default-image

একটি বড় বোর্ডের মাঝখানে রঙিন কাগজের ফুল-পাতার সঙ্গে শিশুদের নানা কর্মকাণ্ডের ছবি। বোর্ডের চারপাশে শিশুদের পাসপোর্ট আকারের ছবি। ক্যানসারের সঙ্গে যুঝে এই শিশুদের কেউ বেঁচে আছে, কেউ বেঁচে নেই। ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের সহায়তা ও চিকিৎসার জন্য ‘আশিক ফাউন্ডেশন’ নামের একটি বেসরকারি সংগঠনের প্রবেশপথের চিত্র এটি।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংগঠনটির এই প্রবেশপথ ধরে এখন যাতায়াত করতে হয় কিশোরগঞ্জের এক কলেজশিক্ষককে। শারীরিক ও মানসিক যত্নে শিশুটিকে রাখা হয়েছে সংগঠনটির প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটে (পিসিইউ)। প্যালিয়েটিভ কেয়ারের বাইরে বসে কথা হচ্ছিল ওই শিক্ষকের সঙ্গে। ভেতরে ছেলেটি ঘুমিয়ে ছিল। সঙ্গে ছিলেন শিক্ষক মা ও ২০ মাস বয়সী ছোট ছেলে।

সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু হলে ৮০-৯০ ভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের ক্যানসার ভালো হয়।
মমতাজ বেগম, শিশু রক্তরোগ ও ক্যানসার বিভাগের প্রধান, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

ওই কলেজশিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৯ সালের মার্চে ছেলেকে গোসল করানোর সময় পেটের এক পাশে চাকার মতো লাগে তাঁর। চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে তিনি পরীক্ষা করে ক্যানসার সন্দেহ করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ছেলের অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া বা এএলএলের (ব্লাড ক্যানসারের একটি ধরন) চতুর্থ ধাপ শনাক্ত হয়।

শিশুটির চিকিৎসক মুমতাহিনা আজম প্রথম আলোকে জানান, শিশুটির শারীরিক অবস্থা এখন বেশ গুরুতর।

বিজ্ঞাপন

শিশু ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশে প্রতিবছর আনুমানিক ৯ হাজার শিশু নতুনভাবে ক্যানসার আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ২৫ শতাংশের কম শিশুর ক্যানসার শনাক্ত বা নির্ণয় হয়। শনাক্তের পর ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রেই চিকিৎসা অব্যাহত থাকে না। অসচেতনতা, শনাক্তে দেরি হওয়া, আর্থিক সংকট, অপর্যাপ্ত চিকিৎসাব্যবস্থা এর জন্য দায়ী। এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শিশু ক্যানসার দিবস।

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশু রক্তরোগ ও ক্যানসার বিভাগের প্রধান মমতাজ বেগম প্রথম আলোকে বলেন, বড়দের ক্যানসারের সঙ্গে শিশুদের ক্যানসারের মিল নেই। শিশুদের ক্যানসারকে মোটাদাগে ১২টি ভাগে ভাগ করা হয়। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু হলে ৮০-৯০ ভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের ক্যানসার ভালো হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তান ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে, শুরুতে মা-বাবা কিছুতেই তা বিশ্বাস করেন না। তাঁরা নানাজনের কথায় বিভ্রান্ত হন, নানা জায়গায় চিকিৎসা করাতে শুরু করেন। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে শিশুটি ক্যানসারের চতুর্থ ধাপে চলে আসে। মা-বাবাও তত দিনে আর্থিকভাবে অসচ্ছল হয়ে পড়েন। খুবই দুঃখজনক যে আর্থিক সংকট ও অসচেতনতার কারণে ৫০ শতাংশের মতো শিশুর চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়।

রাজধানীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, বিএসএমএমইউ এবং সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু ক্যানসার চিকিৎসার পূর্ণাঙ্গ বিভাগ রয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া পুরোনো আটটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিভাগ থাকলেও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাব্যবস্থা নেই। সার্জারি, কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন—এই ধাপগুলো পূরণ না করলে ক্যানসারের চিকিৎসা পূর্ণাঙ্গ হয় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যথাযথ চিকিৎসাসুবিধা আছে, এমন উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে ক্যানসারে আক্রান্ত ৮০ শতাংশ শিশু সুস্থ হয়। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এ হার ১৫ থেকে ৪৫ শতাংশ। গ্লোবাল ক্যানসার অবজারভেটরি ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশে ওই বছর নতুন আক্রান্ত হয়েছে মোট ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৭৫ জন। ওই বছর মারা গেছে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৯০ জন। শিশুদের তথ্য আলাদাভাবে দেওয়া নেই।

বিএসএমএমইউর শিশু রক্তরোগ ও ক্যানসার বিভাগের প্রধান মো. আনোয়ারুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, বছরে আনুমানিক ৯ হাজার শিশু নতুনভাবে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে শনাক্ত হয় দুই হাজারের মতো। গত দুই বছরে বিএসএমএমইউতে ৬০০ শিশু শনাক্ত হয়েছে। বছরে গড়ে ৪০ শতাংশের মতো সুস্থ হয়। ২০১৯ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত ৬০ শতাংশের মতো শিশু সুস্থ হয়েছে। তিনি জানান, বিএসএমএমইউতে শিশু ক্যানসার চিকিৎসার জন্য ৩১টি শয্যা রয়েছে।

চিকিৎসা নিয়ে হিমশিম, রয়েছে অসচেতনতাও

ওই কলেজশিক্ষক জানান, গত দুই বছরে তাঁর সন্তানের চিকিৎসায় খরচ হয়েছে ১০ লাখ টাকার মতো। এর মধ্যে দুই লাখ টাকা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করেছেন। এ ছাড়া বাবার বাড়ি-শ্বশুরবাড়ি থেকে আর্থিক সহায়তাও পেয়েছেন কিছু। করোনাকালেও তিনি চিকিৎসা ব্যাহত হতে দেননি।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক বিজ্ঞান, ওষুধ ও প্রযুক্তিবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষক সংস্থা এলসেভিয়ার ২০১৫ সালের অক্টোবরে তাদের সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশে এএলএলে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার ব্যয় তুলে ধরেছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০-১১ সালে বিএসএমএমইউর বিনা মূল্যের শয্যায় চিকিৎসা নেওয়া ৫০টি শিশুর পরিবারের ব্যয় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, একেকটি পরিবারের ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ টাকা। এর প্রায় ৪৯ শতাংশ ব্যয় হয়েছে ওষুধ কেনা বাবদ।

বিজ্ঞাপন

যথাযথ চিকিৎসাব্যবস্থা নেই

শিশু ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রাজধানীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, বিএসএমএমইউ এবং সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু ক্যানসার চিকিৎসার পূর্ণাঙ্গ বিভাগ রয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া পুরোনো আটটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিভাগ থাকলেও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাব্যবস্থা নেই। সার্জারি, কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন—এই ধাপগুলো পূরণ না করলে ক্যানসারের চিকিৎসা পূর্ণাঙ্গ হয় না।

বছরে আনুমানিক ৯ হাজার শিশু নতুনভাবে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে শনাক্ত হয় দুই হাজারের মতো। গত দুই বছরে বিএসএমএমইউতে ৬০০ শিশু শনাক্ত হয়েছে। বছরে গড়ে ৪০ শতাংশের মতো সুস্থ হয়।
মো. আনোয়ারুল করিম, বিএসএমএমইউর শিশু রক্তরোগ ও ক্যানসার বিভাগের প্রধান

শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড চাইল্ড ক্যানসারের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে ১ শতাংশের কম শিশু প্যালিয়েটিভ কেয়ার সুবিধা পায়।

আশিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সালমা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসা নেওয়া শিশু পাঁচ বছর পর্যবেক্ষণে থাকার পর তাকে সুস্থ ঘোষণা করা হয়। সাধারণত এএলএলে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে ৮-৯ বছর সময় লেগে যায়। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত আশিক ফাউন্ডেশনের বাংলামোটরের আশ্রয়কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছে ৮৫০ শিশু। একেকজন রোগীকে গড়ে ৩০-৩৫ বার আসতে হয়েছে। এর মধ্যে ক্যানসার জয় করেছে ১৭১ জন। মারা গেছে ৩২৫ জন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন