২১ এপ্রিল দিনাজপুর রেলস্টেশনের ফটকে ভাড়ার জন্য অপেক্ষমাণ ওয়াকিলের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ওয়াকিল বলেছিলেন, ‘দশ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেইসে তোমহার চাচিক একখান শাড়ি কিনি দিবার পারো নাই। প্রতিবারই নিয়ত করোছি, কিন্তু নিয়ত তো পুরা হচে নাই।’ এর পরদিন প্রথম আলো অনলাইন সংস্করণে ‘দশ বছর হলো স্ত্রীকে একটা শাড়ি কিনে দিতে পারিনি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তার পর থেকে অনেকেই খোঁজ নিয়েছেন ওয়াকিলের। ওয়াকিল বলেন, এবার তাঁর নিয়ত পূরণ হয়েছে। তাঁর কিনে দেওয়া শাড়ির পাশাপাশি গত কয়েক দিনে ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা আবদুল কাইয়ুম, রাকিবুল ইসলামসহ আরও কয়েকজনের কাছে শাড়ি ও খাদ্যসামগ্রী উপহার পেয়েছেন তাঁর স্ত্রী নাসিমা বেগম। পেয়েছেন নগদ অর্থসহায়তাও।

গতকাল শুক্রবার বাড়ির সামনে রিকশা মোছার কাজ করছিলেন ওয়াকিল। বন্ধের দিন দেখে রিকশা নিয়ে বের হতে দেরি। অন্যদিন সকালের আলো ফুটতেই রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। ‘চাচা, কী খবর? ফোন বন্ধ কেন?’ জিজ্ঞেস করতেই বারান্দা থেকে উত্তর দেয় তাঁর স্ত্রী নাসিমা। তিনি বলেন, সাংবাদিক খবর লেখার পরে কে কে যেন ফোন করছিল। ফোন করে বলছে ধরে নিয়ে যাবে। তখন থেকে মুঠোফোন দুই দিন বন্ধ করে রেখেছেন ওয়াকিল। পরে পাড়ার একজন এসে বললেন, কোনো সমস্যা নেই। মানুষ সহযোগিতা করার জন্য ফোন করছেন। এরপর মুঠোফোন সচল করেছেন ওয়াকিল।

ওয়াকিল বলেন, ‘মঙ্গলবার একজন ফোন করে নাম জানতে চাইল। পরে বলল, আপনার ফোনে কি বিকাশ নাম্বার আছে? শুনে ভয় পাইলাম। পরে ছেলের সঙ্গে কথা বলে বিকাশ নাম্বার খুললাম। ওই দিনই ঢাকার এক আপা ২ হাজার টাকা পাঠাইল।’

২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাঁধের পাড়ে বসবাস করছেন ওয়াকিল-নাসিমা দম্পতির। আগে শহরের গোলকুঠি এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। রিকশায় চালিয়ে ভালোই আয় হতো ওয়াকিলের। স্ত্রী নাসিমাও ইটভাঙার কাজ করে সংসারে বাড়তি আয় করেন।

একটা সময় দিনে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা আয় করতেন নাসিমাও। বয়স হয়েছে, এখন ৮০ থেকে ৯৫ টাকার ইট ভাঙতে পারেন। অন্যদিকে, ইজিবাইক আসার পরে আয়রোজগার কমেছে ওয়াকিলের। নাসিমা বলেন, ‘একটা সময় যা আয় ছিল, তা দিয়ে ভালোই চলতাম। কাপড়ও কেনা হতো। এখন দুজনেরই বয়স হয়েছে। আগের মতন কাজ করতে পারি না। দুজনে মিলে যা আয় হয়, তা দিয়ে চলছি। নিজেদের জন্য নতুন কাপড় নিতে পারিনি, তাতে কী? কষ্ট করে হলেও নাতি-নাতনিদের দিয়েছি।’

দিনাজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মর্তুজা আল মুঈদ প্রথম আলোকে বলেন, ওয়াকিলের বিষয়টি তাঁদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। পৌর এলাকায় এখনো আশ্রয়ণের ঘর নির্মিত হয়নি। ওয়াকিলের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে পারিবারিক অবস্থা যাচাই-বাছাই করে শহরের কাছাকাছি কোনো ইউনিয়নে আশ্রয়ণ প্রকল্পে তাঁকে ঘর বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন