বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তাসফিয়া বললেন, ‘মুখ পরিষ্কার করার জন্য নিজে গোলাপের পাপড়ির গুঁড়া ব্যবহার করতাম। এতে ভালো ফলও পেয়েছি। তাই এ ধরনের পণ্য নিয়ে ব্যবসা করার চিন্তাটা মাথায় আসে। আমার এলাকায় গোলাপের কোনো কমতি নেই। শীত মৌসুম ছাড়া অন্য সময় এগুলো ছাগলে খায়। নিম-শজনেসহ অন্য জিনিসগুলো সহজেই বাড়ির আশপাশ থেকেই সংগ্রহ করতে পারি। তাই ১০০ টাকা দিয়েই কাজটি শুরু করে দিই।’

default-image

গত মঙ্গলবার মুঠোফোনে এখন কেমন আছেন, জানতে চাইলে হাসির শব্দ পাওয়া যায়। বললেন, ‘এখন আমরা ভালো আছি। ঘরে খাবার আছে। মা–বাবার কান্না দেখতে হচ্ছে না। অর্ডার পাচ্ছি অনেক বেশি। আমার কাজে মা আর দুই বোনও সাহায্য করছেন। খরচ বাদে যা লাভ থাকে, তা–ও মন্দ না। ডিসেম্বর মাস থেকে এ পর্যন্ত তিন লাখ টাকার বেশি পণ্য বিক্রি করেছি।’

তাসফিয়ার বাবার বয়স হয়েছে। বেশ অসুস্থও। তাসফিয়ার এক বোন পড়ছে দশম শ্রেণিতে, আরেক বোন পড়ছে নবম শ্রেণিতে। তাসফিয়ারা নানার বাড়ির একটু জায়গায় আশ্রয় পেয়েছেন। ছোট ছোট দুটি ঘরে থাকেন। মা ঘরে বসে শিঙাড়া-সমুচা-রোল বানিয়ে দিতেন। তাসফিয়ার বাবা তা একটি দোকানে বিক্রি করতেন। এ আয় দিয়েই চলত পরিবারটি। তবে দোকানের মালিক তাঁর বিশেষ প্রয়োজনে সেখান থেকে দোকানটি সরিয়ে নিলে তাসফিয়াদের পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকেই তাঁর বাবা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

সারা দেশে করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। লকডাউনও কার্যকর হয়েছে। তবে কোনো কিছুই এখন আর দমাতে পারে না তাসফিয়াকে। তাসফিয়া ফেসবুকে সাইকেল চালিয়ে পণ্য কুরিয়ার করতে ছুটছেন, এমন একটি ছবি শেয়ার করেছেন। সেই ছবিতে অনেকেই শুভকামনা জানিয়েছেন।

তাসফিয়া বললেন, ‘আমার বাড়ি থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের দোকানের দূরত্ব একেবারে কম না। আগে ভ্যানে করে যেতাম। এখন তো তা–ও বন্ধ। দুদিন হেঁটেই গিয়েছি। কিন্তু তাতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। আমার এক বন্ধু মুবিন এটি দেখে নিজে থেকেই একটি সাইকেল বাড়ি দিয়ে গিয়েছে। সাইকেল চালানো দেখে অনেকেই নানান কথাও বলছেন। তবে মানুষের কথা শুনলে তো আর আমার পরিবার চলবে না। তাই এসব কথা গায়ে মাখি না। অনেক মানুষ কিন্তু আমাকে সাহসও জোগান। এই বয়সে পুরো পরিবার চালাচ্ছি, তা দেখে বাহবাও দেন।’

default-image

তাসফিয়া ফিরে গেলেন গোলাপের গল্পে। বললেন, ১০০ টাকার ১০০ গোলাপ দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। এখন একবারে ১০ হাজার গোলাপ ফুল কেনার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। প্রথম দিকে মা শিলপাটায় গোলাপ পাপড়ি গুঁড়া করতেন। এখন উন্নত মানের ব্লেন্ডার কেনা হয়েছে। জানুয়ারি মাসেই ৫০ হাজার টাকার শুধু গোলাপ পাপড়ি গুঁড়া বিক্রি করেছেন। ১০০টি গোলাপ থেকে ২৫ গ্রাম গুঁড়া পাওয়া যায়। ২৫ গ্রাম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। এতে অন্য কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। আগে থেকে কোনো গুঁড়া করে রাখা হয় না, অর্ডার পেলে ক্রেতার কাছ থেকে তিন দিনের সময় চেয়ে নেন তাসফিয়া।

তাসফিয়া জানালেন, সংসারে একটু আয়-উন্নতি করার জন্যই তিনি গ্রাম থেকে গাজীপুরের টঙ্গী কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কলেজের হোস্টেলে থেকে টিউশন করা, খণ্ডকালীন চাকরিসহ বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারপর করোনায় সব বন্ধ হয়ে যায়।

টঙ্গী সরকারি কলেজের একজন অতিথি শিক্ষক কামরুন নাহারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাসফিয়া জানালেন, ‘এই ম্যাডাম আমাকে উই গ্রুপের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এখন এ গ্রুপের সদস্যদের কাছ থেকেই বেশি অর্ডার পাই। এতে যুক্ত হতে না পারলে আমার পরিবারটি হয়তো এত দিন না খেতে পেয়েই মরে যেত। টিকে থাকতে পারত না। আমার ফেসবুক পোস্টে কামরুন নাহার আপা কমেন্ট করেন। আমার বর্তমান অবস্থার কথা জেনে তিনি খুব খুশি হন।’

তাসফিয়ার এক ভাই রক্তসংক্রান্ত একটি জটিল রোগে মাত্র ১২ বছর বয়সে মারা যায়। তাসফিয়া জানালেন, তিনবার ভারতে নিয়ে ভাইকে চিকিৎসা করাতে তাঁদের অনেক খরচ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভাইটিকে বাঁচানো যায়নি। আর বাবার সব সময় চিন্তা ছিল, তিন মেয়ে নিয়ে তিনি চলবেন কীভাবে?

default-image

তাসফিয়া বলেন, ‘বাবার বড় সন্তান হিসেবে আমি বাবার পাশে দাঁড়াতে পেরেছি। আমি হেরে গেলে আমার পরিবারও হেরে যাবে। তাই আমাকে থামলে চলবে না।’

উই–এর প্রেসিডেন্ট নাসিমা আক্তার তাসফিয়ার উদ্যোগ সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা যা চিন্তাও করতে পারি না, সেই সব জিনিস নিয়ে তাসফিয়া উদ্যোক্তা হয়েছেন। যশোর এমনিতেই ফুলের জন্য বিখ্যাত, সেই ফুলসহ বিভিন্ন জিনিসই তিনি বেছে নিয়েছেন। ছোট একটা মেয়ে, অথচ পুরো পরিবার চালাচ্ছেন। আমাদের দেশে এসব হারবাল পণ্যের ক্রেতা আছে। তবে ক্রেতারা বিদেশি পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। দেশি পণ্যের প্রসার বাড়াতে তাসফিয়াদের মতো ছোট ছোট উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে হবে। তবে এসব পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে এলাকাভিত্তিক হাব গড়ে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে।’

নাসিমা আক্তার জানালেন, উই–এর সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তাদের পণ্য নিয়ে ক্রেতাদের কোনো অভিযোগ থাকলে তা জানানোর ব্যবস্থা আছে। তবে এখন পর্যন্ত তাসফিয়ার কোনো পণ্য নিয়ে কেউ কোনো অভিযোগ করেননি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন