বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
দেশে প্রায় সময় আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, প্রকল্পের কাজ সঠিক সময়ে শেষ হয় না। শুধু সময় বাড়ানো হয়। টাকাও বাড়ানো হয়। কিন্তু কর্ণফুলী টানেলের বেলায় এমনটি হয়নি।
এম এ মান্নান পরিকল্পনামন্ত্রী

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রায় সময় আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, প্রকল্পের কাজ সঠিক সময়ে শেষ হয় না। শুধু সময় বাড়ানো হয়। টাকাও বাড়ানো হয়। কিন্তু কর্ণফুলী টানেলের বেলায় এমনটি হয়নি।’ তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই টানেল প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে।


ব্যয় ১০,৩৭৪ কোটি টাকা

কর্ণফুলী টানেলটি চট্টগ্রাম শহর ও আনোয়ারা উপজেলাকে যুক্ত করবে। কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম শহরকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এক ভাগে রয়েছে নগর ও বন্দর এবং অন্য ভাগে রয়েছে ভারী শিল্প এলাকা। কর্ণফুলী নদীর ওপর ইতিমধ্যে তিনটি সেতু নির্মিত হয়েছে। তবে তা যানবাহনের চাপ সামলাতে যথেষ্ট নয়।

এ জন্য টানেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, চুক্তি সই হয় ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর। এর আগে ২০১৪ সালে প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ও চীনের সরকারি পর্যায়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়। আর চীন সরকার এ টানেল নির্মাণের জন্য মনোনীত করে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) লিমিটেডকে। নকশা ও অন্যান্য কাজ শেষে ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি টানেলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

টানেল নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম টানেলের নামকরণ করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে।

default-image

প্রকল্প সূত্র জানায়, মূল টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। এর মধ্যে টানেলের প্রতিটি সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। দুই সুড়ঙ্গে দুটি করে মোট চারটি লেন থাকবে। মূল টানেলের সঙ্গে পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক থাকবে। আর আনোয়ারা প্রান্তে রয়েছে ৭২৭ মিটার দীর্ঘ উড়ালসেতু।

কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে ১৮ থেকে ৩১ মিটার গভীরতায় সুড়ঙ্গ তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি ৩৫ ফুট প্রশস্ত ও ১৬ ফুট উচ্চতার।

চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে প্রথম সুড়ঙ্গের খননকাজ শুরু হয়। এ কাজ শেষ হয় গত বছরের ২ আগস্ট। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ভার্চ্যুয়ালি দ্বিতীয় সুড়ঙ্গের খননকাজের উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। চট্টগ্রামের আনোয়ারা প্রান্ত থেকে এই খননকাজ শুরু হয়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, নদীর তলদেশে প্রথম সুড়ঙ্গ খনন করতে যেখানে ১৭ মাস লেগেছিল, সেখানে দ্বিতীয় সুড়ঙ্গ খননে সময় লাগছে মাত্র ১০ মাস।

এদিকে খননকাজ শেষ হওয়ার পর প্রথম সুড়ঙ্গে এখন সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে ১ হাজার ৬২৩ মিটার ‘স্ল্যাব’ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। আনোয়ারা প্রান্তে উড়ালসেতুর কাজও শেষ পর্যায়ে। এ ছাড়া নগর ও আনোয়ারা প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজও চলছে।

সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানেল প্রকল্পে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ এগিয়েছে ৭৩ শতাংশ। প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, দ্বিতীয় সুড়ঙ্গটির খননকাজ আগামী শুক্রবারের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনায় কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।

‘খননের পর যেন বেশি সময় না নেওয়া হয়’ ২০২২ সালে দেশে বড় কয়েকটি প্রকল্প চালু হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে সবার আগে নাম আসবে পদ্মা সেতুর। সরকার বলছে, আগামী জুনের মধ্যে পদ্মা সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। ঢাকায় মেট্রোরেলের আগারগাঁও থেকে দিয়াবাড়ী পর্যন্ত অংশে আগামী বছর যাত্রী পরিবহনের আশা রয়েছে। রাজধানীতে বিমানবন্দর থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত উড়ালসড়ক বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালুর কথা রয়েছে ২০২২ সালে। বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্পটিও খুলে দেওয়া হতে পারে আগামী বছর। সব মিলিয়ে বড় কয়েকটি প্রকল্পের সুফল আগামী বছর থেকে পেতে শুরু করবে মানুষ। যদিও কয়েকটি প্রকল্পে বারবার ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘসূত্রতা ও মানুষের ভোগান্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কর্ণফুলী টানেল নিয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কর্ণফুলী টানেল অন্য প্রকল্পের মতো নয়। এটি যন্ত্রের (টানেল বোরিং মেশিন) ওপর নির্ভরশীল। এই যন্ত্রের মাধ্যমে খননকাজ করার কারণে কাজের অগ্রগতি দ্রুত হচ্ছে। তবে খননকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর বাকিটা শেষ করতে যেন বেশি সময় নেওয়া না হয়। উচিত হবে আগামী বছরের জুলাইয়ের মধ্যে টানেল যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া। কর্ণফুলী টানেল দেশের অর্থনীতিতে খুবই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে উল্লেখ করে অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, টানেলের কারণে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও বন্দরের কার্যক্রম প্রসারিত হবে। আনোয়ারা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত গড়ে উঠবে নতুন নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল। এ ছাড়া মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত শিল্প করিডর (সড়ক ঘিরে শিল্পায়ন) হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন