বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২০১৫ সালে একটা স্বাস্থ্যবিষয়ক সেমিনারে উত্তর আমেরিকার কিছু গণ্যমান্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে শুনলাম বাংলাদেশকে নিয়ে অনেক ভালো ভালো কথা। যেমন: বাংলাদেশ সময়ের অনেক আগেই বেশ কিছু বিষয়ে সহস্রাব্দ উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তালিকাভুক্তি, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষায় লিঙ্গসমতা, শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, টিকাদানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ইত্যাদি। সেমিনারের শেষে অনেকেই আমাকে অভিনন্দন জানালেন। গর্বে বুকটা ভরে গেল।

আমরা দেশের ইতিহাস জানব এবং পরবর্তী প্রজন্মকে জানাব; আমাদের পূর্বপ্রজন্ম থেকে ধারণ করব তাঁদের আদর্শকে, সেটা বিজ্ঞান হোক আর রাজনীতিই হোক। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা একসময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের সমসাময়িক ছিলেন, শ্রেষ্ঠ জার্নালে লেখালেখি করতেন। তাঁদের বেশির ভাগকেই আমরা হারিয়েছি একাত্তরে।

২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশে কাজ করছি। বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং সাফল্য প্রতিদিন অনুভবও করছি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে তো আর গর্বের শেষ নেই। এসব দেখেই স্বপ্ন দেখি হীরকজয়ন্তী নিয়ে। আমরা অনেক এগিয়েছি বটে, তবে সামনে দীর্ঘ পথ। মনে রাখতে হবে, আমরা যতই এগোব, ততই কঠিন হবে আমাদের পথ। বাধা আসবে চারদিক থেকে।

হীরকজয়ন্তীতে বছরের প্রথম দিনে শুধু সব শিক্ষার্থীর হাতে বই দেখতে চাই না, সব শিক্ষার্থীর মধ্যে সত্যিকারের মানুষ দেখতে চাই। বিশ্বাস করতে চাই যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শুধু পরীক্ষার জন্য তৈরি করবে না, আদর্শ শেখাবে, ভালো মানুষ হতে শেখাবে। আমরা শুধু বিসিএসের জন্য পড়ব না, কর্মজীবনের অন্য ক্ষেত্রগুলো আবিষ্কার করব, কৌতূহলী হব। পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি, আমরা সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করতে এবং আমাদের সমাজের জন্য নির্দিষ্ট সমস্যাগুলো সমাধান করতে শিখব।

যেহেতু আমি বিজ্ঞান এবং গবেষণা নিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করি, এখানটাতে আরও একটু বিস্তারিত বলার চেষ্টা করি। বাংলাদেশ এখন বাজেটের খুব ছোট একটা অংশ ব্যয় করে গবেষণার জন্য। বেশ কিছু বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে ভালো গবেষণা হয়, কিন্তু তহবিল আসে আমেরিকা-ইউরোপ থেকে। বাংলাদেশি গবেষকদের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক দাতারা গবেষণার বিষয় নির্ধারণ করেন। ঘাটতি থেকে যায় বাংলাদেশের জন্য সত্যিকারের প্রয়োজনীয় গবেষণার এবং সেই গবেষণাগুলো হয় তাঁদের মালিকানায়। আমি স্বপ্ন দেখি যে আমাদের দেশে সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন অংশীদারি (পিপিপি) বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ গবেষণার জন্য আরও সম্পদ বরাদ্দ করা হবে, সেই সঙ্গে সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা মেধা পাচার নিয়ে অনেক চিন্তিত থাকি। কিন্তু আমরা যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি করতে পারি এবং কিছু যুগোপযোগী গবেষণা কেন্দ্র তৈরি করতে পারি, তাহলে হয়তো বা বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা ফিরে আসবে। কিন্তু আমি বোধ করি যে ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন কাজ; বরং আমরা যদি কিছু জায়গা তৈরি করতে পারি যেখানে ভালো উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে, তাহলে ফিরিয়ে আনার চিন্তা করতে হবে না। এটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বেসরকারি গবেষণা কেন্দ্রের অংশীদারত্বের মাধ্যমেও হতে পারে।

এ ছাড়া আমাদের সার্বিকভাবে গবেষণাকে উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশে ল্যাবরেটরি গবেষণা পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধা মধ্যে রয়েছে সরঞ্জামের অভাব। যদিও বা সরঞ্জাম পাওয়া যায়, সেগুলোর ওপর উচ্চ কর এবং কাস্টমস থেকে ছাড়পত্রের দেরি হওয়ার জটিলতা গবেষণার একটি মূল বাধা। গবেষণার সরঞ্জামের কর কোনোভাবেই বাণিজ্যিক সরঞ্জামের ওপর করের মতো হওয়া সঠিক নয়।

আমার চোখে একটি দেশের সব থেকে বড় সম্পদ হচ্ছে মানুষ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। তাই আগামী ১০ বছরে আমি দেখতে চাই শিক্ষিত এবং সুস্থ মানুষের মতো মানুষ। স্বপ্ন দেখি অনেক স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা, যেমনটি চোখে পড়ে কৃষির ক্ষেত্রে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে এই দায়িত্ব আমাদের। আমরা বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে লড়িনি, কিন্তু বাংলা ভাষা পেয়েছি, যুদ্ধ দেখিনি, কিন্তু স্বাধীন মাটিতে বাস করি; সবই কিন্তু পেয়েছি পূর্বপ্রজন্মের মহামান্য এবং মহীয়সীদের থেকে, যাঁদের আমরা হারিয়েছি আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে।

আমরা দেশের ইতিহাস জানব এবং পরবর্তী প্রজন্মকে জানাব; আমাদের পূর্বপ্রজন্ম থেকে ধারণ করব তাঁদের আদর্শকে, সেটা বিজ্ঞান হোক আর রাজনীতিই হোক। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা একসময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের সমসাময়িক ছিলেন, শ্রেষ্ঠ জার্নালে লেখালেখি করতেন। তাঁদের বেশির ভাগকেই আমরা হারিয়েছি একাত্তরে। কিন্তু এই তো সময় আমাদের নতুন প্রজন্মের ঘুরে দাঁড়ানোর! আমি স্বপ্ন দেখি এই পরিবর্তনগুলোর, যেন ২০৩১ সালে আমরা অহংকার করে বলতে পারি, বাংলাদেশ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর দেশ।

*সেঁজুতি সাহা, অণুজীব বিজ্ঞানী ও পরিচালক, চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন