এখন যদি আর্থিক ও রাজস্ব খাত নিয়ে জানতে চাই?

দেবপ্রিয়: এই সময়ে দেশে আয় বাড়লেও সে অনুপাতে কর আদায় বাড়েনি। এটি একটি অদ্ভুত অর্থনীতি, যেখানে জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয় কিন্তু কর আদায়ের হার বাড়ে না। এখানে কর জিডিপির অনুপাতে ১০ শতাংশের নিচে আটকে আছে, যা এ অঞ্চলে সর্বনিম্ন। অপর দিকে চেষ্টা সত্ত্বেও সরকারের ব্যয় ১৩-১৪ শতাংশের ওপরে উঠছে না। সাধারণভাবে আদায় কম, ব্যয়ও কম। সুতরাং বাজেট ঘাটতির আশঙ্কা নিয়ে যাঁরা চঞ্চল থাকেন, তা বাস্তবসম্মত নয়। যে বাজেট ঘাটতিটা হচ্ছে, তা জিডিপির ৫ বা সাড়ে ৫ শতাংশের মধ্যেই থাকছে। তবে দেখার বিষয়, সেটার অর্থায়নটা কীভাবে হচ্ছে। বাজেটে বারবারই বলা হয়, ঘাটতির বেশির ভাগ অর্থায়ন করা হবে বৈদেশিক উৎস থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেশি অর্থায়ন হয় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই। এক বছর যদি জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে বেশি অর্থ আনে, অন্য বছর আনে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে। এই দোলাচল এবারও বিদ্যমান। সরকার এক দিকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণে ঋণ নেয়, পুঁজিবাজারে রয়েছে ব্যাংকের অনিশ্চিত বিনিয়োগ এবং বিপুল পরিমাণ ঋণ অনাদায়ি থাকায় ব্যাংকের ভেতরেও তারল্য নিয়ে সংকট আছে। সব মিলিয়ে আর্থিক খাত আরও দুর্বল হচ্ছে ২০২১-২২ অর্থবছরে।

তবে এ পরিস্থিতি কেবল কোভিডের কারণে নয়। এর বড় কারণ হচ্ছে রাজস্ব ও আর্থিক খাতের যে প্রয়োজনীয় সংস্কার করার কথা ছিল, তা হয়নি। ফলে এনবিআরের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তাদের কারিগরি প্রস্তুতি নেই।

সরকার কি ব্যয়টা তাহলে ঠিক করে করতে পারছে?

দেবপ্রিয়: এবার রাজস্ব বাজেটে দুটি ব্যয় খাত বড়ভাবে সামনে আসছে। ভর্তুকি, হস্তান্তর, প্রণোদনা ইত্যাদি সব মিলিয়ে একটা, অন্যটা ঋণের দায়-দেনা পরিশোধ। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধ। এসবের ফলে বিপুল পরিমাণ বাড়তি বরাদ্দ দিতে হচ্ছে সংশোধিত বাজেটে। যদিও এর পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো আমাদের কাছে নেই। তবে ভর্তুকি ও সুদ বাবদ এবার রাজস্ব বাজেটের প্রায় ৫৫ শতাংশ খরচ হয়ে যাবে। বেতন-ভাতা তো আর সরকার বাদ দিতে পারবে না। সুতরাং বেতন–ভাতাসহ এই তিন খাতে অর্থ ব্যয়ের পরে খুব সামান্যই রাজস্ব উদ্বৃত্ত সরকারের হাতে থাকবে।

এসব কারণে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থের সংস্থান করা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ছে। এবার তো এডিপি বাস্তবায়নের হার অন্য যেকোনো বছরের তুলনায় কম। এডিবিতে যেসব প্রকল্প আছে, তাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখাও হয় না, আবার শুরু করার সময় থেকে গুণগত মানসম্পন্ন কারিগরি ও সম্ভাব্যতা যাচাইও হয় না। এমনকি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর লক্ষ্যভিত্তিক জনগোষ্ঠীর কী উপকার হলো, তা–ও যাচাই করা হয় না। মূলত আর্থিক ব্যয়ের হিসাবটাই হয়, ফলাফলের ওপরে গুরুত্ব কম। সুতরাং সাধারণভাবে বলা যায়, ব্যয়ের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি দেখছি না।

তাহলে সরকার যে বলছে সম্প্রসারণনশীলভাবে বড় বাজেট করবে?

দেবপ্রিয়: অর্থনীতিকে তেজি করতে এখন একটি সম্প্রসারণশীল আর্থিক নীতিমালা দরকার। তবে আয় ও ব্যয়ের এই পরিস্থিতিতে সরকার চাইলেও একটি সম্প্রসারণশীল বাজেট কার্যকরভাবে করতে পারবে না। কেননা বড় ধরনের আর্থিক সংস্থান এবং তা কার্যকর করার জন্য ব্যবস্থাপনাগতভাবে যে দক্ষতা প্রয়োজন—এ দুটোই নেই। আসলে সম্প্রসারণমূলক বাজেট দেওয়া একধরনের বাগাড়ম্বর, বাস্তবতা নয়। সরকার যদিও অর্থায়ন বাড়ানোর জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত গুণমানসম্পন্নভাবে সরকার এই অর্থ সময়মতো ব্যয় করতে পারবে কি না, তা চিন্তার বিষয়।

এখন তো অর্থনীতির কিছু সূচক তো নতুন করে চাপের মধ্যে পড়ে গেল, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক কিছু সূচকে?

দেবপ্রিয়: আমাদের অর্থনীতির শক্তির একটা জায়গা ছিল বৈশ্বিক লেনদেন। সেই জায়গায়ও বেশ ভাঙন ধরেছে। এমনকি যে রপ্তানি বৃদ্ধির প্রবণতাকে ভালো বলছি, সেটাও তো ঠিক না। এ সময়ে দেশের রপ্তানি বেড়েছে ৩৩ শতাংশ, এর বিপরীতে আমদানি বেড়েছে ৫১ শতাংশ। আর পোশাক খাত তো টিকে আছে রপ্তানির পরিমাণ দিয়ে, পণ্যের দাম দিয়ে নয়। আর রেমিট্যান্স খাতের মধ্যমেয়াদি প্রবণতা হচ্ছে তা আরও
নিচের দিকে যাবে। ঈদ, কোভিড, নির্বাচন—এসব সময়ে ওঠানামা করবে ঠিকই, কিন্তু বৈশ্বিক যে পরিস্থিতি তাতে প্রবাসী আয় অস্থিতিশীল থেকে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও (এফডিআই) তো কোনো অবস্থাতেই নিট প্রবাহ ১০০ কোটি ডলারের
বেশি হচ্ছে না। বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ প্রভূতভাবে বাড়লেও এর মধ্যে সাশ্রয়ী সাহায্যের অংশ অনেক কম।

বৈদেশিক লেনদেনে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা যে সূচকে বোঝা যায়, সেটি হলো চলতি হিসাবের ভারসাম্য, যা বিদেশের সঙ্গে দেশের মূলধনি ও আর্থিক লেনদেন বোঝায়। ২০২০-২১ অর্থবছর শেষ হয়েছিল চলতি হিসাবে ৩৮০ কোটি ডলার ঘাটতি নিয়ে। এটি এখন এক হাজার কোটি ডলার ঘাটতির মধ্যে আছে। আর যদি বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি দেখি, গত অর্থবছরে এখানে ৯০০ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল, এখন এটা ২০০ কোটি ডলারে ঋণাত্মক হয়ে গেছে।

বলতে চাচ্ছি, দেশের আর্থিক খাত একধরনের নড়বড়ে অবস্থায় ছিল, এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক খাতের দুর্বলতা। এর পাশাপাশি আছে মূল্যস্ফীতির চাপ। শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে বলেই যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে, তা–ও ঠিক না। টাকা ক্রমান্বয়ে দুর্বল হওয়ার প্রভাবও আছে এখানে। অথচ অন্যান্য দেশে মূল্যস্ফীতি যেটা দেখা দিয়েছে, তার অন্যতম কারণ সরকার বেশি খরচ করেছে বলে। অর্থাৎ সম্প্রসারণশীল অর্থায়নের জন্য। বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের পার্থক্য হচ্ছে এই যে, তারা অনেকে কোভিড–উত্তর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যয় কমাচ্ছে অর্থাৎ বাজারে অর্থপ্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে। আমরা তো বড় কোনো সরকারি খরচই করিনি।

এখন যদি মূল্যস্ফীতি বাড়ে, টাকার বিনিময় হারে যদি পতন ঘটে, তাহলে সরকারের জন্য সুদের হার বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না। এটা অবশ্য ব্যক্তি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও আমি মনে করি না যে বাংলাদেশে একমাত্র সুদের হারের কারণে ব্যক্তি বিনিয়োগ আটকে আছে। এর বাইরেও আরও দশটা কারণ আছে। তবে এটা ঠিক ব্যক্তি বিনিয়োগ তেজি হওয়ার লক্ষণ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ এ বছরের জানুয়ারি থেকে আবার কমে যাচ্ছে এবং তা বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশ কম।

সরকারের চেষ্টাগুলোকে কীভাবে দেখছেন? ভালো কাজও তো অনেক করছে?

দেবপ্রিয়: সরকারের নীতি উদ্যোগ সঠিকমুখী হলেও তা আসে বেশ দেরিতে এবং অপর্যাপ্তভাবে। মূল্যস্ফীতির পরিপ্রেক্ষিতে অসুবিধাগ্রস্ত মানুষদের জীবনমান ঠিক রাখার জন্য শুল্ক সমন্বয়, আমদানি সহজীকরণ, ভর্তুকি বৃদ্ধি, টিসিবির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বিস্তৃত করা ইত্যাদির কথা আমরা অনেক আগেই বলেছিলাম। সরকার অনেকটাই করেছে কিন্তু বেশ দেরিতে ও যথেষ্টভাবে না।

সরকার যে সঠিক সময় করতে পারে না, এর কারণ কাঠামোগত অদক্ষতা। আর আছে তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি। তথ্যনৈরাজ্যের সঙ্গে সঙ্গে
তথ্যের অন্ধত্ব বা ব্যাপক তথ্যের অভাব সরকারকে সঠিক সময়ে নীতি সংস্কার করতে দেয় না এবং প্রায়ই বিপথগামী করে। যেমন মূল্যস্ফীতির
হিসাব করি আমরা ১৭ বছরের পুরোনো ভোগ-কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে, যা বাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না।

সরকার যে ১ কোটি পরিবারকে খাদ্য সাহায্য দিতে চাচ্ছে, সে ব্যাপারে কী মনে করেন?

দেবপ্রিয়: সরকার ১ কোটি মানুষকে খাওয়ানোর কথা বলছে। এই ১ কোটি মানুষ কীভাবে নির্দিষ্ট হবে। কোভিডকালে সরকার ৫০ লাখ মানুষকে সহায়তা করবে বলে ঠিক করেও তথ্যের অভাবে সব মিলিয়ে সাড়ে ৩৮ লাখের বেশি মানুষকে তা দিতে পারেনি। এক কোটি মানুষকে সহায়তা দেওয়ার জন্য তালিকা প্রস্তুত ও প্রকাশ করার কথা ছিল। বলা হয়েছিল, এগুলো করা হবে রোজার ১৫ দিন আগে। এখন তো রোজার এক সপ্তাহের ওপর চলে গেল। মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি কী আমরা তো পরিষ্কার করে জানি না।

তা ছাড়া যাদের সহায়তা দেওয়া হবে, সেই পুরো তালিকা কি জনমানুষের জ্ঞাতার্থে টানিয়ে দেওয়া হবে? কেননা আগেও দেখেছি সহায়তা দিতে সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও বিতরণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি, দুর্নীতি ও বৈষম্য হয়েছে। সুতরাং সরকার এক কোটি পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে, তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকে যাচ্ছে।

তাহলে সারকথা কী?

দেবপ্রিয়: একদিকে সরকারের সার্বিক ব্যয় বাড়াতে হবে, বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা খাতে গুণমানসম্পন্ন ব্যয় করতে হবে। আবার লক্ষ্য নির্দিষ্টভাবে অসুবিধাগ্রস্ত মানুষদের প্রত্যক্ষ অর্থসাহায্য ও খাদ্যসহায়তা দিতে হবে। সমস্যা হচ্ছে, এই দুইয়ের সমন্বয় করা, তথ্য–উপাত্তের ভিত্তিতে পরিবীক্ষণে রাখা, এই ব্যয়কে জবাবদিহির মধ্যে নিয়ে আসা—এসব করার মতো যে প্রাতিষ্ঠানিক-প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দক্ষতার দরকার হয়, তা সরকারের নেই।

এটা যে নেই, এর বড় কারণ হচ্ছে ২০১৩-১৪ সালের পর থেকে আর্থিক খাতে বড় ধরনের কোনো সংস্কার আমরা দেখি না। এখন সরকার যে আয় ও ব্যয় বাড়াতে না পারার অসুবিধার মধ্যে পড়েছে, এটা তার নিজস্ব সৃষ্টি। যেহেতু পুরোনো সমস্যাগুলো সমাধান করা হয়নি, সেহেতু নতুন সমস্যা মোকাবিলা করতে গিয়ে সরকার পুরোনো সমস্যার কাছে জিম্মি হয়ে থাকছে।

অথচ কোভিডের টিকা সংগ্রহ, সরবরাহ ও প্রদানের ক্ষেত্রে আমরা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কত বড় সাফল্য অর্জন করেছি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে সক্ষমতার যে সীমাবদ্ধতা দেখতে পাচ্ছি, সেটি কি রাজনৈতিক অনীহা ও উদ্যোগহীনতার প্রকাশ?