প্রথমে নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এরপর পর্যায়ক্রমে উপজেলা, জেলা ও বিভাগে শ্রেষ্ঠ হওয়ার পর ৫ ও ৬ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় এই চার শিক্ষক দেশসেরা হয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সেরাদের নির্বাচিত করা হয়।

প্রতিবছর জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী, শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক, শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন শ্রেণিতে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে দেশসেরাদের নির্বাচিত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে করোনা সংক্রমণের কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে এ প্রতিযোগিতা হয়নি।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) অধ্যাপক প্রবীর কুমার ভট্টাচার্য্য প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন গুণের ভিত্তিতে কয়েকটি ধাপের প্রতিযোগিতায় সেরাদের নির্বাচিত করা হয়।

এর আগে প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল, এ বছর দেশসেরা হওয়া চার শিক্ষার্থীর সবাই ঢাকার বাইরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছে। এর মধ্যে বিদ্যালয় পর্যায়ে ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী অনুপমা শারমীন, কলেজ পর্যায়ে রাজবাড়ী সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী কুইন, মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের মধ্যে চট্টগ্রামের ষোলশহরের জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসার স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মুহাম্মদ ফয়সাল আহমদ এবং কারিগরি শিক্ষায় লালমনিরহাটের সরকারি আদিতমারী গিরিজা শংকর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষার্থী মো. রাগীব ইয়াসির রোহান শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী নির্বাচিত হয়।

শিক্ষকই হতে চেয়েছিলেন সেলিনা আক্তার

শিক্ষার্থীদের মতো শ্রেষ্ঠ শ্রেণিশিক্ষকেরাও সবাই রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে বিদ্যালয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়া সেলিনা আক্তার ২০০২ সালের জানুয়ারি থেকে বরিশালের উজিরপুরের সরকারি ডব্লিউবি ইউনিয়ন মডেল ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতা করছেন। তিনি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের শিক্ষক। তাঁর ছাত্রজীবনও কেটেছে বরিশালে।

তবে বরিশালে থাকলেও নিজে শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন দেশ-বিদেশে। ১০ বছর ধরে তিনি শিক্ষার্থীদের পড়ানোর পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের স্তরের শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ দেন। সৃজনশীল প্রশ্নপত্র পদ্ধতির প্রশিক্ষকও তিনি। সরকারের শিক্ষক বাতায়নে ২০১৭ সালে সপ্তাহের সেরা কন্টেন্ট বা আধেয় নির্মাতা হয়েছিলেন। একই বছর ডিজিটাল কনটেন্ট প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে সেরা কন্টেন্ট নির্মাতা হয়েছিলেন।

শিক্ষার্থীদের পড়ানোর ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেন উল্লেখ করে সেলিনা আক্তার বলেন, তিনি সব সময় শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করেন এবং সে অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বন্ধু হয়ে যান। ক্লাসও নেন গল্প করতে করতে। এভাবে আনন্দের মধ্যে শিক্ষার্থীদের শেখান। টাকার বিনিময়ে প্রাইভেট পড়ান না। কখনো কখনো শিক্ষার্থীদের বাড়তি পড়ান, তবে সে জন্য টাকা নেন না।

সেলিনা আক্তার এর আগে ২০১৯ সালেও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হয়েছিলেন। তিনি বললেন, ‘আমি কখনো দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হতে চাইনি। চেয়েছি আমাদের শিক্ষার্থীদের কাছে শ্রেষ্ঠ হতে, তাদের মনের মধ্যে যেন শ্রেষ্ঠ হয়ে থাকতে পারি।’

সেলিনা আক্তার বললেন, তাঁর একটাই স্বপ্ন ছিল, কিশোর বয়সীদের পড়াবেন এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক হবেন। তাই জীবনে এই একটা চাকরির আবেদন করেছিলেন এবং কাঙ্ক্ষিত চাকরিটি হয়েছে। আগামী দিনগুলোতেও তিনি শিক্ষক কিংবা শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান।

শিক্ষকদেরও শেখান সাঈদ হাসান

শিক্ষাগত যোগ্যতা, জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ, বই লেখা, শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বশীলতা ইত্যাদি গুণের বিবেচনায় কয়েক ধাপের প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হতে হয়। ঢাকার সাভার সরকারি কলেজের শিক্ষক এ কে এম সাঈদ হাসানও এসব ধাপ পেরিয়ে শ্রেষ্ঠ কলেজ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। উদ্ভিদবিজ্ঞানের এই শিক্ষক স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পিএইচডি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে করেছেন এমএড (মাস্টার্স অব এডুকেশন)।

শিক্ষার্থীদের পড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থাপনায় ময়মনসিংহ অঞ্চলের ৪৪০ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মডারেশনের কাজেও জড়িত আছেন তিনি। ২৬টি প্রকাশনা রয়েছে তাঁর। তাঁর লেখা বই জার্মানি থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের পড়ানো প্রসঙ্গে এই শিক্ষক বললেন, পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়ান তিনি।

এর আগে ২০১৫ সালে ঢাকা জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হয়েছিলেন উল্লেখ করে সাঈদ হাসান তাঁর একটি দুঃখবোধের কথাও বললেন। প্রথম আলোকে তিনি বললেন, তাঁর কলেজটি বেসরকারি থেকে সরকারি হওয়ার পর অন্য শিক্ষকেরাও সরকারি হওয়ার জন্য বিবেচিত হন।

শুধু তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ষ শিক্ষক। কিন্তু আত্তীকরণের (সরকারি হওয়া) সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিয়োগের সময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ছিলেন না।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ছিলেন দাবি করে সাঈদ হাসান বলেন, তাঁর সময়ে নিয়োগ পাওয়া আরেকজন শিক্ষককেও আত্মীকরণ
করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের দক্ষ করায় নিবেদিত পবন কুমার

শ্রেষ্ঠ কারিগরি শিক্ষক হওয়া দিনাজপুরের পার্বতীপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক পবন কুমার সরকারের বাড়ি বগুড়ায়। তিনি পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৪ সালে কারগরি শিক্ষায় শিক্ষকতায় যোগ দেন।

শুরুতে কুষ্টিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও ২০১৩ সাল থেকে পার্বতীপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করছেন। তাঁর লেখা বই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে প্রকাশিত। সব সময় তিনি ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ান।

এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সহায়তা নেন জানিয়ে পবন কুমার বলেন, তাঁর শিক্ষার্থীদের অনেকেই স্বাবলম্বী। অনেকে পোলট্রি খামার দিয়েছে।

পবন কুমার সরকার বলেন, কারিগরি শিক্ষার মূলমন্ত্রই হলো দক্ষতা। তাই শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয়বার সেরা হলেন রিয়াজুল ইসলাম

বরিশালের সাগরদী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষক রিয়াজুল ইসলাম এবার মাদ্রাসাশিক্ষকদের মধ্যে সেরা হয়েছেন। এর আগে ২০১৮ সালেও তিনি শ্রেষ্ঠ মাদ্রাসাশিক্ষক হয়েছিলেন। কুষ্টিয়ায় অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা রিয়াজুল ইসলামের পিএইচডি শেষের পথে।

তাঁর লেখা বই মাদ্রাসার ফাজিল ও কামিল শ্রেণিতে পড়ানো হয়। তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা ১০। প্রাইভেট পড়ান না। রিয়াজুল ইসলাম বললেন, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হতে হলে কেবল একটি–দুটি যোগ্যতা দিয়ে হবে না। সব দিক বিবেচনায় যোগ্য হতে হবে।

সেরা প্রতিষ্ঠান প্রধান চারজন

বিদ্যালয় পর্যায়ে সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান হয়েছেন কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের তমিজা খাতুন সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবেদা আক্তার জাহান, শ্রেষ্ঠ কলেজ প্রধান মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক রেজাউল করিম, শ্রেষ্ঠ মাদ্রাসা প্রধান ঢাকার ডেমরার তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার মুহাম্মদ আবু ইউছুফ এবং শ্রেষ্ঠ কারিগরি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাচিত হয়েছেন বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মো. রুহুল আমিন।

১৫৪ বছরের বিদ্যালয়

এবার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দেশসেরা হয়েছে দেশের অন্যতম প্রাচীন বিদ্যাপীঠ রাজশাহীর সরকারি প্রমথনাথ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ওয়াফা আহমেদ ইংরেজি রচনা প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়েছে। গতকাল বিদ্যালয়টিতে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস দেখা যায়।

১৮৬৮ সালে নাটোরের দিঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় বড় অঙ্কের অর্থ দিয়েছিলেন। তাঁর নামানুসারেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ‘পিএন স্কুল’ নামে পরিচিত। ১ হাজার ৭০১ জন শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন ৫০ জন। কয়েক বছর ধরেই বিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদ্‌যাপনে বিদ্যালয়টির ভিন্ন আয়োজন সবার নজর কাড়ে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তৌহিদ আরাও এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী। ২০১৭ সালে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীদের পাঠদানই সবকিছু নয়। তাঁরা চান যারা এখানে পড়ে, তারা ভালো মানুষ হবে। এ জন্য তিনিসহ শিক্ষকেরা সব সময় শিক্ষার্থীদের বলেন—এখানে রোল নম্বরের প্রতিযোগিতা করা যাবে না। এখানে তোমরা শিখতে এসেছ, শিখবে, ভালো মানুষ হবে।

এবার কলেজ পর্যায়ে সেরা হয়েছে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ। এ ছাড়া শ্রেষ্ঠ মাদ্রাসা রাজশাহীর মদীনাতুল উলুম কামিল মাদ্রাসা এবং শ্রেষ্ঠ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচিত হয়েছে রংপুর টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন রাজশাহী প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম]

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন