বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এক বছর পর সাইফুলের অস্ত্রোপচার হয়েছে। এখন যারা সিরিয়াল পাচ্ছে, সেই শিশুদের কারও কারও অস্ত্রোপচারের জন্য দুই থেকে আড়াই বছর লেগে যেতে পারে।

সিরিয়াল জটের কারণ

শিশু সাইফুলের অস্ত্রোপচার করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সারওয়ার ইবনে সালাম। প্রথম আলোকে তিনি জানান, জরুরি রোগীদের প্রাধান্য দেওয়া, শিশু রোগীর চাপ বেশি থাকা, অস্ত্রোপচারকক্ষের স্বল্পতা ও করোনাকালে অস্ত্রোপচার সময় কমিয়ে দেওয়ার কারণে দীর্ঘ সিরিয়ালে পড়তে হচ্ছে শিশু রোগীদের।

ঢাকা মেডিকেলের তথ্য অনুসারে, হাসপাতালে অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের ছয়টি ইউনিটের একটি শিশুদের জন্য। এই ইউনিটটির জন্য সপ্তাহে এক দিন অস্ত্রোপচারকক্ষ (ওটি) বরাদ্দ থাকে। ৫ বছর ধরে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টা ওটি থাকত। করোনাকালে সেটি কমিয়ে সকাল ৮টা থেকে বেলা আড়াইটা করা হয়েছে। এক দিনে তিনটির বেশি অস্ত্রোপচার করা যায় না। সেই হিসাবে বছরে দেড় শর কম অস্ত্রোপচার করা যাবে। অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে আবার জরুরি রোগীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা বা ওপর থেকে পড়ে গিয়ে আহত রোগীদের কেউ শিশু না হলেও শিশু ইউনিটের অস্ত্রোপচারের দিনে তাদের অস্ত্রোপচার করা হয়। যেমন ৮ নভেম্বর দুটি শিশুর সঙ্গে একজন প্রাপ্তবয়স্ক জরুরি রোগীর অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সিরিয়ালে থাকা রোগীদের অস্ত্রোপচারের তারিখ আরও পিছিয়ে যায়।

default-image

সাইফুল প্রসঙ্গে চিকিৎসক সারওয়ার ইবনে সালাম বলেন, শিশুটির অবস্থা বেশ জটিল। হাত ঘোরাতে পারে না। ছেলেটির যে ধরনের অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং আরও করার প্রয়োজন হবে, তা বিরল অস্ত্রোপচারের একটি। চিকিৎসার ভাষায় ‘পোস্ট ট্রমাটিক প্রক্সিমাল রেডিও আলনার সিনোসটোসিস’। সেটা সরকারি হাসপাতালের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) (যা পঙ্গু হাসপাতাল নামে পরিচিত) ছাড়া হয় না। ফলে দুটি হাসপাতালে চাপ বেশি থাকে এবং দীর্ঘ সিরিয়াল থাকে। অর্থোপেডিক সার্জারি ইউনিটগুলোর মধ্যে শিশু ইউনিটেই চাপ সবচেয়ে বেশি। এখন ১০০–এর কাছাকাছি সিরিয়ালের রোগীদের অস্ত্রোপচার হচ্ছে। গত শনিবার অস্ত্রোপচারের জন্য আসা শিশু রোগীদের যে সিরিয়াল দেওয়া হয়েছে, তা প্রায় পৌনে ৪০০। অর্থাৎ সিরিয়ালের সবশেষ শিশুটিরও অস্ত্রোপচারের ডাক পেতে আড়াই থেকে তিন বছর লেগে যাবে।

বহু পথ ঘুরে ঢাকা মেডিকেলে

শিশুর বাবা মোহাম্মদ জহির জানান, তাঁর দুই ছেলে-মেয়ের মধ্যে সাইফুল বড়। স্থানীয় একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ২০১৯ সালের ১০ নভেম্বর বাড়ির আমগাছ থেকে পড়ে গেলে বাঁ হাতে আঘাত পায়। উপজেলায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক এক্স-রে রিপোর্ট দেখে জানান, হাতের কনুইয়ের হাড় ফেটে গেছে। তিনি ১৯ দিনের জন্য প্লাস্টার করে দেন। যথাসময়ে প্লাস্টার খোলার পর হাত ঠিক না হলে দ্বিতীয় দফায় প্লাস্টার করেন চিকিৎসক। প্লাস্টার খোলার পর হাত বাঁকা হয়ে থাকায় চিকিৎসক গরম পানির সেঁক দিতে বলেন এবং ফিজিওথেরাপির পরামর্শ দেন। চাটখিল উপজেলায় আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে ১০টি ফিজিওথেরাপি দেন। এরপর চিকিৎসার জন্য কখনো নোয়াখালীর মাইজদী শহরে, কখনো কুমিল্লায় ঘুরেছেন ছেলেকে নিয়ে। এরপর এক চিকিৎসকের পরামর্শে প্রথমে পঙ্গু হাসপাতালে যান। সেখানে অস্ত্রোপচারের জন্য দু-তিন বছর লেগে যেতে পারে জানতে পেরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছেলেকে নিয়ে আসেন ২০২০ সালের নভেম্বরে।বহির্বিভাগে দেখানোর পর জানতে পারেন, সেখানেও সময় লাগবে। এরপর একজনের কাছ থেকে অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সারওয়ার ইবনে সালামের পান্থপথের চেম্বারের খোঁজ নিয়ে সেখানে দেখান। চিকিৎসক সব দেখেশুনে অস্ত্রোপচার করতে হবে বলে জানান। অস্ত্রোপচারের জন্য টাকার পরিমাণ শুনে আঁতকে ওঠেন জহির। ৮০-৯০ হাজার টাকা জোগাড় করা তাঁর জন্য সত্যিই কঠিন। চিকিৎসককে সেটা জানালে তিনি জহিরকে এক শনিবার এসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছেলেকে ভর্তি করাতে বলেন। কিন্তু ভর্তি করাতে এসে বিপত্তিতে পড়েন।

জহির বলেন, ‘২০২০ সালের ৩০ নভেম্বর বহির্বিভাগে ভর্তি করতে আসি। ওই সময় আমাকে অপারেশনের (অস্ত্রোপচার) জন্য ৮০ নম্বর সিরিয়াল দেয়। আমাকে বলা হয়, “নোয়াখালী থেকে এসেছেন, বাড়ি চলে যান, সিরিয়াল এলে আপনাকে ফোন করে ডাকা হবে।” কিন্তু ফোন আর আসে না। এক আত্মীয়ের মাধ্যমে মেডিকেলে বারবার খোঁজ নিতে থাকি।’ তিনি জানান, এ বছরের ৭ অক্টোবর তিনি ছেলেকে ভর্তি করানোর জন্য ঢাকা মেডিকেল থেকে ফোন পান। নোয়াখালী থেকে ঢাকায় আসেন ১০ অক্টোবর। ওই দিন ৮দিনের ২৭৫ টাকা করে শয্যাভাড়াসহ ২ হাজার ২০০ টাকায় ছেলেকে ভর্তি করান। তবে চার দিন পর শয্যা পান।

অস্ত্রোপচারের তারিখ নিয়ে ৬ নভেম্বর প্রথম আলোর কাছে বেশ উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, ‘এর আগে ১ নভেম্বর ভোর ছয়টায় অস্ত্রোপচারের তারিখ দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষক দেরি করতে পারে, কিন্তু ছাত্র দেরি করতে পারে না। তাই সাড়ে পাঁচটায় গিয়ে অস্ত্রোপচারকক্ষে ছেলেকে নিয়ে বসে থাকি। সকাল ১০টার সময়েও ছেলের সিরিয়াল না আসায় খোঁজ করতে গিয়ে জানি, সেদিনের তালিকায় সাকিবের নাম নেই। তাই অস্ত্রোপচার হবে না।’ পরে কাগজে ১–এর ওপর ঘষে ৮ লিখে অস্ত্রোপচারের নতুন তারিখ দেওয়া হয় ৮ নভেম্বর সকাল আটটায়।

জহির জানালেন, প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে তাঁরা ওই দিন ওয়ার্ডে ফিরে যান। ছেলের রক্তের গ্রুপ ও নেগেটিভ। এ গ্রুপের রক্তদাতা সহজে পাওয়া যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) গিয়ে স্বেচ্ছায় রক্তদাতা সংস্থা ‘বাঁধন’ থেকে একজন দাতার সন্ধান পান তিনি। ভোরে অস্ত্রোপচার হবে ভেবে আগের দিন দাতার কাছ থেকে রক্ত নিয়ে রাখেন। অস্ত্রোপচার না হওয়ায় রক্তের ব্যাগ ওই সংস্থায় ফেরত দিয়ে এসেছেন তিনি।

ছেলের জন্য ছোটাছুটি করতে গিয়ে কাজ করতে পারছেন না বলে আয় কমে গেছে। অন্যদিকে তাঁর সামর্থ্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। জহির বললেন, নোয়াখালীতে চিকিৎসা করতে গিয়ে ২ বছরে ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির আগে বন্ধু-স্বজন নানাজনের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা জোগাড় করে এনেছেন। অস্ত্রোপচারের আগেই ২৩ দিন ধরে আছেন। প্রতিদিনের শয্যা খরচ ছাড়াও খাওয়ার পেছনে খরচ হয়। ছেলের খাবার হাসপাতাল থেকে দেয়। স্বামী-স্ত্রী দুই বেলা শুধু সবজি–ডাল দিয়ে খেলেও দিনে ৩০০-৪০০ টাকা খরচ হয়ে যায়। ছেলে যথাযথ চিকিৎসা পাক ও সুস্থ হয়ে উঠুক, এখন শুধু এ প্রত্যাশাই তাঁর।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আশরাফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালের দু–একটি বিভাগে রোগীর জটিলতা ও চাপের কারণে অস্ত্রোপচারে সময় বেশি লেগে যায়। ঢাকা মেডিকেল থেকে কখনো কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। সবাইকে সেবা দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। জীবন রক্ষার জন্য এখনই অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, এমন রোগীর ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ৩০ শয্যার ওয়ার্ডের জন্য চিকিৎসক, নার্সসহ যে জনবল, সেই জনবল দিয়ে শতাধিক রোগীকে সেবা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন