বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশের জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন এমনই ক্ষুরধার স্মৃতিশক্তির অধিকারী। তিনি ঢাকা কলেজের তাঁর ১২০ জন সতীর্থের নাম ও ক্রমিক নম্বর অনায়াসই বলতে পারতেন। বুয়েট-৬৩ ব্যাচের পুনর্মিলনীগুলোয় সব সহপাঠীর পূর্ণ নামসহ নানা তথ্য কোনো নোট ছাড়াই নির্ভুলভাবে পরিবেশন করতে পারতেন। উল্লেখ্য, ১৯৫০ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় যাঁরা প্রথম হয়েছিলেন, তাঁদের নাম, স্কুলের নাম, বর্তমানে কে কোথায় কাজ করেন ইত্যাদি নানা তথ্য তিনি মুহূর্তের মধ্যেই বলতে পারতেন। কখনো কখনো কোনো লম্বা ভ্রমণের খুঁটিনাটি ঘটনা ও দৃশ্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করতে পারতেন। ১৫ বা ২০ বছর পর কোনো প্রিয়ভাজন ছাত্রের সঙ্গে দেখা হলে তাঁর পুরো নাম একেবারে নিখুঁতভাবে বলে দিতে পারতেন। অনেক সময় তাঁর আত্মীয়স্বজন সম্পর্কেও তথ্য দিতে পারতেন। এ জীবনে তিনি অনেক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। সব প্রতিষ্ঠানকেই তিনি মনে রেখেছেন এবং সেগুলো–সম্পর্কিত পুরোনো কিংবা নতুন তথ্যাদি নির্ভুলভাবে বলতে পারতেন। একবার তাঁর সঙ্গে বারডেম প্রসঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বারডেমের শুধু বর্তমান মহাপরিচালকের নামই নয়, বরং তাঁর আগে কে ছিলেন, তাঁর আগে কে ছিলেন এবং তাঁরা বর্তমানে কে কোথায় আছেন ইত্যাদি সব তথ্য মুহূর্তের মধ্যে বলে দিলেন।

কোনো একবার আলোচনায় প্রশ্ন এল, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার খুবই উঁচু পদে আসীন ছিলেন? তাৎক্ষণিকভাবে তিনি একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেলের নাম উল্লেখ করলেন। মজার ব্যাপার হলো, যুক্তরাজ্যে থাকাকালে, সেই লেফটেন্যান্ট জেনারেলের ভাইয়ের সঙ্গে যে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং প্রাসঙ্গিক কথাবার্তা হয়েছিল, সেগুলোও বর্ণনা করলেন। অসংখ্য ভিন্নধর্মী সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেছেন, সব সদস্যকেই তিনি ঠিকভাবে চিনতেন কিংবা মুহূর্তের মধ্যেই সাধারণ পরিচিতির মাধ্যমেই তাঁদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠতেন। অধ্যাপক চৌধুরীর পরিচিত যেকোনো দুজন মানুষের মধ্যে স্বল্পতম দূরত্বের আত্মীয়তার যোগসূত্র মুহূর্তের মধ্যেই ধরে ফেলতে পারতেন। গল্পচ্ছলে যেসব ঘটনা কিংবা ব্যক্তি প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে, তাঁদের নানা খুঁটিনাটি যেমন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, পড়ালেখার ফলাফল কত ভালো কিংবা তার কোনো নিকট আত্মীয়ের পড়ালেখাসহ অন্য কোনো বিশেষত্ব যদি থেকে থাকে, তবে সেগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করতেও অধ্যাপক চৌধুরী অত্যন্ত সাবলীল ও নিখুঁত ছিলেন।

তথ্যসমৃদ্ধ যেকোনো একটি ডকুমেন্ট তাঁর নজরে এলে মুহূর্তের মধ্যেই ওই ডকুমেন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাঁর চোখে পড়ে যায়। সত্তরোর্ধ্ব বয়সেও চলমান গাড়িতে সুডোকুর মতো কঠিন সমস্যার সমাধানে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে কার্পণ্য করতেন না। একবার ব্রিটিশ কাউন্সিলের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রোগ্রামে দুবাইয়ে গিয়েছিলাম। সেই প্রোগ্রামের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল অনেকগুলো ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়। ওই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি যে র​্যাঙ্কিংয়ে একেবারেই নিম্নমানের, তা তিনি মুহূর্তের মধ্যেই ধরে ফেলেন এবং ওই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানটির উদ্যোক্তা হওয়ার কারণ জানতে চান।

বাংলাদেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ডিজাইন কিংবা তৈরিতে তিনি প্রশংসনীয় অবদান রেখেছেন, তা বঙ্গবন্ধু সেতু, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, উপকূলীয় অঞ্চলে ত্রাণকেন্দ্র—যা–ই হোক না কেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা কিংবা শিল্প ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবেও তাঁর নিজ ক্ষেত্রের বাইরে দেশের, সমাজের কল্যাণে অবদান রেখেছেন। তিনি দেশের, রাষ্ট্রের ও জাতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে দীর্ঘদিন অবস্থান করেছেন বিধায় বাংলাদেশের নানা ঘটনার তিনি একটি জীবন্ত বিশ্বকোষ।

ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ২০১০ সালে সম্মানসূচক ডক্টর অব ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি প্রদান করে। ২০১৭ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। ২০১৮ সালে জাপান সরকার অধ্যাপক চৌধুরীকে অর্ডার অব দ্য রাইজিং সান পদকে ভূষিত করে। তাঁর প্রচেষ্টাতেই আইসিপিসির বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২২ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। খুবই অসময়ে স্যার আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। অবশ্য এ রকম মানুষের মৃত্যু কখনো সময়ে হয় না। তিনি সারা দেশের জন্য একটি বাতিঘর ছিলেন, সবার জন্য তিনি একটি রোল মডেল ছিলেন, মেধার মূর্ত প্রতীক ছিলেন।

ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ: ডিসটিংগুইজড অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন