বাংলাদেশের শিল্প খাতে দুর্ঘটনার ধরন শুধু দুর্ঘটনা নয়। এগুলো কাঠামোগত মৃত্যুফাঁদ বা হত্যাকাণ্ড।
জাকির হোসেন, অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

‘রানা প্লাজা-পরবর্তী বাংলাদেশে কারখানা পর্যায়ে দুর্ঘটনা: স্বরূপ, কারণ ও করণীয়’ শীর্ষক ওই গবেষণাটি করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) অধ্যাপক জাকির হোসেন ও গবেষক আফরোজা আকতার। দেশের কারখানায় দুর্ঘটনার ধরন, কারখানার ধরন, শ্রমিকসংখ্যা, কর্মঘণ্টা, দুর্ঘটনা ঘটার কারণসহ নানা উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে এ গবেষণায়। এর উদ্দেশ্য হলো দুর্ঘটনাকালে ও দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে শ্রমিকদের ভোগান্তি এবং শ্রমকাঠামোয় বিদ্যমান অসাম্য ও বিশৃঙ্খলতার চিত্র তুলে ধরা। এখনো গবেষণাটি পুরোপুরি শেষ হয়নি।

জাকির হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের শিল্প খাতে দুর্ঘটনার ধরন শুধু দুর্ঘটনা নয়। এগুলো কাঠামোগত মৃত্যুফাঁদ বা হত্যাকাণ্ড। যে নাজুক ও ভয়ানক পরিবেশে এ দেশে শ্রমিকেরা কাজ করে, সেখানে যে দুর্ঘটনা ঘটবেই, তা যে কেউ বলে দিতে পারে।’

সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির হিসাবে, ২০১৪ থেকে ২০২০ পর্যন্ত শিল্পকারখানায় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজার ১১০ জন। গবেষণায় বলা হয়েছে, নিহত শ্রমিকদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ পুরুষ। ২৪ শতাংশ নারী ও শিশু ৬ শতাংশ।

বেশি দুর্ঘটনা অগ্নিকাণ্ড

গবেষণার তথ্য বলছে, তৈরি পোশাক কারখানার পর বেশি দুর্ঘটনা হয়েছে ইস্পাত, রাইস মিল ও জুতার কারখানায়। এসব দুর্ঘটনার সবচেয়ে বেশি (৪৩ শতাংশ) অগ্নিকাণ্ড। এরপর ১৬ শতাংশ হলো বয়লার দুর্ঘটনা। এরপর আছে রাসায়নিকভর্তি ড্রাম বিস্ফোরণ, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, কমপ্রেসর বিস্ফোরণ, বিষাক্ত গ্যাস, অধিক উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া। দেখা গেছে, মোট দুর্ঘটনার মাত্র ৩ শতাংশ হয়েছে রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল বা ইপিজেডভিত্তিক কারখানায়।

দুর্ঘটনা হওয়া ৪৪ শতাংশ কারখানার অবস্থান জনঘনত্বপূর্ণ এলাকায়। দুর্ঘটনার বেশির ভাগই হয়েছে মার্চ থেকে মে মাসে। গরমকালের সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের সম্পর্ক আছে। এ ছাড়া অত্যধিক কাজের চাপের সঙ্গেও দুর্ঘটনার সম্পর্ক দেখা গেছে বলে গবেষণায় বলা হয়েছে।

ছুটির সঙ্গে দুর্ঘটনার সম্পর্ক

ছুটির দিনের সঙ্গে দুর্ঘটনার সম্পর্ক আছে বলে জানাচ্ছে এ গবেষণা। ২৫ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে ছুটির দিনের সম্পর্ক পেয়েছেন গবেষকেরা। তিনটি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঈদুল ফিতরের ছুটির আগে-পরে।

আট বছরে হওয়া দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ হয়েছে ঢাকায়। এরপর আছে গাজীপুর। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও বগুড়াসহ ১৪টি জেলায় দুর্ঘটনা ঘটেছে।

পেশাগত নিরাপত্তা

গবেষণায় দেখা গেছে, যে ৬১টি কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটেছে, এর মধ্যে ৮টি কারখানা ইমারত নির্মাণ বিধি বা বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি হওয়া। ২৫ শতাংশ কারখানায় নিরাপত্তার নিয়ম মানা হয়নি। ২৩ শতাংশ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব দুর্ঘটনার মাত্র ২৩ শতাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানা যায়। মামলার রায় বা সাজা কার্যকারসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায় না।

দুর্ঘটনা এড়াতে ২০১৩ সালে জাতীয় পেশাগত সেফটি ও স্বাস্থ্য নীতিমালা করা হয়। শ্রম আইনের ৯০ ধারা অনুযায়ী, ৫০ জনের বেশি শ্রমিক আছেন, এমন কারখানায় সেফটি কমিটি গঠন ও তা কার্যকর করার বিধান আছে। বিধি অনুযায়ী, সেফটি কমিটিতে শ্রমিকদের প্রতিনিধি থাকবে। সলিডারিটি সেন্টারের পর্যবেক্ষণ হলো, প্রায় সব শ্রমিকের নিরাপত্তা বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ নেই।

সলিডারিটি সেন্টারের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এ টি এম নাসিম বলেন, যে ১০ শতাংশ কারখানায় সেফটি কমিটি আছে, সেগুলোর বেশির ভাগই কার্যকর নয়। কমিটিতে থাকা শ্রমিক প্রতিনিধিদের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও উপেক্ষিত।

বড় কারখানা ও তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটিতেই সেফটি কমিটি আছে বলে দাবি করেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এস এম মান্নান। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ছোট কারখানায় কমিটি নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে এর দায়িত্ব নিতে হবে।