বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ওই নারী স্বামীর বিরুদ্ধে পরে কালীগঞ্জ উপজেলায় কর্মরত একটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) প্রেরণা নারী সংগঠনে অভিযোগ করেন।

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ জানিয়ে কল আসার সংখ্যা এক বছরে আড়াই গুণের বেশি বেড়েছে, যা ১৭৪ শতাংশ বেশি। ২০২১ সালে ৯৯৯-এর ‘স্বামীর দ্বারা সহিংসতা’ বিভাগে কল এসেছে ৩ হাজার ৩৪৮টি। আগের বছর এই বিভাগে কল এসেছিল ১ হাজার ২২৩টি। করোনার আগে ২০১৯ সালে স্বামীর দ্বারা নির্যাতনের অভিযোগে কল এসেছিল ৩৮৮টি। ৯৯৯-এর কল পর্যালোচনা করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

গত বছরের ৯ জুন রাতে নরসিংদীর এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুকের কারণে নির্যাতনের অভিযোগ জানিয়ে কল করেন ৯৯৯-এ। পরে পলাশ থানা থেকে পুলিশ গিয়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

৯৯৯-এ কলের বিষয়ে জানতে গত রোববার (২ জানুয়ারি) নম্বরটিতে এই প্রতিবেদক ফোন দিলে একজন নারী ‘কল টেকার’ কল ধরেন। ওই দিন তিনি নারী নির্যাতন বিষয়ে কতটি কল পেয়েছেন, জানতে চাইলে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে কেন্দ্রীয়ভাবে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর প্রধান ও পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ৯৯৯-এ কল করলে সেবা পাওয়া যায়, সেই আস্থা তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে। এ কারণে কলের সংখ্যা বাড়ছে। সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ এখন ৯৯৯-এ সেবা পাওয়ার কথা জানেন। তিনি জানান, ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর ৯৯৯ যাত্রা শুরু করে। ২০১৮ সালে দিনে যেখানে ৮-১০ হাজার কল আসত, এখন দিনে ৩০-৩৫ হাজার কল আসে।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, পরে কী

সাতক্ষীরার যে নারীর কথা দিয়ে এই প্রতিবেদনের শুরু, সেই নারী প্রথম আলোকে জানান, ৯৯৯-এ কল করার ঘটনাটি গত বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। এরপর ২৮ ডিসেম্বর স্বামী তাঁকে পথে দেখতে পেয়ে হঠাৎ প্রচণ্ড মারধর শুরু করেন। চুল ধরে রাস্তা দিয়ে ছেঁচড়ে টেনে নিয়ে যান। পরে লোকজন এসে ঠেকায়। কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় গলা ধরে আসছিল ওই নারীর। বললেন, মাথা থেকে মুঠো ধরে চুল উঠে গেছে। ৯৯৯-এ কি আর ফোন দিয়েছিলেন? বললেন, ‘না, আর কত ফোন দেব!’

ওই নারী ডিসেম্বর মাসে প্রেরণা নারী সংগঠনে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। সংগঠনটি জানিয়েছে, তাদের কাছে গত নভেম্বর মাসে ২৪ জন এবং ডিসেম্বর মাসে ৩১টি পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ আসে। ওই ৫৫টির মধ্যে ১০টির ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলা হয়েছে। বাকিগুলোর ক্ষেত্রে মামলা হয়নি।

প্রেরণা নারী সংগঠনের জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বিভাগের কেসওয়ার্কার সমাপ্তি রায় প্রথম আলোকে বলেন, যে ৫৫টি অভিযোগ দুই মাসে এসেছিল, সেগুলোর ৯৫ ভাগই ছিল স্বামীর বিরুদ্ধে। সামান্য ঘটনাতেও স্ত্রীকে প্রচণ্ড মারধর করা হয়েছে। সময়মতো রান্না হয়নি, এই অজুহাতে মারধর করা হয়েছে। স্ত্রীর কাছে অর্থসম্পদ চেয়েও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। যাঁরা মামলা করেননি, তাঁরা কী করেছিলেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁরা বলেছিলেন, পরামর্শ নিতে এসেছেন। মামলার ঝামেলায় যেতে চান না।

৯৯৯-এ ফোন করলে সাড়া পাওয়া যায় ঠিক। তবে এর পরবর্তী ব্যবস্থাটা যেন আরও নির্বিঘ্ন হয়, সেটা নিয়েও ভাবা দরকার। ৯৯৯-এ ফোন করলে সংশ্লিষ্ট থানায় যুক্ত না করে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
জিনাত আরা হক, প্রধান নির্বাহী, আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট

গত বছরের ৬ জুলাই ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায় স্বামীর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে এক গৃহবধূ বিষ পান করেন। ওই গৃহবধূর ভাই ৯৯৯-এ ফোন করে সহায়তা চাইলে পুলিশ গৃহবধূকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে।

এরপর কী হয়েছিল, জানতে আলফাডাঙ্গা থানার ওসি মো. ওয়াহিদুজ্জামানের সঙ্গে গতকাল যোগাযোগ করলে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ওই নারী সুস্থ হয়ে স্বামীর বাড়ি ফিরে গেছেন। তিনি থানায় কোনো অভিযোগ করেননি। এ ধরনের ঘটনার আরও অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ৯৯৯-এ কল পেয়ে নির্যাতনের শিকার নারীর বাসায় যাওয়ার একটি ইতিবাচক দিক হলো, ‘পুলিশ এসেছে’—এই ভয়ে অনেক সময় ওই পরিবারটিতে নির্যাতনের ঘটনা আর ঘটে না। কখনো কখনো পুলিশ গেলে তাঁরা সামাজিকভাবে সমস্যা সমাধান করবেন বলে জানান। আবার অনেক সময় যে সমস্যাগুলো থেকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, সেই সমস্যাগুলো জিইয়ে থাকে। ফলে নির্যাতন বন্ধ হয় না।

অন্য সংগঠনের তথ্যেও একই চিত্র

বেসরকারি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, ২০২০ সালের তুলনায় গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর—এই ১১ মাসে পারিবারিক নির্যাতন বেড়েছে ১০ শতাংশ। পারিবারিক নির্যাতন ঘিরে হত্যা, আত্মহত্যাসহ মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে ৭ শতাংশ। ১১ মাসে পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৬০৮টি। এর মধ্যে ৩৫৫টি হত্যার ঘটনায় ২১৩টি স্বামী খুন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পারিবারিক নির্যাতন ঘিরে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৩২টি।

গত বছরের মার্চ মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ত্রী নির্যাতনে বাংলাদেশ চতুর্থ। দেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৫০ শতাংশই জীবনে কখনো না কখনো সঙ্গীর হাতে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

গত বছরের ২৫ নভেম্বর প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ‘চ্যালেঞ্জিং ফিয়ার অব ভায়োলেন্স’ শিরোনামে জরিপ প্রতিবেদনে পারিবারিক বলয়, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আর জনসমাগমস্থলে নারীর প্রতি সহিংসতার তথ্য প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি সহিংসতা হয়রানির ঘটনা ঘটছে পারিবারিক বলয়ে (নিজ পরিবার ও শ্বশুরবাড়ি), প্রায় ৮৭ শতাংশ।

কলের ৪৮ শতাংশই স্বামীর বিরুদ্ধে

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ নারী নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে আসা কলগুলোকে নয়টি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত নারী নির্যাতনের অভিযোগ জানিয়ে মোট কল এসেছে ৭ হাজার ১৫১টি। এর মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে কল এসেছে সবচেয়ে বেশি, ৪৭ শতাংশ। এ ছাড়া ধর্ষণের অভিযোগ ৮২৪টি, ধর্ষণচেষ্টা ৩৯০টি, ধর্ষণের হুমকি ৩৬টি, পাচার ১৯টি, যৌন সহিংসতা ৩৯৭টি, বাড়িতে সহিংসতা ১২৯ এবং বাড়ির বাইরে ৭১টি সহিংসতার অভিযোগে কল আসে। এর বাইরে বিভিন্ন ধরনের নারী নির্যাতনের অভিযোগকে ‘নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিভাগে কল এসেছে ১ হাজার ৯৩৭টি।

২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে আটটি ক্ষেত্রে কল অনেক বেড়েছে। ওই বছর নারী নির্যাতনের মোট কল এসেছিল ৪ হাজার ৯৪টি। করোনার আগে ২০১৯ সালে কল এসেছিল ১ হাজার ৫৬১টি।

৯৯৯-এর ফোকাল পারসন (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) পুলিশ পরিদর্শক আনোয়ার সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করার পর কোনো কোনো নারী জরুরি সহায়তা চান বা কোনো নারীর পক্ষ থেকে অন্য কেউ সহায়তার জন্য কল করেন। সে ক্ষেত্রে ৯৯৯-এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট থানা থেকে পুলিশ যায়। জরুরি সহায়তা চাওয়া নারীদের কেউ কেউ আইনি ব্যবস্থা নিতে চান। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা কল করা পর্যন্তই অভিযোগ জানান, পুলিশ যাওয়ার পর বলেন, ‘পারিবারিকভাবে মিটমাট করা হবে।’ কল করার পর তা পর্যবেক্ষণ করা হয় কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিটি কলের ক্ষেত্রে একটি নোট রাখা হয় যে সেটি থানায় অবহিত করা হয়েছে এবং থানা থেকে সেই কলের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আর অভিযোগ দায়ের হলে সেটা আইন অনুযায়ী পুলিশের পর্যবেক্ষণে থাকে।

রাজধানীর বাসিন্দা এক নারীর কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তিনি শ্বশুরবাড়িতে মারধরের শিকার হয়ে ৯৯৯-এ ফোন করেন। সেখান থেকে তাঁকে সংশ্লিষ্ট থানায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরদিন তিনি থানায় গেলে সরকারি হাসপাতাল থেকে আঘাত পাওয়ার বিষয়ে সনদ নিয়ে আসতে বলা হয়। সেই নারী পরে আর হাসপাতালে যাননি, ফলে আইনি কোনো ব্যবস্থা নেওয়ারও সুযোগ পাননি।

এ প্রসঙ্গে আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের (উই ক্যান) প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক প্রথম আলোকে বলেন, ৯৯৯-এ ফোন করলে সাড়া পাওয়া যায় ঠিক। তবে এর পরবর্তী ব্যবস্থাটা যেন আরও নির্বিঘ্ন হয়, সেটা নিয়েও ভাবা দরকার। ৯৯৯-এ ফোন করলে সংশ্লিষ্ট থানায় যুক্ত না করে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নির্যাতনবিষয়ক কলের ক্ষেত্রে আলাদা দক্ষ ও সংবেদনশীল জনশক্তি দরকার, যাঁরা শুধু এ-সংক্রান্ত কল পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেবেন।

জিনাত আরা হক বলেন, করোনাকালে তহবিলের অভাবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর সচেতনতামূলক কার্যক্রম কমে যাওয়ায় পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা অনেক বেড়েছে। এ ছাড়া সমাজে নারীদের প্রতি পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও সেভাবে হয়নি। বরং নারীর প্রতি নেতিবাচক উগ্র মনোভাব পোষণ করে, এমন শক্তিগুলোর উত্থান বেশি হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন