হজের সময় কোরবানির যত আয়োজন

প বি ত্র হ জ
প বি ত্র হ জ

আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের পর হজের অংশ হিসেবে জামারায় (শয়তানকে পাথর মারার স্থান) পাথর মেরে হাজিদের পশু কোরবানির প্রস্তুতি নিতে হয়। ১০ জিলহজ হজ শেষ হওয়ার পর থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত পশু কোরবানি দেওয়া যায়।
হাজিদের একটি অংশ নিজে মুস্তাহালাকায় (পশুর হাট ও জবাই করার স্থান) গিয়ে কোরবানি দেন। একটি অংশ ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকে (আইডিবি) ৪৯০ রিয়াল জমা দিয়ে তাদের মাধ্যমে কোরবানি দেন। বাংলাদেশের হাজিদের একটি অংশ প্রবাসী, বিশেষ করে নিজ জেলার কোনো প্রবাসীকে পেলে তাঁদের মাধ্যমে কোরবানি দেন। এই প্রবাসীরা মূলত হজ উপলক্ষে পশু ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। অন্য কাউকে দিয়ে কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু প্রতারণার ঘটনাও ঘটে বলে এখানে আলোচনা আছে। হজে কোরবানির পশুর মধ্যে ছাগল, দুম্বা, উট অন্যতম। বাংলাদেশিরা উট কোরবানি খুব কমই দিয়ে থাকেন। এবার বাংলাদেশ থেকে ৮৮ হাজার হজযাত্রী হজ পালন করতে এসেছেন। তাঁরা সবাই আলাদাভাবে একটি করে পশু কোরবানি দেবেন। আর সারা বিশ্ব থেকে এবার প্রায় ২০ লাখ লোক পবিত্র হজ পালন করতে এসেছেন। তাই ধরে নেওয়া হয়, মক্কায় এবার শুধু হাজিরাই ২০ লাখ পশু কোরবানি করবেন।

পশু বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৭ জিলহজের পর থেকেই পশু কেনা শুরু হয়। আইডিবির তত্ত্বাবধানে সবচেয়ে বেশি কোরবানি হয় মক্কায়। আমি গতকালই আইডিবির মাধ্যমে কোরবানির জন্য আল-রাজি ব্যাংকের বুথে গিয়ে ৪৯০ রিয়াল জমা দিয়েছি। আমার নামে তারা পশু কোরবানি দেবে। এর মধ্যে ৪৪৮ রিয়াল পশুর দাম বাবদ এবং বাকি টাকা কসাইখানার খরচ, হিমাগারে মাংস সংরক্ষণ ও পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশের গরিব লোকজনের মধ্যে এই মাংস বিতরণের খরচ বাবদ নেওয়া হয়। প্রতিবছর বাংলাদেশেও এ মাংস ‘দুম্বার মাংস’ নামে যায় এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিলি হয়।

ব্যাংকের বুথ ছাড়াও পোস্ট অফিস বা মসজিদুল হারামের পাশে ছোট ছোট টংঘরে আইডিবির বুথ রয়েছে, যেখানে অর্থ জমা দিলে তারা কোরবানির ব্যবস্থা নেয়। এ প্রক্রিয়ায় কোরবানি দিতে চাইলে তারা আপনাকে একটি কুপন দেবে। সেই কুপন দেখিয়ে হাজিরা তাঁদের নামে দেওয়া কোরবানির মাংস চাইলে দেখতে পারবেন। মক্কায় খাওয়ার জন্য চাইলে ওই কুপন দেখিয়ে ব্যাংকের হিমাগার থেকে কিছু মাংস আনাও যায়।

ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতবার হজের সময় আইডিবির মাধ্যমে ১০ লাখ হাজি পশু কোরবানি দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির এ পরিমাণ পশুর মাংস রাখার হিমাগার আছে। হজের পরে ১৯টি মুসলিম দেশে এসব মাংস বিতরণের জন্য পাঠানো হয়েছিল।

আবার অনেক হাজি যেসব এজেন্সির তত্ত্বাবধানে যান, তাদের মাধ্যমেই কোরবানি দিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে এজেন্সিগুলো তাদের ভাড়া নেওয়া বাড়িতে থাকা হাজিদের বিভিন্ন বেলার খাবারের সময় এ মাংস পরিবেশন করতে পারে।

আবার প্রবাসী বাংলাদেশিরাও হাজিদের কোরবানির ব্যবস্থা করে দেন। বাংলাদেশের হজযাত্রীদের একটা অংশ, বিশেষত বয়স্ক ব্যক্তিরা কোরবানির এ ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হন বলে অভিযোগ আছে। কোরবানিতে সহায়তার নামে এঁরা বয়স্ক হাজিদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে কোনো কোনো কোরবানি না দিয়ে তা মেরে দেন। কেউ কেউ বেশ কয়েকজন হাজির কাছ থেকে অর্থ নিলেও দু-তিনটি পশু কোরবানি দেন।

তবে এ প্রতারণার সংখ্যা কত, তার কোনো সঠিক হিসাব কারও কাছে নেই। মক্কায় পশু ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন বাংলাদেশি জানান, মক্কায় প্রায় প্রতি বাড়িতে কমপক্ষে ১০০ জনের মতো হাজি থাকেন। কিছু বাংলাদেশি প্রথমে তাঁদের নিজ জেলা থেকে আসা বয়স্ক হাজিদের খুঁজে বের করে তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান। একপর্যায়ে তাঁকে দায়িত্ব দিলে কম খরচে (৩৫০ রিয়াল বা ৩০০ রিয়াল) সহজে কোরবানি করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং মিনা থেকে ফিরে এলে সেই মাংস খাওয়ানোরও প্রতিশ্রুতি দেন। ব্যাংক বা এজেন্সির মাধ্যমে কোরবানি দিলে তা সম্ভব না বলে হাজিদের বোঝানো হয়। এতে সহজ-সরল বয়স্ক হাজিরা ‘নিজ এলাকার লোকদের’ বিশ্বাস করে কোরবানির দায়িত্ব দেন। কিন্তু প্রতারিত হওয়ার তথ্য তাঁদের অজানাই থেকে যায়।

মক্কায় পশু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ইসমাইল বাবুল জানান, হাজিরা মক্কা, আরাফাতের ময়দান ও পাঁচ কিলোমিটার দূরের মিনাসহ বিভিন্ন স্থানে হজ-সংশ্লিষ্ট কাজ সারতে ব্যস্ত থাকেন। তাঁরা কোরবানির খবর নিতে পারেন না। তাঁদের কাছ থেকে কোরবানির জন্য অর্থ নেওয়া ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা দু-তিনটি ছাগল কোরবানির দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করে এনে তাঁদের দেখান, যাতে তাঁরা সন্দেহ করতে না পারেন। আবার হাজিদের কেউ কেউ সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কোরবানি করার জায়গায় গিয়ে হাজির হলে তাঁদের সামনে দু-একটি ছাগল জবাই করা হয়।