বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি থেকে সুরক্ষার জন্য শিশু আইন ২০১৩ সংশোধনীর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সম্মত হলে সংসদে আইন পাস করতে খুব বেশি সময় লাগবে না। শিশুদের শাস্তি দেওয়া থেকে সরে আসতে আইন প্রয়োগের চেয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হওয়া বেশি প্রয়োজন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক শিক্ষক শিশুদের চুল কেটে দেওয়ার মতো শাস্তি দেন। শিশুটির জন্য এটা চরম অপমানজনক। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ লাগে। একটি শিশুর বেড়ে উঠতে শিক্ষকের স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা অনেক বড় ভূমিকা রাখে।

নাছিমা বেগম ও রাশেদ খান মেনন দুজনই অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন।

শিশুদের শাস্তি থেকে সুরক্ষা দিতে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান প্রবীণ শিক্ষকনেতা এবং শিশুর প্রতি শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিরসনে কোয়ালিশনের আহ্বায়ক কাজী ফারুক আহমেদ। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে শিশুকে শাস্তি না দিয়ে শাসনের বিকল্প উপায় বের করা হয়েছে। শুধু প্রশংসা করে, কথা দিয়ে একটি শিশুর মন জয় করা যায়। শিক্ষকদের নিয়োগপত্রে শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া যাবে না—সেটার উল্লেখ থাকতে হবে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সহায়ক হেল্পলাইন ১০৯৮-এর ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহায়মেন জানান, এ বছর ১ লাখ ৪৭ হাজার কল এসেছে এই হেল্পলাইনে। তিনি বলেন, অনেক শিশু মন খুলে কথা বলে, তাদের সমস্যার কথা জানায়। ফোন পেয়ে কাউন্সিলর বোঝার চেষ্টা করেন, কোন আবেগ থেকে সে অস্বাভাবিক আচরণ করছে। অভিভাবক, শিক্ষক প্রত্যেককেই শিশুর অধিকারের বিষয়টি বুঝতে হবে, দায়িত্বশীল হতে হবে।

default-image

মূল প্রবন্ধে ব্লাস্টের জ্যেষ্ঠ অ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা আয়েশা আক্তার জানান, শিশু আইন ২০১৩-এর নবম অধ্যায়ে সংশোধনীর মাধ্যমে শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। শাস্তির ক্ষেত্রে হাত বা অন্য কিছুর মাধ্যমে শিশুকে জখম করা, চক-ডাস্টার ছুড়ে মারা, শরীরে চিমটি কাটা বা কামড় দেওয়া, চুল ধরে টানা বা দুই আঙুলের মাঝে পেনসিল রেখে চাপ দেওয়া ইত্যাদিকে লঘু শাস্তি হিসেবে এবং পা দিয়ে আঘাত করা বা লাথি মারা, ভোঁতা বা ধারালো বস্তু ছুড়ে মারা, বেত্রাঘাত করা বা ছুড়ে মারা, চুল কেটে দেওয়া, শিশুর অভিভাবক, জাতি, বর্ণ, গোত্র বিষয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা ইত্যাদিকে শিশুর প্রতি গুরুতর শারীরিক ও মানসিক শাস্তি গণ্য করে জড়িত ব্যক্তিদের তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্লাস্টের আইনবিষয়ক উপদেষ্টা এস এম রেজাউল করিম বলেন, শিশুকে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দিলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কী হবে, তা স্পষ্ট করা নেই শিশু আইন ২০১৩-তে। আইনে শাস্তির ব্যবস্থা উল্লেখ করলে শিক্ষক, অভিভাবকসহ প্রত্যেকেই জানতে পারবেন শিশুকে সাজা দিলে তাঁদের কতটা শাস্তি পেতে হবে।

সূচনা বক্তব্যে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

২০১৮ সালের জাতীয় জরিপের তথ্য তুলে ধরে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর চাইল্ড অ্যাডোলেসেন্ট মেন্টাল হেলথের প্রেসিডেন্ট আহমেদ হেলাল বলেন, প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১৩ শতাংশ মানসিক রোগে ভুগছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে ৫ শতাংশের রোগ জন্মগত, বাকি ৮ শতাংশ সমস্যায় ভোগে তার পরিবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ইত্যাদির কারণে। মানসিক নিপীড়নের শিকার এই শিশুরা আসে চিকিৎসকের কাছে। মানসিক চাপ শিশুদের নৈতিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।

অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু বলেন, শাস্তি থেকে শিশুদের সুরক্ষা দিতে এলাকাভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শিশুকে শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি সমাজে সহজভাবে নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধ করতে না পারলে শিশুদের স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ কখনো তৈরি করা যাবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন ডিজ-অর্ডারস বিভাগের চেয়ারপারসন তাওহিদা জাহান বলেন, নেতিবাচক ভাষার মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয় ৯০ শতাংশ শিশু। বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের জন্য বাড়তি যত্ন প্রয়োজন। শিশুর বিকাশে শৈশবকালীন পরিবেশকে আনন্দময়ী করে তুলতে হবে।

শাসনের নামে নির্যাতনকে সমাজে অপরাধ মনে না করার প্রবণতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আরাফাত হোসেন খান।

বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন