
দেশে বর্তমানে ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলেও এ সমস্যাকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে না। আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহে বর্তমানে মাঠপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্প নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র ও প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এই চিত্র পাওয়া গেছে। ২০১২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছিল, বাংলাদেশে প্রতিবছর আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় ৪৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। তবে এই মৃত্যুর সংখ্যার সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একমত নয়। যদিও এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
অবশ্য মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক-প্রবণ এলাকা ঘুরে এই প্রতিবেদক দেখেছেন, সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত (আর্সেনিকোসিস) রোগীদের এখন ভিটামিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বড়ি ও মলম দেওয়া হচ্ছে না।
বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, পরিসংখ্যানই বলছে, আর্সেনিক সমস্যা আগের মতোই আছে। দুঃখজনক হলো, সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সমস্যাটি ভুলে বসে আছেন। তাঁর অভিযোগ, দাতাদের আগ্রহে ভাটা পড়ায় বেসরকারি সংস্থাগুলোও (এনজিও) আর্সেনিক নিয়ে আর কাজ করছে না।
আর্সেনিক সমস্যা মোকাবিলায় প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা পিছিয়ে আছেন বলে মাঠপর্যায়ে আর্সেনিক পরিস্থিতি এখনো নাজুক বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক এনজিও ওয়াটারএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর খায়রুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও পয়োব্যবস্থায় বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে। আর্সেনিক সমস্যা সমাধানে নীতিনির্ধারকেরা জাতীয় আর্সেনিক নীতি (২০০৪) প্রণয়নসহ বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
কুষ্টিয়া থেকে মেহেরপুরে যাওয়ার পথে আলমপুর গ্রাম। গ্রামজুড়ে নিরাপদ পানির সংকট। গ্রামের বাসিন্দা প্রায় চার হাজার।
সম্প্রতি আলমপুরে গাড়ি থেকে নামার পর সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে রাস্তার পাশের ছোট বাজারটিতে ভিড় জমে যায়। ধান-চালের ব্যবসায়ী জিন্নাত আলী গেঞ্জি উঁচু করে শরীরের ছোপ ছোপ দাগ দেখিয়ে বলেন, ‘গা, হাত-পা চুলকায়। গায়ে বল পাই না। জানি বিষ, তারপরও কুয়ার পানি খাই। উপায় নেই।’
গ্রামের এবাড়ি থেকে ওবাড়ি গেলে এই প্রতিবেদকের পেছনে গ্রামবাসীর সারি বড় হয়। তাঁরা বলেন, গ্রামে গত এক দশকে নলকূপের পানি খেয়ে ১৭ জন মানুষ মারা গেছে। এর মধ্যে এক পরিবারেরই ছয়জন। ওই পরিবারের মো. পানু মারা গেছেন ১০ বছর আগে। তাঁর স্ত্রী নাসিমা বেগম বলেন, পানুর শরীরে ছোপ ছোপ দাগ ছিল, অ্যাজমা হয়েছিল, কিডনি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
গ্রামের মানুষের ধারণা, অন্য পাড়ার বিধবা মোছা. শুকজান হয়তো বাঁচবেন না।
পরে শুকজানের কাছ থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজপত্র নিয়ে দেখা যায়, তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পানিই আমাদের এই বিপদে ফেলেছে।’
ওই গ্রামে আর্সেনিকোসিস রোগীদের চিকিৎসার তথ্য সংরক্ষণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একটি করে পুস্তিকা দিয়েছিল। শুকজানকে দেওয়া এই পুস্তিকায় দেখা যায়, ২০১৪ সালের ২৪ জুলাইয়ের পর তাঁকে আর ওষুধ দেওয়া হয়নি।
স্থানীয় শাখা পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার মো. শামীম রেজা বলেন, ‘যাদের নিরাপদ পানি দেওয়ার কথা তারা তা দেয়নি। যাদের চিকিৎসা দেওয়ার কথা তারা দেয় না। সবাই আমাদের ভুলে গেছে।’
মেহেরপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, ২০০৩ সালের জরিপে আলমপুরের ৫৫ শতাংশ নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক ছিল। তখন গ্রামে আর্সেনিকোসিসের রোগী ছিল ১৬২ জন। বর্তমানে ৯০ শতাংশ নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে, রোগী প্রায় ৪০০।
নিরাপদ পানি সরবরাহের মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। আর স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি দেখভাল করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
আর্সেনিক পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে গত এক মাসে পাঁচবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবের কার্যালয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করা যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করে এবং খুদে বার্তা দিয়েও কথা বলা যায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক ফারুক ভুঁইয়া বলেন, গত জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত উন্নয়ন কর্মসূচিতে শুধু আর্সেনিক খাতে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা নেই
মেহেরপুরের সিভিল সার্জন রাশেদা সুলতানার সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে প্রথম আলোর কথা হয়। তিনি জানাতে পারেননি সর্বশেষ কবে আলমপুরে ভিটামিন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বড়ি দেওয়া হয়েছিল। কবে মজুত শেষ হয়েছে, তার হালনাগাদ তথ্যও পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক ব্যাধি কর্মসূচির আওতায় আর্সেনিকোসিস রোগী শনাক্ত করা ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ফারুক আহমেদ ভূঁইয়া গত সপ্তাহে প্রথম আলোকে বলেন, গত পাঁচ বা এক বছরে আর্সেনিকোসিস রোগীদের জন্য কত খরচ হয়েছে, তার হিসাব দপ্তরে নেই। মাঠপর্যায়ে আর্সেনিকোসিস রোগীদের ওষুধ দেওয়া বন্ধ থাকার কথা তিনি স্বীকার করেন।
নির্দিষ্ট প্রকল্প নেই
১৯৯৩ সালে প্রথম চাঁপাইনবাবগঞ্জের নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত হওয়ার পর বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার আর্থিক সহায়তায় নলকূপ পরিবর্তন, বিকল্প পানির উৎস প্রদান, সচেতনতা বৃদ্ধি ও রোগী ব্যবস্থাপনা-সম্পর্কিত বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছিল।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আর্সেনিক সমস্যা নিরসনে বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ, ডেনমার্কের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, কানাডার দাতা সংস্থা সিডা এবং ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় দেশব্যাপী সাতটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। এ ছাড়া সরকারের নিজস্ব অর্থে একাধিক প্রকল্পও বাস্তবায়িত হয়। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে আর্সেনিকপ্রবণ অঞ্চলে ২ লাখ ১০ হাজার পানির উৎস স্থাপন (মূলত নলকূপ) ও বিকল্প পানি সরবরাহের ব্যবস্থা (পন্ডস অ্যান্ড স্যান্ড ফিল্টার) স্থাপন করা হয়েছিল। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধির প্রকল্পের ফলে আর্সেনিকজনিত অনিরাপদ পানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
তবে এসব প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সরকার বড় কোনো প্রকল্প হাতে নেয়নি। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ) মো. সাইফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প, ইউনিসেফের সহায়তায় পানি সরবরাহ ও হাইজিন প্রকল্প এবং সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পল্লী পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই তিনটি প্রকল্পে ১৪৩টি পুকুর খনন ও ৯০ হাজার নলকূপ স্থাপন করা হবে। এতে আর্সেনিক সমস্যার অনেকটা সুরাহা হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর আর্সেনিকোসিসের রোগী বাড়ছে। ২০০৮ সালে ছিল ২৪ হাজার ৩৮৯ জন। ২০১২ সালে ছিল ৬৫ হাজার ৯১০ জন। তবে গত পাঁচ বছরের হিসাব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নেই।
‘আর্সেনিক সমস্যা নিরসনে জাতীয় নীতিমালা, ২০০৪’-এ আর্সেনিকবিষয়ক যাবতীয় কর্মকাণ্ড তদারকির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি এবং সমস্যা নিরসনে জাতীয় পর্যায়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের কথা বলা আছে। কিন্তু গত ১০ বছরে কমিটি দুটোর কোনো সভা হয়নি।
আর্সেনিক সমস্যা নিরসনে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, প্রায় এক যুগ আগে জাতীয় পর্যায়ে যেসব কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তার কথা মানুষ ভুলে গেছে। সেগুলো পুনর্গঠন করার সময় এসেছে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন মেহেরপুর প্রতিনিধি আবু সাঈদ)

আর্সেনিক বিষক্রিয়া
পানি বা অন্য কোনো মাধ্যমে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক দীর্ঘকাল (কমপক্ষে ছয় মাস) মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে ত্বকসহ নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এতে বুকে ও পিঠে ছোপ ছোপ বাদামি বা তিলের মতো কালো দাগ (মেলানোসিস), হাতের তালু ও পায়ের তলায় মিহি দানা বা চামড়া শক্ত বা খসখসে (কেরাটোসিস), হাতের তালু বা পায়ের তলায় কড়া (হাইপার কেরাটোসিস) দেখা দেয়। এগুলো আর্সেনিকোসিসের লক্ষণ। বিষক্রিয়ার একপর্যায়ে ত্বকে ক্যানসার হয়। রোগটি নিরাময়ে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করলে রোগীর অবস্থার উন্নতি হয়। রোগটি প্রশমনের জন্য ভিটামিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও মলম দেওয়া হয়।
সূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘আর্সেনিকোসিস রোগ নির্ণয় ও পর্যবেক্ষণ নির্দেশিকা’