default-image

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে নতুন সচিব ও অধিদপ্তরে নতুন মহাপরিচালক (ডিজি) যুক্ত হওয়ার পর প্রত্যাশা ছিল, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু তেমন কিছু দেখলাম না। নতুন ডিজির মুখ থেকে করোনা নিয়ন্ত্রণবিষয়ক সামান্য কোনো বক্তব্যও শুনলাম না। মন্ত্রণালয় থেকে কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও প্রজ্ঞাপন ছাড়া এমন কোনো পরিকল্পনা দেখলাম না, যেটি সত্যিকারের ফল বয়ে আনবে।

প্রত্যাশা করি, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এমন কিছু কর্মকাণ্ড দেখাবে যাতে সবার মনে হবে, তারা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। করোনার ভয়াল থাবায় যেন জনজীবন বিপর্যস্ত না হয়, অর্থনীতি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, উন্নয়ন কার্যক্রম যেন থমকে না দাঁড়ায়, পাশাপাশি করোনা যাতে দীর্ঘমেয়াদি সংক্রামক রোগে পরিণত না হয়, সে জন্য অনতিবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মাঠপর্যায়ের সঙ্গে একেবারেই সমন্বয় করতে পারেনি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ বিভাগগুলোর মধ্যেও সমন্বয়ের অভাব দেখা গেছে। উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে সব স্তরের স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তারা একেবারেই মনোযোগ দেয়নি। স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। যেসব চিকিৎসক মারা যাচ্ছেন, তাঁদের প্রতি সম্মান জানাতেও দেখা যায়নি।

করোনাযুদ্ধ শেষ হয়নি। ভারত, দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখে সামনে খারাপ দিন আসবে না, এমনটি বলা যাচ্ছে না। করোনা নিয়ে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা দরকার। সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আগামী তিন মাসের মধ্যে করোনা নিয়ন্ত্রণ করা হবে নাকি যা হওয়ার হবে, এমন মানসিকতায় কোনো উদ্যোগ না নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যাব। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে জনস্বাস্থ্যবিদদের একটি দলকে দায়িত্ব দিতে হবে। দলটিকে কাজের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে, অনেকটা নির্বাচন কমিশনের মতো।

দেশে বর্তমানে করোনার যে অবস্থা, সেটির বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ দরকার। করোনা সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র বুঝতে জরিপ করা দরকার। যত রোগী শনাক্ত হচ্ছেন, তার চেয়ে অন্তত চার গুণ বেশি লুক্কায়িত রোগী রয়েছেন সারা দেশে। কোথায় সংক্রমণ কম ছিল, এখন বেশি; আবার কোথায় সংক্রমণ বেশি ছিল, এখন কম—সেটি বোঝা দরকার।

করোনা নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে অনুসন্ধান (ট্রেসিং), পরীক্ষা (টেস্টিং), আইসোলেশন (বিচ্ছিন্ন রাখা), কোয়ারেন্টিন (সঙ্গনিরোধ) ও মুভিং রেসট্রিকশন (চলাচল সীমাবদ্ধতা)—এই পাঁচটি বিষয়ের মূল্যায়ন দরকার।

অধিদপ্তর থেকে ফোনের মাধ্যমে ট্রেসিং করা হচ্ছে। দৈবচয়নের ভিত্তিতে করোনা শনাক্ত হয়েছে এমন ৮ থেকে ১০ জন রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের অনুসন্ধান বা কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করে দেখা যেতে পারে। দেখা যাবে, প্রতিজনের সংস্পর্শে এসেছেন ৩০ জন। কিন্তু অধিদপ্তর পেয়েছে ৫ জন। তার মানে, বাকি ২৫ জনকে চিহ্নিত করা যায়নি। এতে বোঝা যাবে, আমরা আসলে কতটুকু কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করছি। অনুসন্ধানে রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কারা উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন, সেটি নির্ধারণ করতে হবে।

বর্তমানে দিনে করোনা পরীক্ষা হচ্ছে ১২ থেকে ১৩ হাজার। শনাক্ত হচ্ছেন প্রায় ৩ হাজার। এই ৩ হাজারের প্রতিজনের কাছাকাছি (সংস্পর্শে) এসেছেন অন্তত ২০ জন। তার মানে, রোগীদের সংস্পর্শে এসেছেন ৬০ হাজার লোক। তাঁদের কতজনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়? বর্তমানের আরটিপিসিআর পদ্ধতিতে এদের সবার পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। এখানেই প্রয়োজনীয়তা আসে করোনার অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি র‌্যাপিড কিটের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি।

বিজ্ঞাপন

দিনে যে তিন হাজার রোগী শনাক্ত হচ্ছেন, তাঁদের সংস্পর্শে আসা কতজন কোয়ারেন্টিনে থাকছেন? ৯০ শতাংশই কোয়ারেন্টিন মানছেন না। রোগীদের কতজন আইসোলেশন মানছেন? আইসোলেশনে থাকার সময় রোগীর আচরণ কেমন? ১০০ জন রোগীর আইসোলেশন পর্যালোচনা করে দেখা দরকার, এটি কতটা কার্যকর। যে বাড়িতে শনাক্ত রোগী আছেন, সেই বাড়ির লোকজন কতটা মুভিং রেসট্রিকশন মানছেন? এসব বিষয় মূল্যায়ন করলে ডব্লিউএইচও নির্দেশিত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ আসলেই কতটা হচ্ছে, তার চিত্র পাওয়া যাবে।

দেশে কতজন মাস্ক ব্যবহার করছেন, জনসমাগমস্থলে সামাজিক দূরত্ব কতটা মানা হচ্ছে—এসব বিষয়েও জরিপ হওয়া প্রয়োজন। যাঁরা শনাক্ত হচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে উপসর্গহীন কতজন; যাঁদের উপসর্গ রয়েছে, তাঁদের উপসর্গের মাত্রা কেমন, সেটিও জরিপ করা প্রয়োজন। রোগীরা কোথায় চিকিৎসা নিচ্ছেন, হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার মান কেমন, সেগুলোরও পর্যালোচনা প্রয়োজন। তাহলে সংক্রমণ পরিস্থিতি, উপসর্গ কেমন এবং চিকিৎসার মান ও সুস্থতার মতো বিষয়গুলো পরিষ্কার হবে।

সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে বহুমাত্রিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে করোনার প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব। করোনা বিষয়ে একটি জাতীয় সংলাপ করা দরকার। প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন ব্যক্তি সংলাপে করোনা মোকাবিলায় কী করা হয়েছে, কী হতে পারত, ভবিষ্যতে কী করণীয়—এসব বিষয়ে তাঁদের মতামত দেবেন।

অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ: জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন