বিজ্ঞাপন

গাজির গান মূলত গাজি পীরের বন্দনা। দিদার বাদশা, এরিং বাদশা, গুলে বাকাওলী, সোনাফার বাদশা ও সুফিয়ানী পালাগুলো গাওয়া হয় গাজির গানের আসরে। গাজির গানে নারী-পুরুষের প্রণয়, প্রেম, বিরহসহ নানা ধরনের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে গীত পরিবেশন করা হয়। গ্রামাঞ্চলে সন্তান লাভ, জমিতে অনেক বেশি ফসল পাওয়া, ব্যবসায়িক সাফল্য, নিজেদের কৃষিকাজে ব্যবহৃত গবাদিপশুর রোগবালাই থেকে মুক্তি ও বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সমস্যায় গাজির গানের আসর জমানো হতো। রাতে বাড়ির উঠানে পিঁড়ি কিংবা মাদুর বিছিয়ে বসে গাজির গানের আসর। একজন গায়েন গান ধরেন আর তাঁর সহযোগী হিসেবে কণ্ঠ মেলাতে থাকেন আরও একজন। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশি বাদ্যযন্ত্রবাদক তো আছেনই। বিশেষ করে ঢোলবাদক তাঁর বাদ্যযন্ত্রে মাঝেমধ্যে জাদুকরি তাল তোলেন। এতে মুগ্ধ হয়ে অনেক শ্রোতা উপহার হিসেবে দেন চাল, ডাল, দুধ, ডিমসহ বিভিন্ন ফলমূল। অনেকেই আবার মানত করা অর্থ ফেলে দেন গায়েনের ঝোলায়। গায়েন মাথায় পাগড়ি ও গায়ে আলখাল্লা পরে গান পরিবেশন করেন। তাঁর সঙ্গে থাকে ‘আসাদণ্ড’। তিনি সারাক্ষণ এটি দুলিয়ে দুলিয়ে গান পরিবেশন করেন। গান গাইতে গাইতে মাঝেমধ্যে তিনি পুরো শরীর ঘুরিয়ে আবার ঠায় দাঁড়িয়ে যান। এটি গাজির গানের একটি বিশেষ মুদ্রা। গানের মাঝেমধ্যে বলা হয় বিভিন্ন পবিত্র স্থানের বর্ণনা। এসব বর্ণনায় দলনেতা গায়েনের কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করেন গায়েনের দোহার (সহযোগী)। বর্ণনা শেষে আবারও গান ধরেন। সেই আসাদণ্ড ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আসরের এ মাথা থেকে ও মাথা শরীর দুলিয়ে, বিশেষ মুদ্রায় গাইতে থাকেন গায়েন।

এ দেশের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ গাজির গানের আসর একসময় গ্রামগঞ্জে রাতবিরাতে নিয়মিতই বসত। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন গাজির গান শোনা যায় কালেভদ্রে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা। শিল্পকারখানায় সমৃদ্ধ শ্রীপুরে এখনো টিকে আছে গাজির গান। ইট-কাঠের ফাঁকফোকরে প্রায়ই রাতবিরাতে শোনা যায় ঢাকঢোলের হাঁকডাক। বংশপরম্পরায় গাজির গানকে পেশা হিসেবে ধরে রেখেছেন অনেকেই। এ পেশার অন্তত শতাধিক লোক আছেন গাজীপুরে।

সম্প্রতি খবর আসে শ্রীপুর পৌর শহরের কলেজপাড়া এলাকায় গাজির গানের আসর বসবে। রাত নয়টায় স্থানীয় মোসা. নুরজাহানের বাড়ির উঠানে গান গাইতে আসবেন গাজীপুর সদরের নলজানি গ্রামের আবু সাহিদ গায়েন। রাত সাড়ে নয়টায় বাড়ির উঠানে উপস্থিত হই। উঠানভর্তি লোকজন গান শুনছেন মনোযোগ দিয়ে। পাশেই ঘরের বারান্দায় শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য রান্না করা হচ্ছে খিচুড়ি। রান্না করছেন নুরজাহান নিজেই। গায়েন নিজ মনে গাইছেন। তাঁর সামনে বড় পাত্রের মধ্যে চাল রাখা আছে। সেখানে যে যাঁর মতো কলা, দুধসহ নানা জিনিসপত্র রাখছেন। কিছু নগদ টাকাপয়সাও সেখানে ফেলেছেন অনেকেই। লোকজন গাজির নামে মানত করে এসব সামগ্রী গায়েনের ঝোলাতে ফেলেন।

কথা হয় আয়োজক মোসা. নুরজাহানের সঙ্গে। জানালেন, তাঁর ছেলের ঘরে নাতির জন্ম হলে বাড়িতে গাজির গান আনবেন—এমন মানত করা ছিল অনেক দিন আগে। অবশেষে তাঁর আশা পূরণ হয়েছে। তিনি জানালেন, বছর বিশেক আগে শ্রীপুর তথা গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতি রাতে গাজির গান জমত।

গান গাওয়ার অবসরে কথা হয় গায়েন আবু সাহিদের সঙ্গে। জানালেন, ৫০ বছর ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে গাজির গান গেয়ে যাচ্ছেন তিনি। বর্তমানে মানুষ অনেক বেশি ব্যস্ত। এর মধ্যেও তাঁরা গান শুনতে চান। তাই মাঝেমধ্যে গানের আসরে ডাক পান তিনি। তাঁর আশা, গাজির গান আরও বহু বছর এ দেশের মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকুক।

গাজির গানকে ভালোভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে গাজির গানের ভালো কবিদের উৎসাহিত করা উচিত বলে মনে করেন গাজীপুরের শ্রীপুরের পিয়ার আলী কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান আহম্মাদুল কবীর। তিনি বলছিলেন, খুলনা, সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, ফরিদপুর অঞ্চলে এই গানগুলোর প্রচলন ছিল অনেক বেশি। বিশেষ করে সুন্দরবন ও এর আশপাশের অঞ্চলগুলোতে লোকজন গাজির গানের চর্চা বেশি করতেন। গাজীপুরের নামের সঙ্গে গাজির গানের নামের একটা মিল আছে। তাই এই অঞ্চলের মানুষজনের গাজির গান শোনার আগ্রহ সব সময় ছিল। তাঁর মত, বিভিন্ন পুরাকীর্তি সংরক্ষণের মতোই গাজির গানের মতো লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ করা জরুরি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন