সাংসদ দম্পতির ৬১৭ ব্যাংক হিসাব জব্দ
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের পৃথক দুই মামলায় সাংসদ কাজী শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুলসহ ছয়জনের ৬৭০টি ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পৃথক দুটি আবেদনের শুনানি নিয়ে আজ রোববার ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ কে এম ইমরুল কায়েস এই আদেশ দেন।
এর মধ্যে সাংসদ পাপুল ও তাঁর স্ত্রী সাংসদ সেলিনা ইসলামের ব্যাংক হিসাবই রয়েছে ৬১৭টি।
একই সঙ্গে সাংসদ পাপুলের দুটি ফ্ল্যাটসহ ৯২টি তফসিলভুক্ত সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। প্রথম আলোকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর ও মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) তাপস কুমার পাল।
দুদকের পিপি মাহমুদ হোসেন বলেন, মামলার তদন্তের স্বার্থে আসামি সাংসদ পাপুল এবং তাঁর স্ত্রী সেলিনা ইসলামের ৬১৭টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক (ডিডি) মো. সালাউদ্দিন। একই সঙ্গে গুলশানে পাপুলর দুটি ফ্ল্যাটসহ ৯২টি সম্পদ জব্দের আদেশ চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়। শুনানি নিয়ে আদালত ব্যাংক হিসাব ও সম্পদ জব্দের আদেশ দেন। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি তাপস কুমার পাল প্রথম আলোকে বলেন, পল্টন থানার অর্থ পাচার মামলায় সাংসদ পাপুলসহ ছয়জনের ৫৩টি ব্যাংক হিসাব জব্দের আদেশ চেয়ে আদালতে আবেদন করেন সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন।
আদালত শুনানি নিয়ে এসব ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেন। আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন উল্লেখ করেন, আসামি পাপুলসহ ছয়জনের ৫৩টি ব্যাংক হিসাবে (এফডিআরসহ) মোট ৩৫৫ কোটি ৮৬ লাখ ২৯ হাজার ৬৭০ টাকা পাওয়া গেছে। এসব টাকার প্রধান উৎস মানব পাচারের মাধ্যমে অপরাধলব্ধ আয় বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। আসামির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সঙ্গে অপরাধলব্ধ আয়ের যোগসূত্র নির্ণয়ের কাজ চলমান রয়েছে। এর আগে ২২ ডিসেম্বর সাংসদ পাপুলসহ ছয়জনের নামে মামলা করে সিআইডি। মামলায় বলা হয়, মানব পাচার করে প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ-সাত লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিতেন আসামিরা। গত চার বছরে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা দুই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কুয়েতে মানব পাচার করে সোয়া ৩৮ কোটি টাকা আয় এবং পাচার করেছেন। মামলায় সাংসদ পাপুলসহ ছয়জন এবং তাঁর স্বজনদের দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়।
এজাহারভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন সাংসদ পাপুলের মেয়ে ওয়াফা ইসলাম, ভাই কাজী বদরুল আলম, শ্যালিকা জেসমিন প্রধান, ব্যক্তিগত কর্মচারী মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান, জব ব্যাংক ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপক ব্যবস্থা গোলাম মোস্তফা। এ ছাড়া জব ব্যাংক ইন্টারন্যাশনাল (মালিক বদরুল আলম) এবং জে ডব্লিউ লীলাবলী প্রতিষ্ঠানকেও (মালিক জেসমিন প্রধান) আসামির তালিকায় রাখা হয়।
গত ৬ জুন রাতে কুয়েত সিটির বাসা থেকে দেশটির গোয়েন্দারা সাংসদ পাপুলকে গ্রেপ্তার করেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে মানব ও মুদ্রা পাচারের অভিযোগ আনা হয়। এ ছাড়া তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করে কুয়েতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত ১৭ সেপ্টেম্বর মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। আগামী ২৮ জানুয়ারি রায় ঘোষণার দিন ধার্য রয়েছে।
মামলায় বলা হয়, সাংসদ পাপুল সংঘবদ্ধভাবে অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় মানব পাচারের মাধ্যমে প্রচুর অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। এই অপরাধলব্ধ আয় জ্ঞাতসারে অর্জন, ভোগ, অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পদে রূপান্তর করা মানি লন্ডারিং আইনের ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
কুয়েতে অবৈধ মুদ্রা ও মানব পাচারের অভিযোগে সাংসদ পাপুলের প্রতিষ্ঠান মারাফিয়া কুয়াতিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করে সে দেশ থেকে পাচার হওয়া ১০ জনকে গত জুনে দেশে পাঠানো হয়। তাঁরা দেশে ফিরে সিআইডিকে জানান, সাংসদ পাপুলের কর্মচারী সাদিকুর ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত লোকজন সংগ্রহ করে কুয়েতে নেওয়ার জন্য তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে মগবাজারে অবস্থিত জব ব্যাংক ইন্টারন্যাশনালে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা করে জমা নেন এবং কারও কাছ থেকে টাকাও গ্রহণ করেন। এজাহারভুক্ত অন্য আসামিরা তাঁদের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব থেকে অবৈধ লেনদেন করেছেন।
গত জুনে জব ব্যাংকের ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফাকে কুয়েত থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি সাংসদ পাপুলের ভাই বদরুল আলমের নির্দেশনায় প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা নিয়ে কুয়েতে মানব পাচার করার কথা স্বীকার করেন।
চলতি বছরের ১১ নভেম্বর মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে কুয়েতে গ্রেপ্তার লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাংসদ কাজী শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুল ও তাঁর স্ত্রী সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাংসদ সেলিনা ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৩১ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ১৪৮ কোটি টাকার অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, শহিদ, সেলিনা, জেসমিন ও ওয়াফার পাঁচটি হিসাবের মাধ্যমে ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১৪৮ কোটি টাকা পাচার হয়। জেসমিন ও ওয়াফার বৈধ কোনো আয়ের উৎস নেই। জেসমিন এফডিআর হিসেবে ২ কোটি ৩১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৮ টাকা দেখিয়েছেন। তাঁর কোনো বৈধ উৎস তিনি দাখিল করতে পারেননি। শহিদ ও সেলিনার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ আনা হয়।