বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভারতের নয়াদিল্লিতে বাস পরিচালিত হয় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান দিল্লি পরিবহন করপোরেশনের (ডিটিসি) মাধ্যমে। ডিটিসির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র দেখিয়ে বাসের পাস নিতে পারেন।

ভারতের আরও কয়েকটি রাজ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য বাস ও অন্যান্য গণপরিবহনের ভাড়ায় ছাড় রয়েছে বলে জানা গেছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গে সরকারি বাসের সংখ্যা বেশি। কলকাতার সাংবাদিক ভাস্কর সরদার প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি বাসে সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য ভাড়া ছাড়ের সুবিধা রয়েছে। যেসব শিক্ষার্থীর এই সুবিধা দরকার, তারা স্কুল থেকে একটি কার্ড নেয়। এই কার্ড দেখিয়ে তারা বিনা পয়সায় বাসে চলতে পারে।

কলকাতায় ডিজেলের দাম লিটারে ১০০ রুপি (১১৫ টাকা) ছাড়িয়ে গেলেও সরকারিভাবে বাসভাড়া বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি। ১৭ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের পরিবহনমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে বৈঠক করেন বাসমালিকেরা। তবে ভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে সায় পাওয়া যায়নি। অবশ্য বাসমালিকেরা ভাড়া নির্ধারিত হারের কিছু কিছু বেশি নিচ্ছেন। কলকাতায় বাসে প্রথম ৫ কিলোমিটারের জন্য নির্ধারিত ভাড়া ৮ রুপি। এভাবে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ভাড়া ১৫ রুপি। অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৭ টাকার কিছু বেশি। উল্লেখ্য, ঢাকায় মিরপুর ১০ নম্বর সেকশন থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটারের মতো দূরত্বে বাসভাড়া নেওয়া হয় ৩০ টাকা।

ভারতের মুম্বাইয়েও সরকারি বাস বেশি। এই বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য ভাড়ায় ছাড় আছে। বৃহন্মুম্বই ইলেকট্রিক সাপ্লাই অ্যান্ড ট্রান্সপোর্টের (বিইএসটি) জনসংযোগ কর্মকর্তা মনোজ ভারাদে প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষাবর্ষ ভিত্তিতে দূরত্ব অনুসারে ভাড়ায় ছাড়ের হার নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে মুম্বাই রেলওয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা এ কে জৈন বলেন, লোকাল ট্রেনের প্রথম শ্রেণিতে কার্ডধারী শিক্ষার্থীদের জন্য ভাড়া ৫০ শতাংশ। আর দ্বিতীয় শ্রেণিতে কোনো ভাড়া নেই।

ভারতের আরেক রাজ্য তেলেঙ্গানার হায়দরাবাদে সব বাসই সরকারি। সেখানকার শিক্ষার্থীদের বাস পাস আছে। মাসে এই পাসের মূল্য ১৮৫ রুপি। পাস ব্যবহার করে সাপ্তাহিক ছুটির দিন (রোববার) ছাড়া যেকোনো দিন যেকোনো সময় শহরের যেকোনো স্থানে শিক্ষার্থীরা চলাচল করতে পারে। দশম শ্রেণির নিচের শিক্ষার্থীদের জন্য বাস পাস বিনা মূল্যে দেওয়া।

নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা

নেপালে শিক্ষার্থীদের জন্য বাসভাড়ায় কোনো ছাড় দেওয়া কি না, জানতে চাওয়া হয়েছিল নেপালের সাংবাদিক রবীন্দ্র ঘিমিরের কাছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আন্তনগর ও দূরপাল্লার বাসে বৈধ পরিচয়পত্রধারী শিক্ষার্থীদের ভাড়ায় ৪৫ শতাংশ ছাড় দেয় সরকার। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের বিক্ষোভের মুখে দেশটির সরকার এই ব্যবস্থা চালু করেছে।

পাকিস্তানের পাঞ্জাবের রাজ্য সরকারের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বলছে, ওই রাজ্যের লাহোর, গুজরানওয়ালা, শিয়ালকোট, ফয়সালাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি, মুলতান ও ভাওয়ালপুরে শিক্ষার্থীদের জন্য বাসে পাসের ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য ৪০ রুপিতে ছয় মাস ও ৬০ রুপিতে এক বছরের জন্য এই কার্ড দেওয়া হয়। শহরে যেকোনো দূরত্বে শিক্ষার্থীরা ১০ রুপি দিয়ে চলাচল করতে পারে। ২০১১ সাল থেকে এই ব্যবস্থা চলছে। ৫৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান ও ৪২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এই কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে।

পাকিস্তানের এক্সপ্রেস ট্রিবিউন–এর সাংবাদিক ইউসুফ আনজুম প্রথম আলোকে জানান, দেশটিতে শিক্ষার্থীদের জন্য বাসভাড়ায় ছাড়ের বিষয়টি কাগজ-কলমে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবে তা কার্যকর নয়।

শ্রীলঙ্কা ট্রান্সপোর্ট বোর্ডের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের বিশেষ বাসসেবা রয়েছে। ১২ বছরের চেয়ে বেশি বয়সী শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য এই সেবার আওতায় প্রাপ্তবয়স্কদের অর্ধেক ভাড়া নেওয়া হয়। বয়স ১২ বছরের কম হলে ভাড়া প্রাপ্তবয়স্কদের হারের ২৫ শতাংশ।

ফিলিপাইন সরকার শিক্ষার্থীদের জন্য সব ধরনের গণপরিবহনের ভাড়ায় ২০ শতাংশ ছাড় দিয়ে আইন পাস করে ২০১৯ সালে।

বাংলাদেশে অর্ধেক ভাড়া

বাংলাদেশে অর্ধেক ভাড়ার বিষয়টি চালু হয় পাকিস্তান আমলে। ১৯৬৯ সালে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ যে ঐতিহাসিক ১১ দফা দাবি ঘোষণা করেছিল, তার একটি ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়া রাখার বিষয়টি।

সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের তৎকালীন নেতা ও বর্তমানে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন প্রথম আলোকে বলেন, তখন তাঁদের আন্দোলনের পর ইয়াহিয়া খানের সামরিক আদেশে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি বাস্তবায়িত হয়। অবশ্য তা আইন দ্বারা হয়নি। তিনি বলেন, এই ধারা স্বাধীনতার পরও বহু বছর চালু ছিল। তবে সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, অর্ধেক ভাড়ার বিষয়টি নেই।

ছাড় চান শিক্ষার্থীরা

ঢাকায় বিক্ষোভ করা শিক্ষার্থীরা বলছেন, বাসভাড়া বাড়ানোর আগে তাঁরা অর্ধেক ভাড়া দিতেন। এতে ১৫ টাকার জায়গায় ৮ টাকা দিলেই হতো। এখন ১৫ টাকার ভাড়া ২০ টাকা হয়েছে। তাঁদের ৮ টাকার জায়গায় ২০ টাকা দিতে হচ্ছে। এতে তাঁদের ব্যয় কার্যত বেড়েছে ১৫০ শতাংশ। বাসমালিকদের যুক্তি হলো, ভাড়া নির্ধারণের সময় শিক্ষার্থীদের হাফ পাসের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয় না। তাঁদের পক্ষে কম ভাড়া নেওয়া সম্ভব নয়।

অবশ্য ছাড় পেয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়টির কর্তৃপক্ষ, বাসমালিক ও পুলিশের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে গত মঙ্গলবার ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে সদরঘাট রুটে চলাচলকারী বাসে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরিচয়পত্র দেখিয়ে এ সুবিধা পাবেন।

অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাঁরাও ছাড় চান। গত মঙ্গলবার ঢাকার সায়েন্স ল্যাব এলাকায় বিক্ষোভকালে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রায়হানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একেকজনকে দিনে ৬০ টাকা পর্যন্ত বাসভাড়া দিতে হচ্ছে। এত টাকা আমরা কোথা থেকে পাব? কেন এটা কেউ বুঝতে পারছেন না?’

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি, মুম্বাই ও কলকাতা]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন