বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

লং কোভিডে ফিজিওথেরাপি কেন প্রয়োজন

লং কোভিড নির্ণয়ের কোনো পরীক্ষা আপাতত নেই। কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী, কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ১২ সপ্তাহ পরও সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া যদি ক্লান্তি, দুর্বলতা, মনোযোগের ঘাটতি, শরীর ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কাশি, ক্ষুধামান্দ্য, অনিদ্রা, চুল পড়া ইত্যাদির কোনোটিতে ভোগেন, তাহলে ধরে নিতে হবে, তিনি লং কোভিডে ভুগছেন।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালিতে লং কোভিডে ১০-১১ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জরিপে তথ্য এসেছে। বাংলাদেশে সিআরপি, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও কেন্টের সমন্বিত গবেষণার সূত্র বলা হচ্ছে, ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ করোনা রোগীর মধ্যে লং কোভিড উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। এই রোগীদের দুই-তৃতীয়াংশ শারীরিক দুর্বলতায় ভোগেন। বিভিন্ন ধরনের ব্যথায় ভুগছেন এক-তৃতীয়াংশ। আর লং কোভিডে নারীরা বেশি ভুগছেন। আমাদের দেশে ৩১-৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে লং কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি।

লং কোভিডের চিকিৎসার জন্য এখনো কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। বিভিন্ন দেশে লং কোভিডের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আর পুনর্বাসন চিকিৎসা নিশ্চিত করার সুপারিশও করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে ফিজিশিয়ান, ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ থেরাপিস্ট, সাইকোলজিস্টসহ অনেকে কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বাস্থ্য নির্দেশিকায় লং কোভিডের জন্য ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পানি পান, ইতিবাচক চিন্তা ও পর্যাপ্ত ঘুম ইত্যাদি পরামর্শ মেনে চলতে বলা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলেছে, কোভিড–পরবর্তী শারীরিক সক্ষমতা ও কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ। শারীরিক দুর্বলতা, ব্যথাজনিত উপসর্গ ও শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকলে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের দেশের কোভিডের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কাটানোর চিকিৎসার জন্য কোনো প্রটোকল এখনো তৈরি হয়নি।

ফিজিওথেরাপি ছাড়া আধুনিক চিকিৎসা অসম্পূর্ণ

ব্যথা, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বার্ধক্যজনিত সমস্যা, স্ট্রোক, প্যারালাইসিস, সেরিব্রাল পালসি, অটিজম, মেরুদণ্ডে আঘাত, সড়ক দুর্ঘটনা, ক্যানসার, অবেসিটি, হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিসসহ নানাবিধ অসংক্রামক রোগের কারণে বাংলাদেশে মোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেক বড় একটি অংশ আংশিক বা পুরোপুরি প্রতিবন্ধিতায় ভুগছে। এই ব্যথা ও প্রতিবন্ধিতার প্রধান চিকিৎসাব্যবস্থা ফিজিওথেরাপি। সড়ক দুর্ঘটনা, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, বিকলাঙ্গতা, পক্ষাঘাত এবং বড় কোনো অস্ত্রোপচারের পর রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি ভালো ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগ, বাত-ব্যথা ও পক্ষাঘাতের রোগীরা ওষুধের পাশাপাশি ফিজিওথেরাপি নিয়ে ভালো ফল পান।

ফিজিওথেরাপি কাদের দরকার

সচেতনতার অভাবে রোগীরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না, তাঁদের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রয়োজন। সব বয়সে মানুষের রোগ বা সমস্যায় ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। শরীরের বিভিন্ন সমস্যার জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা দরকার হয়। যেমন মাংসপেশি, জোড় ও হাড়ের সমস্যা। অনেক সময় দেখা যায়, ভেঙে যাওয়া হাড় জোড়া লাগার পর আঘাতপ্রাপ্ত অংশের মাংসপেশি ও হাড়-জোড় ঠিকমতো কাজ করে না। এ ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন পড়ে। হাড়ের রোগ অস্টিওপোরোসিস, মাংসপেশির রোগ সারকোপেনিয়াতে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা বিকল্পহীন।

এ ছাড়া নানা ধরনের বাত যেমন স্পন্ডিলাইটিস, স্পন্ডাইলোসিস, স্পন্ডিলিসথেসিস; অর্থাৎ ঘাড়, কোমর ও মেরুদণ্ডের ব্যথায় এই চিকিৎসা বেশ কাজে দেয়। পাশাপাশি অস্থিসন্ধির বাত, হাঁটুর ব্যথা, ফ্রোজেন শোল্ডার বা কাঁধে ব্যথা এবং পায়ের গোড়ালির সমস্যায় আক্রান্তদের ফিজিওথেরাপি নিতে হয়। এই সমস্যাগুলো যথাযথভাবে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন অর্থোপেডিক কিংবা মাস্কুলোস্কেলিটাল ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ।

শিশুরোগ ও ফিজিওথেরাপি

আমাদের কিছু শিশু জন্মগতভাবে প্যারালাইসিস বা সেরিব্রাল পালসি ও মেরুদণ্ডের সমস্যা নিয়ে জন্মায়। আবার দেখা যায়, অনেক শিশুর হাত, পা বেঁকে যায় কিংবা বিকলাঙ্গতা দেখা দেয়। এসব শিশুর ফিজিওথেরাপি অত্যাবশ্যক এবং তা অবশ্যই পেডিয়াট্রিক/শিশু ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে হওয়া বাঞ্ছনীয়।

স্পোর্টস ইনজুরি

খেলা ও ফিজিওথেরাপি যেন অবিচ্ছেদ্য। একে অন্যের পরিপূরক। খেলাধুলা করলে ইনজুরি হতেই পারে। কিন্তু ইনজুরি থেকে খেলোয়াড়কে খেলার উপযোগী করতে স্পোর্টস ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারেন।

হৃদ্‌রোগ, শল্যচিকিৎসার পর ফিজিওথেরাপি

বুকে কফ জমা, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদেরও ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন পড়ে। হৃদ্‌যন্ত্রে অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে রোগীর অক্সিজেন ধারণক্ষমতা ঠিক রাখতে ফিজিওথেরাপি দিতে হয়। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) রোগীদেরও ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন হয়। কার্ডিও-রেসপিরেটরি কিংবা আইসিইউ ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞরা এই থেরাপি দেন।

অন্যান্য শল্য চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে মাংসপেশি ও অস্থিসন্ধির স্বাভাবিক ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়। তাই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপি ভালো কাজ দেয়। এর জন্য বিশেষজ্ঞ শল্যচিকিৎসার ওপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

পোড়া রোগী

আমাদের দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। পোড়া রোগীর সংখ্যা নেহাত ছোট নয়। পোড়া রোগীর দীর্ঘদিন ধরে মাংসপেশি সংকুচিত হয়ে থাকে। এই অবস্থায় অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণের আশঙ্কায় থাকেন। যদি নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নেওয়া হয়, তাহলে এই ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকা যায়। মাস্কুলোস্কেলিটাল ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞরা এই সেবা দিয়ে থাকেন।

পঙ্গু পুনর্বাসন ও বার্ধক্যজনিত সমস্যা

দুর্ঘটনার কারণে হাত-পা হারানো ব্যক্তির কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজনের প্রয়োজন হয়। এসব মানুষের চলাফেরা স্বাভাবিক করতে ফিজিওথেরাপি একমাত্র পুনর্বাসন পদ্ধতি। অর্থোপেডিক কিংবা মাস্কুলোস্কেলিটাল ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেওয়া বেশি কার্যকর।

বার্ধক্যে শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা হয়। মাংসপেশি ক্ষয় হয়। এ কারণে অনেকে চলাফেরার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এসব মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের ক্ষমতা বজায় রাখতে ফিজিওথেরাপির বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি অবকাঠামো, বাধা

ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে ফিজিওথেরাপি দিবস পালিত হয়। বিশ্ব উন্নয়নের ধারাবাহিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা। ১৯৮০ দশকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ও গবেষণারও অনেক উন্নতি হয়। বর্তমানে বিশ্বমানের সব বিশ্ববিদ্যালয় ফিজিওথেরাপি বিষয়ে পিএইচডি, মাস্টার্স, ব্যাচেলর ডিগ্রি প্রদান করছে।

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি পেশার সঙ্গে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। তা সত্ত্বেও স্বাধীনতার ৫০ বছরে ফিজিওথেরাপি শিক্ষার জন্য একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। কিন্তু জনমানুষের চিকিৎসার অধিকারের স্বার্থে দেশে ফিজিওথেরাপি শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রসার দরকার।

আমাদের দেশে সনদপ্রাপ্ত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের সরকারি চাকরির সুযোগ নেই। ফলে ফিজিওথেরাপি পেশা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব থেকে যাচ্ছে। এই অবস্থা দেশের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইতিমধ্যে কাজের সুযোগ বা অনুশীলনের সুযোগ না পেয়ে অনেকে পেশা পরিবর্তন করেছেন। অনেকে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। কারণ, স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর ফিজিওথেরাপিস্টদের পেশা চর্চার কোনো সনদ দেওয়া হয় না। ২০০৫ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিছু ফিজিওথেরাপিস্টকে সাময়িক সনদ দিতে শুরু করলেও পরে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আইনে বলা হয়েছে, ফিজিওথেরাপিস্ট হতে হলে সরকার স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিওথেরাপি বিষয়ে ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি নিতে হবে।

ফিজিওথেরাপিস্টদের জন্য দুটি সরকারি হাসপাতালে পদ রয়েছে মাত্র ১৯টি। এগুলোর মধ্যে পঙ্গু হাসপাতালে ১৪টি, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ২টি, জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে ১টি, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১টি। যুগের পর যুগ প্রায় সব পদই শূন্য পড়ে আছে। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে সরকার উক্ত শূন্য পদে অস্থায়ী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়। কিন্তু ১১ বছরেও সে নিয়োগ হয়নি। আবার নতুন পদ তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) চেষ্টায় ২০১২ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগ সাড়ে চার শতাধিক পদের প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করে তা আটকে দেয় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন এবং ফিজিক্যাল মেডিসিন সোসাইটি অব বাংলাদেশ।

ফিজিওথেরাপি শিক্ষার জন্য বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিওথেরাপি নামে একটি স্বতন্ত্র কলেজের জন্য মহাখালীতে ৫ দশমিক ২৮ একর জমি দেয় সরকার। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক আ ফ ম রুহুল হক এর ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন। গত ১২ বছরে বাংলাদেশে অনেক উন্নয়ন, অবকাঠামো হয়েছে। কিন্তু এই কলেজটি আর হয়নি। রাষ্ট্রপতির নির্দেশনা, হাইকোর্টের নির্দেশ—সব ফাইল চাপা পড়ে আছে। আর এর ভুক্তভোগী হচ্ছে ব্যথা ও প্রতিবন্ধিতার কোটি রোগী।

ফিজিওথেরাপি শিক্ষা ও সেবায় আমাদের উদাসীনতাকে এবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে লং কোভিড। অন্য সময় না এলেও করোনা–পরবর্তী ব্যথা–যন্ত্রণা নিয়ে ফিজিওথেরাপি কেন্দ্রগুলোতে রোগী বাড়ছে। কিন্তু দেশে আধুনিক ও যুগোপযোগী ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার সুযোগ এখনো সংকুচিত। এখনই এদিকে আমাদের নজর দেওয়া উচিত। তা না হলে একটা বড় জনগোষ্ঠীকে আমরা দীর্ঘ রোগভোগের মধ্যে রেখে তিলে তিলে কষ্ট দেব। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে তাদের অবহেলিত রাখব। অথচ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার মাধ্যমে তাদের সুস্থ ও কর্মক্ষম করে টেকসই উন্নয়ন (এসডিজি) অর্জনে অবদান রাখার সুযোগ আছে।

ডা. দলিলুর রহমান সভাপতি, বাংলাদেশ ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ)

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন