বিটিআরসির সবশেষ এ বছরের এপ্রিলের হিসাব অনুসারে, দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা ১১ কোটি ৫৪ লাখ ৩০ হাজার। এর মধ্যে মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করা হয় ১০ কোটি ৫৬ লাখ ২০ হাজার। আর ব্রডব্যান্ড সংযোগ ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি) এবং পাবলিক সুইচড টেলিফোন নেটওয়ার্ক (পিএসটিএন) গ্রাহকের সংখ্যা ৯৮ লাখ ১০ হাজার।

আইএসপিবির সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম প্রথম আলোকে বলেন, ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়ার সময় হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে অভিভাবকদের হাতে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা দেওয়া যাবে। সফটওয়্যারের মাধ্যমে যেকোনো ওয়াই–ফাই ডিভাইসে ইউআরএলে ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড দেওয়া থাকবে। সেটা দিয়ে প্রোফাইল তৈরি করে অভিভাবকেরা শিশুদের জন্য ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মা–বাবা জানাননি যে তাঁরা এই সুবিধা নিতে চান।

নতুন নীতিমালায় প্যারেন্টাল কন্ট্রোল গাইডেন্স (অভিভাবকদের জন্য নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশনা) নিয়ে বলা হয়েছে, শিশুদের অনলাইন সুরক্ষার জন্য আইএসপির প্যারেন্টাল কন্ট্রোল জরুরি। শুধু আজকের শিশু নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও সুরক্ষিত সাইবার দুনিয়া প্রতিষ্ঠা করতে এ পদক্ষেপ নিতে হবে। নিবন্ধনপ্রাপ্ত আইএসপি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের জন্য ইন্টারনেটের ক্ষতিকর দিক বা অপব্যবহার হতে পারার বিষয়টি সম্পর্কে গ্রাহককে সচেতন করবে। যাতে অভিভাবকেরা ব্রাউজার, সার্চ ইঞ্জিন ও অপারেটিং সিস্টেম সেটিংসের বিষয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন। প্রত্যেক আইএসপিকে তাদের গ্রাহকদের প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সেবার সক্ষমতা থাকতে হবে এবং তা বিনা মূল্যে হতে হবে। প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সার্ভিসের মধ্যে ওয়েবসাইট, চ্যাটরুম, ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং, ছবি ও ভিডিও ফিল্টার করা, ব্যবহারকারী কার্যকলাপ দেখতে পারা, কেউ সেটিংস পরিবর্তন করতে চেষ্টা করলে সতর্ক বার্তা পাঠানো, ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় বেঁধে দেওয়া ইত্যাদি ব্যবস্থা থাকতে হবে।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার টেনামেন্ট ভবনের বাসিন্দা তোহফাতুল জান্নাত জানান, তাঁর বাসায় মার্চে ও তাঁর মায়ের বাসায় ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে আইএসপি পাল্টে ভিন্ন দুটি নতুন ব্রডব্যান্ড সংযোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর স্কুলপড়ুয়া ছোট ভাই আছে। তাঁদের আইএসপি এ রকম নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা আছে বলে জানাননি।

কল্যাণপুরের ১১ নম্বর রোডের বাসিন্দা আমির মোহাম্মদ খানের বাসায় গত ডিসেম্বর মাসে নতুন সংযোগ নেওয়া সময়ও আইএসপি প্যারেন্টাল কন্ট্রোলের কোনো তথ্য দেয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিকস অ্যান্ড মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক লাফিফা জামাল‍ নারী ও শিশুর অনলাইন সুরক্ষার বিষয়ে কর্মরত বেশ কিছু ফোরামের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি নতুন ব্রডব্যান্ড সংযোগ নিয়েছি। প্যারেন্টাল কন্ট্রোলের ব্যবস্থা নিয়ে আমাকে আইএসপি থেকে কিছুই বলা হয়নি।’ তিনি বলেন, আইএসপিরা চায়, তাদের ব্যবসার প্রসার হোক। তাই হয়তো বাড়িতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জানাতে তত আগ্রহী নয়। সন্তানের সুরক্ষার কথা ভেবে অভিভাবকদেরই এখন সচেতন হতে হবে। গুগল ক্রোমসহ বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবস্থা আছে। প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট রোধ করতে সন্তানের বয়স উল্লেখ করে আলাদা ই–মেইল অ্যাকাউন্ট খোলা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ওই ই–মেইল ব্যবহার করে যেসব কনটেন্ট দেখবে, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিল্টার হয়ে আসবে।

এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইএসপিবি সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, বিভিন্ন প্রচারমূলক কার্যক্রমে প্যারেন্টাল কন্ট্রোলের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সংগঠনের অ্যাকাউন্ট থেকে শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেটের বিষয়ে অভিভাবকদের জন্য সচেতনতামূলক পোস্ট দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে প্রচারের ক্ষেত্রে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আইএসপি লাইসেন্সধারীরা প্যারেন্টাল কন্ট্রোলের বিষয়ে ঠিকভাবে কাজ করছে না উল্লেখ করে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা তাদের নিবন্ধন পাওয়ার অন্যতম শর্ত। এ শর্ত আইএসপি না মানলে তাদের নিবন্ধন বাতিল করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি নীতিমালায় যুক্ত করা হবে। আগামী সপ্তাহে বিটিআরসির সঙ্গে বৈঠক করব। করোনাকালে লক্ষণীয় পরিবর্তন যে টেলিকম অপারেটরদের ভয়েস কল ডেটা কলে রূপান্তরিত হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে টেলিকম অপারেটরদেরও প্যারেন্টাল কন্ট্রোল চালু করার ওপর জোর দেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইন্টারনেট সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে মহাবিপদ ডেকে আনা হবে।