিরগুলোতে দুধ ও ডাবের জল দিয়ে শিবকে স্নান করান। দুটি পুরোনো বটগাছের পাশেই মন্দির। সুউচ্চ এই পাহাড়ি মন্দির থেকে দূরের বিশাল বঙ্গোপসাগর দেখে আপনার চোখ জুড়িয়ে দেবে।
পাহাড়ের নিচ থেকে পিঁপড়ার সারির মতো মানুষের সারি আপনার চোখে পড়বে। সবুজ পাহাড়ে নানা বর্ণের জামাকাপড় পরা মানুষের সারি এক ভিন্ন আমেজ তৈরি করে।
এদিকে আজ এই মেলাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রচণ্ড ভিড়। দূর দূরান্তের মানুষ সেখানে এসেছেন। এঁদেরই একজন কল্লোল বৈষ্ণব(৫২)।
গাজীপুরের কাপাসিয়া এলাকার এই বাসিন্দা প্রথম আলোকে বলেন, তিনি সীতাকুণ্ড সদর থেকে সকাল ছয়টায় রওনা দিয়ে দুপুর আড়াইটায় চন্দ্রনাথ ধামে ওঠেন।
নেত্রকোনা থেকে আসা নমিতা মজুমদারের অভিযোগ, তিনি রাত ১০টার দিকে চন্দ্রনাথ মন্দিরের উদ্দেশে রওনা হন। রাতে বিরুপাক্ষ মন্দির এলাকায় পথে বাতি ছিল না। তাই মন্দিরের জন্য আনা মোমবাতি জ্বালিয়ে তারা ওঠার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অন্ধকারের কারণে তীব্র জট লেগে যায়। ভোর সাতটার দিকে চন্দ্রনাথে ওঠেন।

নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে আসা জুয়েল মজুমদারের অভিযোগ, গত শুক্রবার রাতে তার মানিব্যাগ নিয়ে গেছে পকেটমার। মানিব্যাগে ৮ হাজার ৫০০ টাকা ও ভোটার আইডি কার্ড ছিল। পরে বাড়ি থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা এনেছেন।
পথে বাতি না থাকার কথা স্বীকার করেছেন মেলা কমিটি সাধারণ সম্পাদক ও সীতাকুণ্ড পৌরসভার প্যানেল মেয়র হারাধন চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও জেনারেটরের সাহায্যে বাতি জ্বালানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পারেননি।
এমন নানা অভিযোগ, ভিড়, খানিকটা অব্যবস্থাপনার মধ্যে চলছে মেলা। মানুষের নিবিড় সম্মিলন। প্রতিবছরের মতো পাহাড়সংলগ্ন এ জনপদে সৃষ্টি হয়েছে উৎসব।
