>গতকাল ১ জুলাই চলে গেলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তা ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান। সৎ ও নীতিমান এই শিল্প–উদ্যোক্তা রেখে গেছেন অসামান্য কৃতি ও স্মৃতি।
default-image

লতিফুর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয় বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে, ১৯৭৩ সালে। এর আগে আমি চাকরি করতাম। ছিলাম পশ্চিম পাকিস্তানে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ব্যবসায় নামলাম। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সূত্রে লতিফুর রহমানের সঙ্গে আমার আলাপ হয়।

লতিফুর রহমান ছিলেন অমায়িক একজন মানুষ। আমরা একসঙ্গে বহু দিন মেট্রোপলিটন চেম্বারের পরিচালনা পর্ষদে ছিলাম। তিনি সাতবার এমসিসিআইয়ের সভাপতি ছিলেন। আমিও ছিলাম। অনেকেই কমিটির বৈঠকে মেজাজ হারিয়ে ফেলতেন। উনি কোনো দিন মেজাজ হারিয়েছেন, তা আমি দেখিনি। তাঁর শান্ত ও ভদ্রভাবে সবার সঙ্গে কথা বলার গুণটি সত্যিই শিক্ষণীয় ছিল।

লতিফুর রহমানের চরিত্রের একটি অসামান্য দিক ছিল সততা। সমাজে একটা ধারণা আছে, ব্যবসায়ী মানেই অসৎ লোক। এ ক্ষেত্রে লতিফুর রহমান ছিলেন একেবারেই উল্টো। তাঁর সততা নতুন প্রজন্মের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে।

সততা বজায় রেখেই লতিফুর রহমান ব্যবসায় সফল হয়েছেন। আমিও বিশ্বাস করি, সততা দিয়েই ব্যবসায় সফলতা আসে। অসৎ পথে চললে অনেক বেশি টাকা আয় করা যায়, কিন্তু সে টাকা থাকে না। সমস্যা আসেই। এটা আমার প্রবল বিশ্বাস। ব্যবসায় উন্নতি করতে হয় ধীরে ধীরে। তাহলে সেটা টেকসই হয়। দ্রুত যে টাকা আসে, সেটা দ্রুত আবার চলেও যেতে পারে। আমি চামড়া খাতে দেখেছি, অনেকেই রাতারাতি অনেক টাকার মালিক হয়েছেন। এখন তাঁদের কোনো অস্তিত্ব নেই। লতিফুর রহমান এটা বিশ্বাস করতেন। মানুষের টাকার দরকার আছে, কিন্তু সেটা যেকোনো মূল্যে নয়।

লতিফুর রহমান চাইলে বিদেশে স্থায়ী হতে পারতেন। বিদেশে এখন অনেকেরই দ্বিতীয় নিবাস আছে বলে শুনি। তিনি মনে করতেন, যা কিছু করবেন, দেশেই করবেন। সঞ্চয় হবে, শিল্প করবেন, মানুষ কাজ পাবে। এটাই ছিল তাঁর চিন্তা। এই দেশপ্রেম আমি তাঁর মধ্যে দেখেছি।

এক নম্বর হওয়ার ইচ্ছা লতিফুর রহমানের কখনোই ছিল না। সেটা হওয়ার দরকারও ছিল নেই। একজনের অনেক টাকা আছে, আমার কম আছে, তাতে কী আসে যায়—এমন একটা অসম্ভব পরিণত চিন্তা লতিফুর রহমানের ছিল।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করবে। সেটা হয়েছে। তবে নৈতিকতার সঙ্গে সৎভাবে অর্থ উপার্জন করেছেন, এমন লোকের সংখ্যা দেশে সীমিত বলে মনে হয়। এখন তো তাড়াতাড়ি ধনী হওয়া বা প্রচুর টাকা বানানোই অনেকের জীবনের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।

আমাদের দেশে যাঁরা নৈতিকভাবে সৎ পথে ব্যবসা করতে চেয়েছেন, তাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। কেউ ব্যবসা করেন ঠিকমতো কর দিয়ে, আর কেউ দেন ফাঁকি। তাহলে তো মাঠটা আর সমতল হলো না। লতিফুর রহমান এ সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু তিনি যেটা বিশ্বাস করতেন, সেটা ছেড়ে দেননি, ধরে রেখেছেন। এটা একটা বিরাট ব্যাপার। তাঁর সাহস ছিল। অনেকে তো সাহসটা হারিয়ে ফেলেন।

default-image

লতিফুর রহমানের সঙ্গে আমি অনেক ভ্রমণ করেছি। তিনি কাউকে খরচ করতে দিতেন না। সব সময় নিজেই আগে বিল দিয়ে দিতেন। নিচু মানসিকতা বা কৃপণতা তাঁর মধ্যে একেবারেই ছিল না। ক্ষমতা বা টাকা অনেক সময় মানুষের মধ্যে দম্ভ ও অহমিকার জন্ম দেয়। লতিফুর রহমানের মধ্যে তা বিন্দুমাত্র ছিল না।

বাংলাদেশ যে তার এক শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারাল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমার কাছে তিনি ছিলেন বন্ধুর চেয়েও বড়, পরিবারের সদস্যের মতো। ব্যবসা বা আনুষ্ঠানিকতা নয়, তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল পারিবারিক।

লতিফুর রহমান তাঁর সন্তানদের নিজের মূল্যবোধে বড় করেছেন। নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারেননি। বাবা মারা যাওয়ায় এবং পারিবারিক কারণে অল্প বয়সে তাঁকে ব্যবসায় নামতে হয়েছিল। কিন্তু সন্তানদের তিনি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন।

সব মিলিয়ে লতিফুর রহমান অনেক উঁচু মাপের লোক ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে বেহেশত নসিব করুন।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী: চেয়ারম্যান, অ্যাপেক্স গ্রুপ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন