সাফাই সাক্ষ্যের প্রথম দিনে বংশপরিচয়ের দীর্ঘ বিবরণ দিলেন সাকা চৌধুরী

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নিজের পক্ষে প্রথম সাফাই সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিতে শুরু করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাংসদ সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী। তাতে নিজের বংশপরিচয়ের দীর্ঘ বিবরণ দেন।গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাকা চৌধুরী আংশিক জবানবন্দি দেন। তার আগে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে জবানবন্দির পদ্ধতিগত বিষয় নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সঙ্গে বাদানুবাদ করেন তিনি।ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমের শুরুতে সাকা চৌধুরীর আইনজীবী ফখরুল ইসলাম বলেন, একাত্তরে সাকা চৌধুরীর সঙ্গে যাঁরা পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, তাঁরা সাক্ষ্য দিতে আসবেন। এ জন্য আসামিপক্ষ গতকাল সাফাই সাক্ষী না দিয়ে সময়ের আরজি জানান।

তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, অন্য যাঁরা সাক্ষ্য দেবেন, তাঁরা পরে আসবেন। এখন আসামি নিজে সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করুক।

এরপর সাকা চৌধুরী আসামির কাঠগড়া থেকে সাক্ষীর কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ান। এ সময় তাঁর হাতে ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও মামলার কিছু নথিপত্র।

শুরুতেই সাকা চৌধুরী বলেন, তিনি ইংরেজিতে সাক্ষ্য দেবেন। এ জন্য সাক্ষ্যে কী লেখা হচ্ছে, তা তিনি দেখতে চান। তাই তাঁর সামনেও কম্পিউটারের একটি মনিটর দিতে হবে। এ ছাড়া তিনি মামলার বিভিন্ন কাগজপত্র থেকে সাক্ষ্য দেবেন বলেও জানান।

এমনিতে সাক্ষ্য সংরক্ষণে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য ট্রাইব্যুনালের এজলাসে তিনজন বিচারক, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবী এবং আসামির সামনে একটি করে মনিটর রয়েছে। কিন্তু সাক্ষীর সামনে কোনো মনিটর থাকে না।

সাক্ষীর সামনে মনিটর স্থাপন ও নথিপত্র দেখে সাক্ষ্য দেওয়ার ব্যাপারে সাকা চৌধুরীর আবেদনের বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জেয়াদ-আল-মালুম ও সুলতান মাহ্মুদ। এ বিষয়ে সাকা চৌধুরীর সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের বেশ কিছুক্ষণ বাদানুবাদ হয়। পরে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তে সাকা চৌধুরীর সামনে মনিটর দেওয়া হয়, তবে নথিপত্র দেখে সাক্ষ্য দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

এরপর বিতর্ক শুরু হয় শপথ পড়া নিয়ে। সাক্ষী হিসেবে সাকা চৌধুরীকে শপথ পড়ানোর পর এর বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর ১০(৫) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো আসামিকে শপথ পড়ানো যাবে না।

এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে সাকা চৌধুরীর শপথ প্রত্যাহার করা হয়। তখন সাকা চৌধুরীর আইনজীবী ফখরুল ইসলাম বলেন, যখন আসামি সাক্ষীর কাঠগড়ায় থাকবেন, তখন তিনি সাক্ষী। এ জন্য তাঁকে শপথ পড়াতে হবে।

এ সময় সাকা চৌধুরী নিজের আইনজীবীর উদ্দেশে বলেন, ‘আমি গত ৩৩ বছর ধরে সংসদ সদস্য। এখানে এসে শপথ নেবে ভ্যাগাবন্ড অ্যান্ড রাস্টিকরা (বাউণ্ডুলে ও গ্রাম্যরা)। আমার শপথ নেওয়ার কী দরকার, রাখো তো।’

এরপর জবানবন্দি শুরু করেন সাকা চৌধুরী। তিনি বলেন, তাঁর জন্ম ১৯৪৯ সালের ১৩ মার্চ। তাঁরা তিন ভাই ও দুই বোন। এভাবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে নিজের দাদা-নানা, ভাই-বোন, নিজের ছেলে-মেয়েদের নাম ও বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ভাই-বোন, বাবার শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাচাতো ভাইদের নাম প্রভৃতি উল্লেখ করেন।

সাকা চৌধুরী দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগের প্রথম পরিচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সব ধরনের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মূল হচ্ছে দ্বিজাতিতত্ত্ব। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ২৮৮ পৃষ্ঠাজুড়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দুঃখগাথা বিবৃত করেছেন, যা আনুষ্ঠানিক অভিযোগে অবজ্ঞাভরে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের যে সীমানার কথা উল্লেখ আছে, তা এসেছে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। এ সীমানার অবসান ঘটানোর ছদ্মবেশী অপচেষ্টার অংশ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এটা সার্বভৌম বাংলাদেশের অখণ্ডতার প্রতি পার্শ্ববর্তী দেশের জন্য একটি উন্মুক্ত আমন্ত্রণ ও প্ররোচনা বলে দাবি করেন তিনি।

সাকা চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার তিন মাসের মধ্যে মিত্রবাহিনীর সেনাদের ফেরত পাঠিয়ে সমসাময়িক বিশ্বে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় দিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৬৮ বছর পরও জাপান বা জার্মানি মিত্রবাহিনীর সেনাদের ফেরত পাঠাতে পারেনি।

জবানবন্দির এ পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি জেয়াদ-আল-মালুম বলেন, সাক্ষীর এসব বক্তব্য মামলার অভিযোগের সঙ্গে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। এ জন্য তাঁর এসব বক্তব্য সাক্ষ্য থেকে বাদ দিতে হবে।

সাকা চৌধুরী উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘আমার বিচার হচ্ছে উত্তরাধিকারসূত্রে। তাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার বাবার সম্পর্কও সাক্ষ্যে টানতে চাই।’

এ সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘জনাব সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আপনাকে পর্যাপ্ত সুযোগ দিচ্ছি। আগেও বলেছি, এখনো বলছি, কাঠগড়ায় থাকা অবস্থায় উত্তেজিত হবেন না। এর পর থেকে জবানবন্দি সংক্ষিপ্ত আকারে বিষয়বস্তুর মধ্যে রাখার চেষ্টা করবেন।’

সাকা চৌধুরীর জবানবন্দি অসমাপ্ত রেখে মামলার কার্যক্রম আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।