সনাতনী কূটনীতিতে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা বলেছেন, মিয়ানমার আইন বা মানবাধিকারের তোয়াক্কা করছে না। দেশটির ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপসহ আন্তর্জাতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। দেশটি গণহত্যা, ধর্ষণ, জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোসহ যেসব অপরাধ করেছে, তার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
আলোচকেরা বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে শুধু দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা সমঝোতা নয়, বহুপক্ষীয় এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। সনাতনী কূটনীতি দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে করণীয় নির্ধারণের জন্য ‘রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: কল ফর অ্যাকশন’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে সরকারি, বেসরকারি প্রতিনিধি, কূটনৈতিক, দাতাগোষ্ঠী, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, এনজিও, সুশীল সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কমিটির প্রতিনিধি, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশা-শ্রেণির প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন।
বৈঠকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে, তা সব ধরনের বর্বরতাকে হার মানিয়েছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সৃষ্টি করেছে মিয়ানমার, সমাধানও করতে হবে মিয়ানমারকেই। গণহত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। বিচার বা মৃত্যুর কাঠগড়ায় না দাঁড় করালে এদের পরিকল্পিত অপরাধ থামবে না।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব সিরাজুল হক খান এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ স্বাস্থ্য খাতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং নির্বাচন কমিশনের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন রোহিঙ্গা এতিম শিশুদের দিকে নজর বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই শিশুদের বিভিন্ন অত্যাচারের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। নতুন এবং পুরোনো রোহিঙ্গারা যাতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে কোনো গোষ্ঠী যাতে অপতৎপরতা চালাতে না পারে, তা-ও নজরদারি করতে হবে।
বৈঠকের আলোচনায় রোহিঙ্গাদের বাঙালি বলা যাবে কি না, রোহিঙ্গা শিশুদের প্রাক ও প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম বাংলা না মিয়ানমারের ভাষা হবে ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে আলোচকদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়।
আলোচনায় গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, রোহিঙ্গা শিশুদের একসময় মিয়ানমারে ফিরে যেতে হবে। এই শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় সম্পৃক্ত করা সম্ভব নয়। তাই এই শিশুদের মিয়ানমারের ভাষায় অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা দিতে হবে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, রোহিঙ্গা কিশোরীদের মাসিক শুরু হলে অভিভাবকেরা তাদের আর শিক্ষাকেন্দ্রে পাঠাচ্ছেন না।
মিয়ানমারের সাবেক রাষ্ট্রদূত অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল অনুপ কুমার চাকমা বলেন, কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা কথাটা নেই। এ বিষয়টিতে সতর্ক থাকতে হবে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খালেদ মাহমুদ রোহিঙ্গা সমস্যাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যেসব হুমকি তৈরি হয়েছে, তাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক মেসবাহ কামাল, চীনে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আজিজুল হক, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি সিনজি কুবো, ইউএনডিপির ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর শায়লা খান, জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান মমতাজ বেগম, অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু প্রমুখ আলোচনায় অংশ নেন।