শিক্ষকদের কোচিং বাড়ছে, নীতিমালা কাগজেই

মিরপুরের মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের সামনে ১৯ জুন কথা হয় বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করা মো. হুমায়ুনের সঙ্গে৷ তাঁর দুই সন্তান পড়ে ওই স্কুলে, একজন পঞ্চম শ্রেণি ও আরেকজন দশম শ্রেণিতে। পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলেকে স্কুলের শ্রেণিকক্ষের বাইরে স্কুল কর্তৃপক্ষের বাধ্যতামূলক কোচিংয়ে পড়তে হয়। এর বাইরে সৃষ্টি নামে একটি বেসরকারি কোচিং সেন্টারে পড়ানোর জন্য মাসে দিতে হয় দুই হাজার টাকা। আর বড় ছেলেকে শ্রেণিকক্ষের বাধ্যতামূলক কোচিং ছাড়াও পাঁচটি বিষয়ে পাঁচজন শিক্ষকের কাছে পড়ার জন্য প্রতি বিষয়ে এক হাজার করে টাকা দিতে হচ্ছে।
সারা দেশেই কোচিং ও প্রাইভেট এখন ভয়াবহরকমভাবে বেড়ে গেছে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ছাত্রী হয়রানির মতো ঘটনাও ঘটছে কোচিং-প্রাইভেটে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির অভিযোগ করেন, সরকারের উদাসীনতার কারণেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোচিং নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা করলেও শিক্ষকেরা সেটি মানছেন না।
কয়েক দিন আগে রাজধানীর শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছিলেন, ৩২ হাজার কোটি টাকার কোচিং-বাণিজ্য হয়। এটা বন্ধ করতে গেলে হয়তো তাঁকে মেরে ফেলার জন্য ১০ কোটি টাকা খরচ করে ফেলা হতে পারে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১২ সালের আগস্টে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা’ জারি করে। নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার কোনো শিক্ষক তাঁর নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। এমনকি শিক্ষকেরা বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারেও পড়াতে পারবেন না। তবে দিনে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ শিক্ষার্থীকে নিজ বাসায় পড়াতে পারবেন। আর সরকার-নির্ধারিত টাকার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরই পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ক্লাস করানো যাবে। এ জন্য কাউকে বাধ্য করা যাবে না।
বাস্তবে যা হচ্ছে: কাগজে নীতিমালা থাকলেও একাধিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অসংখ্য শিক্ষক নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রাইভেট-কোচিং পড়াচ্ছেন।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাধিক শিক্ষক ও অভিভাবক প্রথম আলোকে বলেন, এই বিদ্যালয়ের প্রায় ৬০০ শিক্ষকের মধ্যে প্রায় ১০০ শিক্ষক প্রাইভেট-কোচিংয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। শাহজাহানপুর এলাকায় কয়েকজন শিক্ষক আছেন যাঁরা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় পড়ানোর সময় মাইক্রোফোন পর্যন্ত ব্যবহার করেন।
এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাইভেট-কোচিংয়ের বিষয়ে সরকারি নীতিমালা মানার জন্য শিক্ষকদের তিন মাস পর পর নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু কেউ বাসায় পড়ালে সেখানে আমরা কী করতে পারি। সরকার তাঁদের পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে নিক।’
মিরপুর মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির আশপাশে অসংখ্য কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের ব্যাচভিত্তিক পড়ানোর সাইনবোর্ড ও দেয়াল লিখনে সয়লাব হয়ে আছে পুরো এলাকা। কয়েকজন অভিভাবক প্রথম আলোকে বলেন, এসব কোচিং সেন্টারের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই মনিপুর স্কুল ও কলেজের।
ব্যবস্থা নেই: সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষক কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তাঁর এমপিও স্থগিত বা বাতিলসহ সাময়িক বা চূড়ান্ত বরখাস্ত করার কথা। এমপিওর বাইরের কোনো শিক্ষক কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত থাকলে প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত বেতন-ভাতা স্থগিতের পাশাপাশি তাঁকে বরখাস্ত করা যাবে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক কোচিং-বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তা পেশাগত অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে এবং সে জন্য তাঁর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা আপিল বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর নীতিমালা মানা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আলাদা তদারক কমিটি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নীতিমালা কেবল কাগজেই থেকেছে। অবশ্য এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার শিক্ষককে একবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে সরকার।
জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফাহিমা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, কোচিং-প্রাইভেটের কারণে সরকারি কলেজের কিছু শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে। তবে মানুষের নৈতিক স্খলন হলে তা শুধু নীতিমালা ও বিধি দিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হয় না। তার পরও চেষ্টা করা হচ্ছে।