সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে দুর্গতি কমছেই না

রাজধানীর হাতিরপুল থেকে মো. লিটন যাবেন নারায়ণগঞ্জ সাইনবোর্ড এলাকায়। সিএনজিচালক ভাড়া চেয়েছেন ৩৫০ টাকা। পরে ৩২০ টাকায় রফা হলো। এ বিষয়ে লিটন বলেন, ‘উপায় নেই, যেতেই হবে। এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। বিচার দেব কার কাছে? বিচার করবেই বা কে?’

রাজধানী ঢাকার প্রায় সব জায়গার চিত্র কমবেশি একই রকম। মিটারে কোনো সিএনজিচালক যেতে চান না। স্বল্প দূরত্ব হলে আগ্রহ পান না তাঁরা। এ ছাড়া মিটারে যেতে চাইলেও আবদার থাকে ২০ থেকে ৩০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার। সিএনজি মালিকেরা জমা (ভাড়া) বেশি নেন, অনেক যাত্রী জ্যামে পড়লে মিটার বন্ধ করতে বলেন কিংবা নেমে যান—এসব কারণে চালকেরা ভাড়া বেশি নিয়ে থাকেন বলে কয়েকজন চালক স্বীকার করেন। আর যাত্রীরা বলছেন পরিস্থিতি একদমই নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

মিটারে যেতে চায় না সিএনজি অটোরিকশা। যাত্রী নেওয়ার জন্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে যত্রতত্র। ছবি: লুৎফরজামান
মিটারে যেতে চায় না সিএনজি অটোরিকশা। যাত্রী নেওয়ার জন্য রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে যত্রতত্র। ছবি: লুৎফরজামান

রাজধানী ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার নতুন ভাড়ার হার ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়। নতুন ভাড়া অনুযায়ী অটোরিকশার প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৪০ টাকা। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া হবে ১২ টাকা করে। প্রতি এক মিনিট অপেক্ষার (যাত্রাবিরতি, যানজট ও সিগন্যাল) জন্য দুই টাকা। আর মালিকের জমা নির্ধারণ করা হয় ৯০০ টাকা।

কয়েকজন চালক অভিযোগ করেছেন, সরকার নির্ধারিত সিএনজির জমা ৯০০ টাকা। কিন্তু অনেক মালিক হাজার টাকা আবার অনেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত জমা নেন। এ অবস্থায় সিএনজিচালকদের করণীয় কী, তা তাঁরা জানতে চান।
চালকেরা বলছেন, বর্তমান বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। সকাল নয়টায় একটি সিএনজি নিয়ে বের হলে জমা তুলতে বিকেল চারটা কিংবা পাঁচটা বেজে যায়। এরপর দুই বেলা খাবার খাওয়ার জন্য অন্তত এক ঘণ্টার বিরতি দিতে হয়। এসব করার পর একজন সিএনজিচালকের নিজের জন্য টাকা থাকে খুব সামান্য। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ট্র্যাফিক পুলিশকে যে টাকা দিতে হয়, সেটাও অনেক বড় সমস্যা বলে জানান চালকেরা।
নির্ধারিত ৯০০ টাকার চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে যে কজন মালিকের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁরা বেমালুম তা অস্বীকার করেছেন।
চালক-মালিকের এমন অভিযোগ ও আবদারের খেসারত কিন্তু দিতে হচ্ছে নগরবাসীকেই। রাস্তায় বেরোলেই সিএনজি অটোরিকশায় চড়তে গিয়ে সীমাহীন যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা হচ্ছে তাঁদের।
রাজধানীর বাংলামোটর মোড়ে এক যাত্রী শান্তিনগর যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ঠিক করছিলেন। প্রথমে একজন চালক যেতে চাইলেন না। চালকের যুক্তি কম দূরত্বে গিয়ে লাভ হবে না। অন্য আরেকজন চালক রাজি হলেন, তবে ভাড়া ২০০ টাকা। যাত্রীটি বাধ্য হয়ে হাঁটা দিলেন অন্য আরেকটির খোঁজে।
অপর একজন যাত্রী সাইফুল ইসলাম। তিনি দুটি টাইলসের প্যাকেট নিয়ে এলিফ্যান্ট রোড থেকে মিরপুর যাবেন। সিএনজিচালক ভাড়া চেয়েছেন ৩০০ টাকা। চালকের যুক্তি, অনেকটা সময় জ্যামে বসে থাকতে হবে—এ জন্য এই ভাড়া চেয়েছেন। কোনো উপায় না পেয়ে ওই সিএনজিতেই গেলেন সাইফুল।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সিএনজির ভাড়া বাড়ানোর সময় সরকারকে আহ্বান করেছিলাম একটি গণশুনানি করতে। এতে সব পক্ষের সমস্যা-সুবিধা জানা যেত। কিন্তু তা করা হয়নি। এখন তো আবার আগের মতোই চলছে।’ তিনি বলেন, সিএনজি যাত্রীদের জন্য যদি একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থাকত, তাহলে অন্তত যাত্রীরা তাৎক্ষণিক কিছু সমস্যার সমাধান পেতেন।

ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আগামী ঈদের পরে ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ গাড়িতে আমরা মিটার নিশ্চিত করব। ঢাকার বাইরের ও ব্যক্তিগত সিএনজি অটোরিকশার কারণে আমাদের অনেক বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’

ভাড়া খাটে ব্যক্তিগত সিএনজি: রাজধানীতে চলে দুই ধরনের সিএনজি অটোরিকশা। একটি ভাড়ায় চালিত। অর্থাৎ এই শ্রেণির সিএনজি ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। এসব সিএনজি কেনার সময় দামও বেশি পড়ে। কারণ, এগুলোতে বেশি হারে কর দিতে হয়। আর এক প্রকার সিএনজি আছে, সেটি ব্যক্তিগত। কেউ নিজের অফিস বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের জন্য এসব সিএনজি কিনে থাকেন। এ ধরনের সিএনজি তুলনামূলক কম দামের হয়ে থাকে। ব্যক্তিগত হওয়ার কারণে এসবের অনেক সুযোগ-সুবিধাও থাকে।

ব্যক্তিগত সিএনজি অটোরিকশার ভাড়ায় যাত্রী পরিবহনের অনুমতি নেই। তবু যাত্রী পরিবহন করছে এসব অটোরিকশা। ছবি: লুৎফরজামান
ব্যক্তিগত সিএনজি অটোরিকশার ভাড়ায় যাত্রী পরিবহনের অনুমতি নেই। তবু যাত্রী পরিবহন করছে এসব অটোরিকশা। ছবি: লুৎফরজামান

এখন ব্যক্তিগত এসব সিএনজি ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করছে। ব্যক্তিগত সিএনজিতে কোনো মিটার থাকে না। যার ফলে এখানে ভাড়া ঠিক করে উঠতে হয়। অনেকে অভিযোগ করেছেন, বেশি লাভের আশায় অনেকে ভাড়ায়চালিত সিএনজি ব্যক্তিগত সিএনজিতে পরিবর্তন করছেন। ভাড়ায় চালিত সিএনজির সবুজ রং পরিবর্তন করে সাদা রং ব্যবহার করা হয়। আর মিটার খুলে ফেলা হয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিচালক (প্রশাসন) নাজমুল আহসান মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে সিএনজি মালিকদের নিয়ে একটি বৈঠক হবে। এতে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা হবে।’
নাজমুল আহসান বলেন, ‘আমরা যখন ভ্রাম্যমাণ আদালত বসাই, তখন যাত্রীদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা বলেন মিটারে এসেছেন। এরপর কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যায়?’ সিএনজি অটোরিকশা মিটারে কম যেতে চায় বলে তিনি নিজেও প্রমাণ পেয়েছেন বলে জানান।

ব্যক্তিগত সিএনজি বিষয়ে নাজমুল আহসান বলেন, ব্যক্তিগত সিএনজি অটোরিকশার ব্যবসা করার অনুমোদন নেই। এসব সিএনজির মালিকেরা বোধ হয় আদালত থেকে অনুমোদন নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন।