কামরুজ্জামান সোহাগ জানান, তিন মাস আগে মগড়া ইউনিয়নের আয়নাপুর বাজারের দুটি সেলুনে ১০টি করে বই দিয়ে আসেন তিনি। কয়েক দিনের মধ্যেই ভালো সাড়া পান। এর কিছুদিন পর পার্শ্ববর্তী কুইজবাড়ী ও চৌরাকররা বাজারের দুটি সেলুনেও অণু পাঠাগারের কার্যক্রম শুরু করেন। বর্তমানে চারটি বাজারের মোট পাঁচটি সেলুনে বই পড়ার এ কার্যক্রম চলছে।

কুইজবাড়ী বাজারের গোবিন্দ হেয়ার ড্রেসার নামের একটি সেলুনে গিয়ে দেখা যায়, সেলুনের এক কোনায় ১০–১২টি বই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। চুল কাটাতে এসে যারা অপেক্ষমাণ, তাঁরা সবাই বসে বই পড়ছেন। সেলুনের স্বত্বাধিকারী গোবিন্দ চন্দ্র দাস জানান, দুই মাস আগে তাঁর দোকানে বই পড়ার এ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এর পর থেকে তাঁর দোকানে সেবা নিতে আসা লোকজন অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন না। কারণ, তাঁরা বই পড়ে সময় কাটিয়ে দিতে পারেন। চুল কাটাতে আসা মো. সায়েম জানান, চুল কাটাতে এসে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হলেও এখন আর বিরক্ত লাগেনা। অবসর সময়ে এখানে অনেক ছাত্রও বই পড়তে আসেন।

আয়নাপুর বাজারের আরও দুটি সেলুনে একই দৃশ্য চোখে পড়ে। শান্ত হেয়ার ড্রেসারের মালিক জুয়েল রানা জানান, অণু পাঠাগারের স্বেচ্ছাসেবকেরা প্রতি সপ্তাহে এসে বই অদলবদল করে দিয়ে যান। তাই সেলুনে প্রতি সপ্তাহেই নতুন নতুন বই পাওয়া যায়।

সেলুনে রাখা বইগুলো কেউ চাইলে বাড়িতেও নিয়ে যেতে পারেন। ওই বাজারের ওষুধের দোকানি আবদুল আজিজ বলেন, ‘হাতের কাছে বই পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় খুব সুবিধা হয়েছে। দোকানে যখন কাস্টমারদের চাপ থাকে না, তখন বই পড়ি।’

মালঞ্চ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন জানান, বাতিঘর পাঠাগারের এই উদ্যোগ দারুণ। সেলুনে গিয়েও মানুষ হাতের কাছে বই পাচ্ছেন। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ বই পড়ার প্রতি উৎসাহিত হবেন।

কামরুজ্জামান সোহাগের নিজ বাড়িতে গড়ে তোলা বাতিঘর আদর্শ পাঠাগারের কলেবরও এখন বেড়েছে। পাঠাগারের সদস্য আর বইয়ের সংখ্যা—দুটোই হাজার ছাড়িয়েছে।

টিনের চৌচালা একটি ঘরজুড়ে এখন পাঠাগার। ঘরের ভেতর কয়েকটি তাকে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বই। গল্প, উপন্যাস, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস থেকে শুরু করে চাকুরির প্রস্তুতিমূলক বই—সবই আছে সেখানে। প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে। এ সময়ের মধ্যেই চলে বই দেওয়া–নেওয়া।

পড়াশোনার পর্ব শেষ করে কামরুজ্জামান এখন পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই)। চাকরির পাশাপাশি এলাকার সমমনা তরুণদের নিয়ে বই পড়ার এ কার্যক্রম দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। কামরুজ্জামান জানান, সেলুনে চুল–দাড়ি কাটাতে এসে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়। এ সময় মানুষ গল্পগুজব করে অলস সময় পার করে দেন। তখনই সেলুনে বই রাখার ভাবনা মাথায় আসে।

শিগগিরই আশপাশের সব বাজারের সেলুনে বইয়ের আলো ছড়ানোর কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনার কথা জানালেন কামরুজ্জামান। তাঁর মতে, এত দিন বাতিঘর আদর্শ পাঠাগারের মাধ্যমে শুধু তাঁর গ্রামের বাসিন্দারাই বই পড়ার সুযোগ পেতেন। তবে এখন সেলুনে অণু পাঠাগারের মাধ্যমে আশপাশের সব গ্রামেই বইয়ের আলো ছড়িয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন এ তরুণ।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন