স্মৃতিময় স্কুলে স্মৃতি রোমন্থন

শৈশবে পরিবারের গণ্ডির বাইরের প্রথম জগৎ বিদ্যালয়৷ বন্ধু, সহপাঠী, অগ্রজ, অনুজ, শিক্ষক, বিদ্যালয়ের আঙিনা ঘিরে থাকে কত মধুর স্মৃতি৷ সেই স্মৃতি গতকাল শুক্রবার রোমন্থন করলেন পুরান ঢাকার পোগোজ স্কুলে জড়ো হওয়া হাজারো প্রাক্তন শিক্ষার্থী৷ হারিয়ে গেলেন সেই সব দিনে৷ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এই মানুষদের পদচারণে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছিল প্রবীণ-নবীনের মিলনমেলা৷
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে অবস্থিত বিদ্যালয়টির প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীর পুনর্মিলনীতে হয়েছিল এই মিলনমেলা৷ এই প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানেন না, ১৮৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ঢাকায় বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রথম বিদ্যালয়। মোহিনী মোহন দাসের দান করা একটি ভবনে আর্মেনিয়ান শিক্ষানুরাগী নিকোলাস পিটার পোগোজ গড়ে তুলেছিলেন এই বিদ্যালয়।
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে জানা গেল, সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্বে নাম উজ্জ্বল করা অনেক মুখ ছিলেন এই বিদ্যালয়ের ছাত্র৷ মঞ্চে উঠে বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক জুলফিকার আলী চৌধুরী তাঁদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করলেন৷ যাঁদের মধ্যে আছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক অর্থমন্ত্রী নলিনী রঞ্জন সরকার, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, ডক্টরেট ডিগ্রি পাওয়া প্রথম বাঙালি নিশীকান্ত চ্যাটার্জি, ভারতীয় প্রথম ডক্টর অব সায়েন্স অঘোর নাথ চ্যাটার্জি, পবিত্র কোরআন শিরফের প্রথম বাংলা অনুবাদকারী গিরীশ চন্দ্র সেন, লেখক সোমেন চন্দ, মহাকবি কায়কোবাদ, কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি শামসুর রাহমান৷
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানকে অন্য মাত্রা দিয়েছে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নিকোলাস পিটার পোগোজের নাতি পিটার ডি পোগোজের উপস্থিতি। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড শহরের পাশের গ্রাম কোপর থেকে এসেছেন তিনি। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বললেন, তাঁদের পরিবার সব সময় শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়। তাঁর স্ত্রীও একজন শিক্ষক।
এর আগে সকাল নয়টায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও বেলুন ওড়ানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান৷ বর্তমান শিক্ষার্থীরা প্রাক্তনদের বরণ করে নিতে ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে মিলনমেলাস্থলে রূপ দেওয়ার সব আয়োজনই করে।
মঞ্চে উঠে প্রাক্তন শিক্ষার্থী রফিকুন নবী স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে যেন চলে গেলেন এক অন্য জগতে৷ বলেন, ‘স্কুলে প্রবেশের সময় মনে হচ্ছিল যেন আমি টাইম মেশিনের ভেতর দিয়ে শৈশবে চলে গেছি। স্কুলের গেটে প্রধান শিক্ষক মনীন্দ্র চন্দ্র স্যার দাঁড়িয়ে গুনছেন, কারা আসল আর কে আসল না।’
চলচ্চিত্র অভিনেতা প্রবীর মিত্র মঞ্চে উঠে তাঁর অভিনয়জীবনের বাইরে নতুন পরিচয় তুলে ধরেন। তিনি ফুটবল, ক্রিকেট ও ব্যাডমিন্টন—সব দলের অধিনায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখতে গিয়ে প্রায়ই বিদ্যালয়ের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার গল্প বলার সময় অন্য প্রাক্তনরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন।
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ ও পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি গোলাম দস্তগীর গাজী বললেন, ‘প্রবীর মিত্র পরীক্ষায় ফেল করত আর আমরা খুশি হতাম। কারণ, আমাদের স্কুলের ফুটবল দলের শক্তি বাড়ত। এই অনুষ্ঠানে এসেছি আড্ডা দিতে, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে। মুড়ি-চানাচুর খেতে।’
গোলাম দস্তগীর গাজীর সঙ্গে স্কুল সূত্রে সুসম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব বরকতউল্লা বুলু বলেন, ‘এই স্কুলের মাঠে কত খেলেছি। জীবন যেখানে শুরু হয়, সেখানে বারে বারে আসতে হয়।’
জনতা ব্যাংকের সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) ও পোগোজ স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় সারা দেশে ১৪তম স্থান অধিকারী আকরাম হোসেন খান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক শহিদুল ইসলাম চৌধুরীসহ আরও অনেকে স্কুলজীবনের স্মৃতিচারণা করেন। এটিএন বাংলার প্রধান প্রতিবেদক মানস ঘোষের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন স্কুলের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান, অনুষ্ঠানটির আহ্বায়ক উৎপল কুমার ঘোষ।