স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণের ফল কী, কেউ জানে না

বিজ্ঞাপন
default-image

স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার একমাত্র প্রতিষ্ঠান জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউট (এনআইএলজি)। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যে জ্ঞান জনপ্রতিনিধিরা অর্জন করেন, তা মাঠপর্যায়ে কতটা ব্যবহার করতে পারেন কিংবা এই প্রশিক্ষণের ফলে জনগণের কী উপকার হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো মূল্যায়ন নেই সরকারি এ সংস্থার। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গবেষণা করার দায়িত্বও তাদের। কিন্তু গবেষণায় নেতিবাচক কোনো কিছু খুঁজে পান না এনআইএলজির গবেষকেরা।

ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ও সদস্যদের জন্য তিন দিনের প্রশাসনিক পরিচিতিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা এনআইএলজির। এই প্রশিক্ষণে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম এবং চেয়ারম্যান ও সদস্যদের দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালে দেশের ইউনিয়নগুলোর নির্বাচন হয়। ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছর, অথচ প্রায় ২৪ হাজার জনপ্রতিনিধির প্রশিক্ষণ এখনো হয়নি। আর যাঁরা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন তাঁরা বলছেন, তিন দিনের প্রশিক্ষণে ভাসা ভাসা ধারণা দেওয়া হয়, যা পরে খুব একটা কাজে লাগে না।

জনপ্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দিতে ১৯৬৯ সালের ১ জুলাই ‘লোকাল গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয় ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব লোকাল গভর্নমেন্ট’। ১৯৯২ সালে সরকার জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউট আইন করে। এই আইনের অধীনে এনআইএলজি পরিচালিত হচ্ছে। আইন অনুযায়ী, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্থানীয় সরকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেবে এনআইএলজি। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার বিষয়ে সরকারকেও পরামর্শ দেবে সংস্থাটি। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার–সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা ও বিষয়ের ওপর গবেষণা করবে। চলতি বছরে সংস্থার বাজেট ১৭ কোটি টাকা।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এনআইএলজির প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গতানুগতিক। দিতে হবে তাই দিলাম, নিতে হবে তাই নিলাম ধরনের। সরকারের পয়সা খরচ হচ্ছে, কিন্তু এসব প্রশিক্ষণ কী কাজে লাগছে, তা জানা নেই। এই প্রশিক্ষণ কতটা কার্যকর, যাঁরা প্রশিক্ষক তাঁদের যোগ্যতা কী, যে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, সেই বিষয়ে প্রশিক্ষক কতটা জানেন, এসব বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ভালো সম্মানী দেওয়া হয়, তাই প্রশিক্ষণ একটা আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

প্রশিক্ষণের মূল্যায়ন নেই

গত বছরের ২৪ মার্চ এনআইএলজির কার্যালয়ে সংস্থার পরিচালনা বোর্ডের ৫১তম সভায় এনআইএলজির প্রশিক্ষণ ফলপ্রসূ হচ্ছে কি না, তা মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত হয়। এর আট মাস পর গত ১০ ডিসেম্বর পরিচালনা বোর্ডের ৫২তম সভায় এনআইএলজির মহাপরিচালক ও পরিচালনা বোর্ডের সদস্যসচিব তপন কুমার কর্মকার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ফলাফল যাচাইয়ে অগ্রগতি কী, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য উপস্থাপন করতে পারেননি।

এনআইএলজির প্রশিক্ষণ বাস্তবে কতটা কাজে লাগছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামও। গত ১০ ডিসেম্বর পরিচালনা বোর্ডের ৫২তম সভায় সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী হয়েও এনআইএলজির প্রশিক্ষণের ফলাফল কী, তা জানি না। প্রশিক্ষণ আদৌ কোনো কাজে আসছে কি না, তা দেখতে হবে। কাজে না লাগলে টাকা খরচ করে কেন এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’

এনআইএলজি সূত্র জানায়, ৫২তম বোর্ড সভার পরে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে এনআইএলজির প্রশিক্ষণের মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। এ বিষয়ে কথা বলতে এনআইএলজির পরিচালক (গবেষণা ও পরিকল্পনা) আবদুল মালেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

এনআইএলজি থেকে প্রশাসনিক পরিচিতিমূলক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, এমন পাঁচজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ার‍ম্যানের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা বলছেন, প্রশিক্ষণে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যাবলি, পরিচালনা ম্যানুয়েল, আইন, বিচার–সালিস সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। সময় কম হওয়ায় বিষয়ের গভীরে না গিয়ে, কাজ চালানোর মতো ভাসা ভাসা ধারণা দেওয়া হয়।

 জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহমুদুল আলম ২০১৮ সালে তিন দিনের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘শেখার তো শেষ নাই। তিন দিনের প্রশিক্ষণে কম সময় থাকে। একটা ইউনিয়ন চালাতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। সব প্রশিক্ষণে শেখানো হয় না।’

আবার যশোরের ঝিকরগাছার পানিসারা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রশিক্ষণ পাওয়ায় ইউনিয়নের কাজ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। তবে তিনি মনে করেন, প্রশিক্ষণের সময় তিন দিনের থেকে বাড়িয়ে পাঁচ দিন বা সাত দিন করা উচিত।

প্রশিক্ষক কারা

এনআইএলজির মোট কর্মকর্তা-কর্মচারী ১১৩ জন। এর মধ্যে প্রশিক্ষক ৩০ জন (সংস্থার মহাপরিচালক থেকে গবেষণা কর্মকর্তা পর্যন্ত। তাঁরা প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদার কর্মকর্তা। এর মধ্যে মহাপরিচালক, পরিচালক ও যুগ্ম পরিচালকের ৯টি পদে সরকার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়। বাকি পদে এনআইএলজির নিয়োগ করা কর্মকর্তা)। প্রশিক্ষক হিসেবে বেতনের বাইরেও তাঁরা সম্মানী পান। প্রতি ঘণ্টার জন্য সর্বনিম্ন সম্মানী পদ অনুযায়ী ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত এনআইএলজির কার্যালয়েই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ জন্য সাতটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। এতে একসঙ্গে ২০০ জনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। যদিও এনআইএলজিতে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১০০ জনের আবাসন সুবিধা রয়েছে।

মেয়াদ শেষ হয়ে এলেও প্রশিক্ষণ হয়নি

বর্তমানে দেশে ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ৪ হাজার ৫৫৪টি। প্রতিটি ইউনিয়নে ১ জন চেয়ারম্যান, ৯ জন সাধারণ সদস্য ও ৩ জন সংরক্ষিত নারী সদস্য নিয়ে মোট ১৩ জনের পরিষদ। সে হিসাবে দেশে চেয়ারম্যান ও সদস্য রয়েছেন ৫৯ হাজার ২০২ জন। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আগামী বছর আবার ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এনআইএলজি সূত্রে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদগুলোর বর্তমান পরিষদ নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩৫ হাজারের বেশি চেয়ারম্যান ও সদস্যকে তিন দিনের প্রশাসনিক পরিচিতিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ বাকি রয়েছে প্রায় ২৪ হাজার জনের। অথচ এই প্রশিক্ষণ চেয়ারম্যান ও সদস্যরা দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দেওয়ার কথা।

২০১৬ সালে দায়িত্ব নিলেও এখনো প্রশিক্ষণ পাননি, এমন চারজন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও সদস্যের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ছালিয়াকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু মুসা সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনো এমন কোনো প্রশিক্ষণ পাইনি। প্রশিক্ষণ পেলে হয়তো ইউনিয়নের কাজকর্ম চালাতে সুবিধা হতো।’

গবেষণায় নেতিবাচক কিছু উঠে আসে না

২০১৬-১৭ অর্থবছরে এনআইএলজি পৌরসভার বিচারব্যবস্থা, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের সক্ষমতা বাড়ানোসহ মোট ১০টি বিষয়ে গবেষণা করে। এর মধ্যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গবেষণায় ‘নিবিড় প্রশিক্ষণের সুপারিশ’ করেছে। পৌরসভার বিচারব্যবস্থা নিয়ে করা গবেষণায় পৌরসভা বিরোধ মীমাংসা বোর্ডের সদস্যদের আদালত পরিচালনায় ‘নিবিড় প্রশিক্ষণের’ সুপারিশ করেছে।

এনআইএলজির একটি সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যেসব কমিটি রয়েছে, সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে একটি গবেষণা করেন সংস্থার একজন গবেষণা কর্মকর্তা। গবেষণায় ইউনিয়নের সভাগুলো কার্যকর নয়, এমন ফলাফল উঠে আসে। এ গবেষণার পর প্রায় এক বছর তাঁকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে রাখা হয়।

চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে ইউনিয়ন পরিষদের কর আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো, পৌরসভার জবাবদিহি নিশ্চিতে করণীয় ঠিক করাসহ ১০টি বিষয়ে গবেষণার পরিকল্পনা রয়েছে।

এসব গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার বিষয়ে যাঁদের অভিজ্ঞতা নেই, তাঁদের দিয়ে গবেষণা করানো হলে তাতে কোনো সমস্যারই গভীরে যাওয়া সম্ভব নয়। গবেষণার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সমস্যা-সম্ভাবনার বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে সুপারিশ করার কথা থাকলেও এনআইএলজি সেটি করছে না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন