default-image

কোনো ঐতিহাসিক স্থানে এলে এমনটা হয়তো অনেকেরই হয়। ‌‘সময় ভ্রমণ’ করে চলে যেতে ইচ্ছে করে পেছনে, ঐতিহাসিক ঘটনার সেই পর্বে। একতলা লম্বাটে স্কুল ভবনটির সামনে এসে চলে গেলাম সেই সময়টায়। ঠিকঠাক হিসাব কষলে সেটা ২৮৭ বছর আগে; ১৭৩৪ সালে বা এর আগে-পরে। এখনকার গাজীপুর জেলার নাগরী গ্রামে এলেন এক পর্তুগিজ পাদরি। তাঁর হাতেই রচিত হয় বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ। তিনি মানোএল দা আসসুম্পসাউ।

এখনো চারপাশের সবুজের বাড়বাড়ন্ত বলে দেয়, পাদরি মানোএল দা আসসুম্পসাউয়ের এ গির্জা এবং তাঁর আবাসস্থলের আশপাশ তখন কেমন ছিল। স্থানীয় বয়স্ক একজন জানালেন, ৫০ বছর আগেও চারপাশের গজারি বনে ছিল বাঘের ডেরা। সেই আরণ্যক পরিবেশে গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে বাংলা ভাষাটি বোঝার চেষ্টা করেছেন এই ক্যাথলিক সাধু। ধর্ম প্রচারের জন্য তো এ অঞ্চলের ভাষা জানা দরকার। তাই নানা শব্দ সংগ্রহ করছেন। তা লিখে রাখছেন খাতায়। কিন্তু এ ভাষার তো ব্যাকরণ নেই। পাদরি তাই হাত দিলেন ব্যাকরণ লেখার কাজে। টানা প্রায় এক দশক পরিশ্রম করলেন। লেখার কাজ শেষ হলে তিনি চলে যান নিজ দেশ পর্তুগালে। সে দেশের রাজধানী লিসবনে ছাপা হয় বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ। ১৭৪৩ সালে।

বিজ্ঞাপন

গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী গ্রামে ‌‘সাধু নিকোলাসের ধর্মপল্লি’তে বসেই বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনা করেছেন আসসুম্পসাউ। আজও রয়ে গেছে সেই ধর্মপল্লি। যে ভবনটিতে বসে পাদরি আসসুম্পসাউ রচনা করেছিলেন ব্যাকরণ, সেটা ভেঙে গড়ে তোলা একতলা ভবনে এ ধর্মপল্লির সেন্ট নিকোলাস হাইস্কুলের ক্লাস চলে। পাশে রয়েছে অধ্যক্ষের বাসভবন। ১৯ ফেব্রুয়ারির দুপুরে এখানে দাঁড়িয়ে এ গির্জার এখনকার ফাদার জয়ন্ত এস গোমেজ বলছিলেন, ‌‘এখানেই ছিল ফাদার মানোএলের বাসস্থান। সেই ভবনে বসেই লিখেছিলেন প্রথম বাংলা ব্যাকরণটি। পুরোনো লাল রঙের ভবন আমিও দেখেছি।’

ফাদার জয়ন্ত যে জায়গাটিকে আসসুম্পসাউয়ের বাসভবন বলে দেখালেন, তার সামনে এখন বাস্কেটবল খেলার স্থান। পাশে স্কুলের ছেলেদের হোস্টেল। অদূরে কলেজ ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। ধর্মপল্লির ভেতরে দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি স্কুল ও কলেজ, হোস্টেল—সবই আধুনিক রীতিতে তৈরি। কেবল ১৮২০ সালের দিকে তৈরি প্রাচীন গির্জাটি রয়েছে ধর্মপল্লির শেষ প্রান্তে। এখানে পুরোনো কোনো নিদর্শন বলতে এটাই আছে।

তবে আসসুম্পসাউ যে প্রথম বাংলা ব্যাকরণ লিখেছিলেন, তা অজানা থাকায় অনেকেই ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডকে প্রথম বাংলা ব্যাকরণের রচনার কৃতিত্ব দিতেন। কিন্তু ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরিতে প্রথম আসসুম্পসাউয়ের এ ব্যাকরণের সন্ধান পান। ১৯২২ সালে তিনি তা দেশে নিয়ে আসেন। সুনীতিকুমার ও প্রিয়রঞ্জন সেন সম্পাদিত পাদ্রি মানুএল-দা-আসসুম্পসাঁউ রচিত বাঙ্গলা ব্যাকরণ বইতে লিখেছেন, ‌‘‌বাঙ্গালাদেশে পোর্ত্তগীস খ্রীষ্টানদের এক বড় কেন্দ্র নাগরী বা ভাওয়ালে বসিয়া ১৭৩৪ সালে পাদ্রি মানুএল-দা-আসসুম্পসাঁউ এই বাঙ্গালা ব্যাকরণ ও অভিধানখানি লেখেন। পাদরি মানুএল, পরবর্ত্তী যুগের কেরী মার্শম্যান প্রভৃতিগণের পক্ষে এক প্রধান পথিকৃৎ। বাঙ্গালা গদ্য সাহিত্যের পত্তন যাঁদের দ্বারা হইয়াছিল, তাঁহাদের একজন হিসাবে, এবং বাঙ্গালা ব্যাকরণের রচয়িতা হিসাবে, পাদ্রি মানুএল প্রত্যেক বঙ্গভাষী ও বাঙ্গালী সাহিত্যানুরাগীর সম্মানের পাত্র, এবং তাঁহার ব্যক্তিত্ব ও জীবনী আমাদের কৌতূহলের বিষয় হওয়া উচিত।’

পাদরি আসসুম্পসাউকে নিয়ে আমাদের কৌতূহলের জবাব দিতে গিয়ে ফাদার জয়ন্ত বলেন, এ গির্জার গোড়াপত্তন ১৬৬৩ সালে। তবে প্রথম ফাদার হিসেবে হয়ে আসেন লুইস ডজ আঞ্জুস ১৬৯৫ সালে। সেই হিসাবে, এ গির্জার চতুর্থ ফাদার ছিলেন আসসুম্পসাউ।

বিজ্ঞাপন

এই পাদরি শুধু বাংলা ব্যাকরণ লিখেই ক্ষান্ত হননি। তিনি বাংলা-পর্তুগিজ শব্দকোষ এবং পর্তুগিজ-বাংলা শব্দকোষও রচনা করেছিলেন। ব্যাকরণ বইয়ের ৪০ পৃষ্ঠার সঙ্গে এ দুটিও যুক্ত ছিল। তাই মোট পৃষ্ঠার সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৫৯২। তাঁর আরেকটি কীর্তি‌ কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ নামের ৩৯১ পৃষ্ঠার বই। এখানে গুরু-শিষ্যের কথোপকথনের মাধ্যমে খ্রিষ্টান ধর্মের পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে। আসসুম্পসাউয়ের বইয়ের অংশবিশেষ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ১৯৩১ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশ করেন।

২০১৮ সালে বাংলাদেশে সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয় ‌পাদ্রী মানোএল দা আসসুম্পসাওঁ রচিত বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ নামে ব্যাকরণ অংশ প্রকাশ করে। এ বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন গণবিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা, যোগাযোগ ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক মনসুর মুসা। সেখানে তিনি জানান, ২০১৫ সালে ড. মাহমুদ শাহ কোরেশী পর্তুগালের এভোরা শহরে এভোরা পাবলিক লাইব্রেরিতে রাখা ব্যাকরণ ও শব্দকোষ এবং কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ—এ দুই বইয়ের মূল বইগুলোর ফটোকপি ও সিডিতে সফট কপি নিয়ে আসেন।

মনসুর মুসা গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‌‌স্বাধীন বাংলাদেশে আসসুম্পসাউয়ের ব্যাকরণের পুনর্মুদ্রণ গণবিশ্ববিদ্যালয়ই প্রথম প্রকাশ করল। ভাষার গবেষণার জন্য শুধু নয়, ইতিহাসের নিরিখে আসসুম্পসাউয়ের এ ব্যাকরণ এক বড় সম্পদ।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন