বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি এই সংস্থার সেবা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী দুই পক্ষ। দুই পক্ষই বলছে, জেলায় জেলায় জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা বা লিগ্যাল এইডের যে অফিসগুলো রয়েছে, সেগুলো সেবা দিতে চেষ্টা করছে। কিন্তু এত বছর বাদেও অনেকে এই সেবা সম্পর্কে জানেন না। কারও কারও মতে, সব আইনজীবী সমান আন্তরিক নন। কেউ কেউ আদালতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথা বলেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, আইনজীবীদের নামমাত্র সম্মানী নিয়েও।

অবশ্য জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার পরিচালক সৈয়দ তাফাজ্জেল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, প্রচার যথেষ্ট। তৃণমূলেও লিগ্যাল এইডের কমিটি আছে। সাধারণ মানুষ যেন আরও সহজে সেবা পান, সে জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর প্রক্রিয়া চলছে। আইনজীবীদের সম্মানী বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনাধীন।

সারা দেশে ৬৪টি জেলা, ঢাকা ও চট্টগ্রামের শ্রমিক আইন সহায়তা সেল এবং সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস থেকে বিচারপ্রার্থীরা সেবা পান। সংস্থার হিসাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে আইনগত সেবা পেয়েছেন ৭৮ হাজার ৮৪৭ জন। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে এখন পর্যন্ত আবেদন জমা পড়েছে ১ হাজার ৪৭২টি, নিষ্পত্তি হয়েছে ৮৪৭টি আবেদনের। এ ছাড়া আইনগত পরামর্শ পেয়েছেন ১৯ হাজার ৯৬০ জন।

এই সহায়তা কতজন চেয়েছিলেন কিংবা বাংলাদেশের কারাগারগুলোয় আইনগত সহায়তা পাওয়ার যোগ্য মানুষের সংখ্যা কত, সে সম্পর্কে অবশ্য কোনো পরিসংখ্যান দিতে পারেনি জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা বা কারা অধিদপ্তর।

দাতা–গ্রহীতার ৩ অভিযোগ

দেশের ৬৪টি জেলার আইনগত সহায়তা প্রদান কার্যালয়ে ৩ হাজার ৩৮৬ জন ও উচ্চ আদালতে বিনা পয়সায় দুস্থদের সহযোগিতা দিতে ৬৩ জনের আইনজীবী প্যানেল কাজ করে। তারপরও এই সেবা সম্পর্কে প্রচার যথেষ্ট নয়। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে রাজশাহী, বরিশাল, গোপালগঞ্জ ও ফেনীর অন্তত ১০ জন আইনজীবী একই কথা বলেছেন।

ঢাকা জেলা আইনগত সহায়তা প্রদান অফিসের কথাই ধরা যাক। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের নিচতলায় একটি আইনগত তথ্য ও সেবা ডেস্ক আছে। ১০ এপ্রিল বেলা দুইটার দিকে ওই ডেস্কে কাউকে পাওয়া যায়নি। পাশেই অস্থায়ী হাজতখানা। সেখানে প্রতিদিন ঢাকার বিভিন্ন থানা থেকে আসামিরা প্রিজন ভ্যানে করে আদালতে আসেন। মূলত পরিবারগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সেখানেই আইনজীবী খুঁজে নেন। জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার অফিস কোথায়, সে খবরই জানেন না অনেকে। সংস্থাটি কোন দিকে, সেটির নির্দেশক কোনো পোস্টার, সাইনবোর্ড বা বিলবোর্ড দেখা যায়নি আদালতপাড়ায়।

ঢাকার বাইরেও একই অবস্থা। বরিশালের মোসাম্মৎ মরিয়ম গত সোমবারই আইনগত সহায়তা প্রদান অফিসে গিয়েছিলেন। মরিয়ম প্রথম আলোকে বলেন, বিয়ের পর নাবালক শিশুকে নিয়ে বাবার বাড়িতে এসেছিলেন। ছেলের বয়স এখন ১৮। আজ পর্যন্ত কোনো খোরপোশ পাননি। প্রতিকার পেতে বরিশালের আইনজীবী বাসুদেব দাসের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনিই জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থায় নিয়ে যান। এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের কথা আগে শোনেননি।

দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ করেছেন আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী দুই পক্ষই। জানা গেছে, কারাবন্দীরা আইনগত সহায়তা চান কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। কারা তত্ত্বাবধায়ক কারাগার পরিদর্শনের সময় বন্দীদের জিজ্ঞেস করেন তাঁদের আইনজীবী আছে কি না। আইনজীবী না থাকলে, আসামিদের নামধাম ও বিস্তারিত তথ্য টুকে নেওয়া হয়। তারপর একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে জেলা আইনগত সহায়তা সংস্থার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। বন্দীর আর্থিক অবস্থাসহ অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় তিনি বিনা মূল্যে আইনগত সেবা পাওয়ার যোগ্য কি না। পুরো প্রক্রিয়ায় কখনো কখনো এক মাস সময়ও লেগে যায়। অনেকেই ধৈর্য ধরতে না পেরে আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে দেন।

ঢাকা জেলা আইনগত সহায়তা প্রদান কার্যালয়ের আইনজীবী কাজী সালাউদ্দীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, লিগ্যাল এইড অফিস থেকে মামলা হাতে পাওয়ার পর দেখা যায়, মক্কেল আইনজীবী নিয়োগ করে ফেলেছেন। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে।

দুস্থদের মামলা এই বিবেচনায় কখনো কখনো যথেষ্ট মনোযোগ না পাওয়ার অভিযোগ আছে। জিল হোসেনের ছেলে নূর মোহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, ৪৪ বছর ধরে তাঁর বাবা ময়মনসিংহ আদালত, এরপর উচ্চ আদালতে ছোটাছুটি করেছেন। ময়মনসিংহের আদালত তাঁকে দুই কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে গিয়েছিল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। হাইকোর্টে মামলা চালাতে গিয়ে তাঁরা জেরবার হন। অবশেষে ২০১৮ সালে তাঁরা সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইডে ক্ষতিপূরণ চান। সময়মতো আইনজীবীও নিয়োগ দিয়েছিল তারা। কিন্তু চার বছরে একবারের জন্যও শুনানি হয়নি। নির্ধারিত তারিখে তাঁদের পক্ষের আইনজীবী হাজির হলেও কোনো কারণে শুনানি হয়নি। মৃত্যুর দুই সপ্তাহ আগেও তাঁকে ঢাকায় গিয়ে মামলার খোঁজ নিতে বলেছিলেন বাবা। সারা জীবনই অধিকার আদায়ে আদালতে আদালতে ঘুরেছেন জিল হোসেন। তবু ফল ভোগ করতে পারলেন না। এখন এই মামলার কী হবে, পরিবার জানে না।

সেবাগ্রহীতারা যেমন যথেষ্ট মনোযোগ না পাওয়ার অভিযোগ করছেন, আইনজীবীদের কেউ কেউ সেবাপ্রার্থীর কাছ থেকে অসহযোগিতার অভিযোগ করেছেন। গোপালগঞ্জের প্যানেল আইনজীবী মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আস্থার সংকট আছে। সরকার বিনা মূল্যে আইনগত সেবা দিচ্ছে, এটা এখনো অনেকে বিশ্বাস করেন না। এই প্যানেলের আইনজীবীদের দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় মনে করেন। প্রায়ই এমন কথা শুনতে হয়, ‘টাকা দিয়েই উকিল পাওয়া যায় না, আবার টাকা ছাড়া।’

সম্মানী নিয়ে প্রশ্ন

জেলা পর্যায় ও হাইকোর্টের আইনজীবীদের অনেকে বলেছেন, তাঁরা তাঁদের দায়বদ্ধতা থেকে বিনা পয়সায় মামলা লড়েন। অনেকে বিলও করেন না। কিন্তু কেউ কেউ আবার বলেছেন, আইনজীবীদের সম্মানী বাড়ানো হলে প্যানেলে আরও যোগ্যতাসম্পন্ন আইনজীবী যুক্ত করা যেত। এ মুহূর্তে শুধু পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই যে কেউ প্যানেলে যুক্ত হতে পারেন। যে ১০ জন আইনজীবীর সঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁদের পাঁচজনই সম্মানী, প্রণোদনা বা পুরস্কারের কথা বলেছেন।

যেমন জামিনের জন্য আইনজীবী পান ৯০০ টাকা। জামিননামা ও স্ট্যাম্পে খরচ হয় ২০০–৩০০ টাকা। বাকি টাকার ওপর সরকার ১৫ শতাংশ ভ্যাট কেটে রাখছে। প্রতিটি সেবাতেই সম্মানীর পরিমাণ অপ্রতুল বলে জানান আইনজীবীরা।

রাজশাহীর আইনজীবী আদিব ইমাম প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার সঙ্গে কাজ করাটা সম্মানের ব্যাপার। কিন্তু সম্মানীটাও ফেলনা নয়। একবার হাজিরায় লিগ্যাল এইডের একজন আইনজীবী ১০০ টাকা পান। এখান থেকে ২০ টাকা খরচ হয় একটা ফরম কিনতে। বাকি টাকা থেকে আবার ১৫ শতাংশ ভ্যাট কেটে রাখা হয়। রাজশাহীতে একবার হাজিরায় সাধারণত আইনজীবীরা ৪০০–৫০০ টাকা নেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থায় নিযুক্ত আইনজীবীদের যে সম্মানী দেওয়া হয়, তা দিয়ে একজন নবীন আইনজীবী কোনোরকমে চলতে পারেন। আইনজীবী হিসেবে যাঁদের পসার আছে, তাঁদের জন্য এটা খুব কম। কিন্তু বাইরের দেশগুলোয় অভিজ্ঞ আইনজীবীদের বছরে নির্দিষ্ট সংখ্যক মামলা বিনামূল্যে লড়তে হয়। সনদ নবায়নের আগে তাঁরা মামলা বিনামূল্যে লড়েছেন কি না দেখা হয়। এ বিষয়ে আমাদের কাজ করার রয়েছে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন