বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৫ নভেম্বর ২০০৭। এদিন বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে আঘাত হানে ভয়ানক ঘূর্ণিঝড় সিডর। আঘাতের সময় সিডরের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার। তবে এ সময় দমকা হাওয়ার বেগ উঠছিল ঘণ্টায় ৩০৫ কিলোমিটার পর্যন্ত। সিডরের প্রভাবে উপকূলে ১৫ থেকে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়।

সিডর কতটা ভয়াবহ ছিল, তা বোঝাতে পশ্চিমা গণমাধ্যম ঘূর্ণিঝড়টিকে সে সে সময় ব্যাখ্যা করেছিল ‘এ সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম উইথ কোর অব হারিকেন উইন্ডস’ হিসেবে। আমাদের বরাত ভালো এ কারণে যে সিডর ভরা জোয়ারের সময় উপকূলে আছড়ে পড়েনি। এতে প্লাবন কম হয়েছে। নইলে মানুষের মৃত্যু আরও অনেক বেশি হতে পারত।

মানবিক সহায়তাদানকারী সংস্থা রেড ক্রিসেন্ট বাংলাদেশের প্রধান সেই সময় ১০ হাজার মানুষের প্রাণহানির কথা বলেছিলেন। তবে সরকারিভাবে বলা হয়েছিল, প্রাণহানি হয়েছে ছয় হাজারের মতো। মৃতের সংখ্যা নিয়ে বাহাস ও মতান্তর নতুন কিছু নয়। নানা কারণ আর চাপে সব সময় সবার আঁচ অনুমান এক হয় না।

সিডরে অবকাঠামোগত অনেক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের সঙ্গে জলোচ্ছ্বাসে মানুষের বাড়িঘর ভেসে যায়। গবাদিপশুর মৃত্যু হয়। ফসলের ক্ষতি হয়। নেমে আসে বিপর্যয়।

সিডরের গতিপথ ও ক্ষয়ক্ষতি

২০০৭ সালের ১৩ নভেম্বর থেকেই সারা দেশের আকাশ ছিল মেঘলা। আবহাওয়া অফিস প্রথমে ৫ নম্বর সংকেত দেয়। ১৪ নভেম্বর রাতে তা ৮ নম্বর বিপৎসংকেতে গিয়ে পৌঁছায়। অর্থাৎ বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটারের বদলে ৮৯ কিলোমিটার বা তার বেশি হতে পারে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়।

৮ নম্বর বিপৎসংকেতের মানে হলো প্রচণ্ড ঝড়টি বন্দরকে বাঁ দিকে রেখে উপকূল অতিক্রম করবে। সংকেতের এসব মাজেজা বন্দর, জাহাজ আর আবহাওয়া অফিস যত সহজে বোঝে, সাধারণ মানুষ তেমন বোঝেন না। যা–ই হোক, সেদিন (১৪ নভেম্বর ২০০৭) সন্ধ্যার মধ্যেই ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো মানুষে মানুষে ভরে যায়।

পরদিন সকালে বৃষ্টিবাদল না থাকায় নির্ঘুম রাত কাটানো মানুষের অনেকেই নিজের বাড়ি ফিরে যায়। ইতিমধ্যে একটু জিরিয়ে নিয়ে সিডর আবার চলতে শুরু করে। বলে রাখা ভালো, ঘূর্ণিঝড় তার গতিপথে থেমে যাওয়া ভয়ংকর বিপদের আলামত। থেমে সে শক্তি সঞ্চয় করে আরও দুর্বার হয়ে ওঠে।

সকাল শেষে (১৫ নভেম্বর) ঘোষণা আসে সিডর নামের ঘূর্ণিঝড় ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে বাংলাদেশের উপকূলে। দুপুর নাগাদ তা বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করবে। সকালে বাড়ি ফিরে যাওয়া মানুষের কাছে এ ঘোষণা রাখাল বালকের চিৎকার বলে মনে হয়েছিল। তাই অনেকেই আবার বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার কথা ভাবেননি।

সন্ধ্যার পর থেকে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের গতি বাড়তে থাকে। রাত ৯টার দিকে সিডর প্রথম আঘাত হানে সুন্দরবনের কাছে দুবলারচরে। এরপর বরগুনার পাথরঘাটায় বলেশ্বর নদের কাছে উপকূল অতিক্রম করে। সিডরের আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় বরিশাল ও খুলনা বিভাগের উপকূলীয় অঞ্চল। ধ্বংসযজ্ঞ চলে বাগেরহাট, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, সাতক্ষীরা, লক্ষ্মীপুর, ঝালকাঠিসহ দেশের প্রায় ৩১টি জেলায়।

সিডরের প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। গাছপালা উপড়ে যায়। দেশের বিদ্যুৎ–ব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দেয়। বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে নগরগুলোর পানি সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

সিডরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা হিসেবে চিহ্নিত হয় বাগেরহাট আর বরগুনা। সরকারি হিসাবে বাগেরহাট জেলায় নিহত হন ৯০৮ জন ও আহত হন ১১ হাজার ৪২৮ জন। বরগুনা জেলায় মারা যান ১ হাজার ৩৪৫ জন। নিখোঁজ ছিলেন ১৫৬ জন।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা ছিল বাগেরহাটের শরণখোলা। আর শরণখোলার মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাউথখালী ইউনিয়ন। শরণখোলা ছাড়াও বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ ও মোংলা উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়।

সিডর আক্রান্ত এলাকায় জায়গার অভাবে গণকবর দিতে হয়। অনেক লাশের কোনো পরিচয়ও পাওয়া যায়নি। কাপড়ের অভাবে অনেক মরদেহ পলিথিনে মুড়িয়ে দাফন করা হয়। ঘটনার এক মাস পরেও ধানখেত, নদীর চর, বেড়িবাঁধ, গাছের গোড়া আর জঙ্গলের নানা আনাচকানাচ থেকে লাশ, লাশের অংশবিশেষ অথবা কঙ্কাল উদ্ধার হয়। কেউ কেউ সিডর আঘাত হানার অনেক দিন পর স্বজনদের কাছে ফিরেও আসেন। স্মৃতি হারিয়ে অনেকেই আর গ্রামের বাড়ি খুঁজে পাননি। ফিরতে পারেননি।

নিখোঁজদের কথা

সরকারি হিসাবে সিডরে ১ হাজার ১ জনের নিখোঁজের কথা বলা হয়েছিল। তবে প্রকৃত নিখোঁজের সংখ্যা এর দ্বিগুণ বা তার বেশি হতে পারে বলে উপকূলবাসী তখন ধারণা করেছিল।

লাশ পাওয়া না গেলে ব্যক্তি আইনের চোখে নিহত হিসেবে গণ্য হন না। খয়রাতি ক্ষতিপূরণের হকদার হতে পারে না তাঁর পরিবার। নিখোঁজ জলদাসদের স্ত্রীরা শাঁখা হাতে বিধবা বধূর জীবন যাপন করেন। পাথরঘাটার লাশ না পাওয়া ৪৬ জন জেলেকে শেষ পর্যন্ত আর মৃত ঘোষণা করা হয়নি। আজ পর্যন্ত তাঁদের কেউ ফিরেও আসেননি।

পাথরঘাটার বাদুড়তলা গ্রামের নিখোঁজ জেলে জাকির হোসেনের স্ত্রী মাসুরা বেগম তাঁর চার মেয়েকে লেখাপড়া করাতে পারেননি। এক মেয়ে মারা গেছে। আর বাকি তিন মেয়েকে তিনি অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। নিখোঁজের স্ত্রী বিধবা নন, তাই তিনি বিধবা ভাতার হকদার নন।

পাথরঘাটার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মোহাম্মদ হাসানের বাবাও সিডরে নিখোঁজ। হাসান পড়ছে স্থানীয় বারি আজাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। বাবার কোনো স্মৃতি তার মনে পড়ে না। ২০০৭ সালে হাসান কেবল হাঁটা শিখেছিল। মায়ের কাছে শুনেছে, বাবা তার হাত ধরে উঠানে হাঁটতেন। তার বড় সান্ত্বনা তার মা দ্বিতীয় বিয়ে করে তাকে ছেড়ে চলে যাননি। বাবা থাকলে করোনাকালে স্মার্টফোনের অভাবে পড়াশোনায় সে পিছিয়ে যেত না। মা মর্জিনা কোনো ভাতা পান না। দিনমজুরি করে ছেলেকে পড়াচ্ছেন। মর্জিনার মতো অনেক মা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন নিজেদের চেষ্টায়।

সিডরের দুদিন আগে সাগরে মাছ ধরতে যান বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার হোসেন আলী (ছদ্মনাম)। সেদিন যখন ফজরের ওয়াক্তে সাত জেলের সঙ্গে সাগরে যাত্রা করেন, তখন তাঁর ১০ বছরের মেয়ে আর ৫ বছরের ছেলে ঘুমিয়ে ছিল। দীর্ঘ ১৪ বছরে তিনি ফেরেননি। নিখোঁজের স্ত্রী আজিজা বেগমের (ছদ্মনাম) নতুন জীবনযুদ্ধ শুরু হয় সেই ২০০৭ সাল থেকে। দুই সন্তানের লেখাপড়া চালিয়ে নেন আজিজা। তাঁর মেয়ে এখন রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকে চাকরি পেয়েছেন। ছেলে এখন স্নাতকে ভর্তির অপেক্ষায় রয়েছেন।

নিখোঁজদের কেউ কি ফেরে

সিডরে নিখোঁজ হওয়ার সাড়ে ৯ বছর পরে বাড়িতে ফিরে আসেন আমতলীর ঘটখালী গ্রামের এনসান আলীর ছেলে সোহেল (২৮)। কিন্তু তাঁর বাক্‌শক্তি নেই। কোথা থেকে কীভাবে ফিরে এসেছেন, কেউ বলতে পারে না। নিখোঁজ সোহেল ফিরে আসার পরে পরিবারের লোকজন চিকিৎসা করিয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ফল মেলেনি।

সিডরের ১০ বছর পর ফিরে আসেন বরগুনার তালতলী উপজেলার তেতুঁলবাড়িয়া গ্রামের জেলে হানিফ গাজী। তাঁর ফিরে আসার গল্পটি এমন, তেতুঁলবাড়িয়া ও জলায়ভাঙ্গা এলাকায় মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় এক ব্যক্তি ঘোরাফেরা করছিলেন। শুক্কুর গাজী ভাত খাওয়ানোর কথা বলে তাঁকে বাড়ি নিয়ে যান। বাড়ির মেয়েরা দেখে চিনতে পারেন এই ব্যক্তিই হারিয়ে যাওয়া হানিফ।

হানিফের বাবা মেনসের গাজী বাড়ি ফিরে ছেলেকে দেখে প্রথমে চিনতে পারেননি। পরে ছেলের নাভির ওপর পোড়া ও পিঠে কালো দাগ দেখে নিশ্চিত হন, ছেলেটি তাঁরই সন্তান। হানিফ কিন্তু সোহেলের মতো বাকরুদ্ধ। এখন তিনি শুধু বাবার নাম একটু একটু বলতে পারেন।

শরণখোলা বাজার থেকে মানসিক প্রতিবন্ধী এক যুবককে তাঁর পরিবার পিরোজপুরে নিয়ে গেছে গত বছর। ১৩ বছর ধরে এই যুবক ঘুরে বেরিয়েছেন শরণখোলার পথে পথে।

সামাজিক সুরক্ষা কেন নয়

সাইক্লোনে যেসব মা-বাবা নিখোঁজ হয়েছেন, তাঁদের সন্তানদের নিকটতম আত্মীয়দের কাছে রেখে বিকাশকে অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নিয়েছিল দেশের শিশু অধিকার সংগঠনগুলো। জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) তখন এগিয়ে এসেছিল। পরে মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেয়।

‘আমাদের শিশু’ নামের সেই কর্মসূচি নিখোঁজ জেলেদের অনেক শিশুকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহায়তা করে। এদের মধ্যে কেউ কেউ সফলতার সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করতে পেরেছে। সবাই পারেনি। অনেকেই বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। অনেকে শিশুশ্রমে বাধ্য হয়েছে। হারিয়ে গেছে সরকারি তালিকা থেকে।

ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও মাছ ধরতে গিয়ে দুর্ঘটনায় সাগরেই নিহত হচ্ছেন অনেক জেলে। তাঁরা নিখোঁজ বলে গণ্য হচ্ছেন। তাঁদের একটা বিমার আওতায় আনা কি খুবই কঠিন? নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্ত্রীরা কেন কোনো সামাজিক সুরক্ষাবলয়ের সাহায্য পাবেন না? হানিফ, সোহেল বা কাসেমের মতো ঘূর্ণিঝড়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কেন আট বছর, নয় বছর রাস্তায় রাস্তায় বাকরুদ্ধ হয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ‘রোল মডেল’ বাংলাদেশে?

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন