৬ মে বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুরা ইউনিয়নের কাদিপুর এলাকায় ঢুকতেই পাওয়া গেল পাকা ধানের ঘ্রাণ। ঘ্রাণ মিলেছে শুকনো ও ভেজা খড়ের। কাদিপুর পার হলেই রাজনগরের ফতেহপুর ইউনিয়নের অন্তেহরি গ্রামটি। হাওরপারের দুটি গ্রামেই চলছে পাকা ধান ঘরে তোলার আয়োজন। পথে পথে শুকানোর জন্য মেলে দেওয়া হয়েছে ধান ও খড়। কাটা ধানের আঁটি কাঁধে করে কেউ বাড়ি ফিরছেন। কেউ ফিরছেন খলায়। কোথাও যন্ত্রে চলছে ধানমাড়াই। নারী-পুরুষ মিলে খলায় চলছে ধানের চিটা ঝাড়া, ধান শুকানো, ধান গোছানোর কাজ। চলছে বিশাল হাঁড়িতে ধান সেদ্ধ। বিভিন্ন দিকে ছোট–বড় খলায় উৎসবের ব্যস্ততা। বছরে এই একটি ফসলই তাঁদের। এই ধানেই সারা বছরের খোরাকি, আশয়-বিষয়। ঝড়-বন্যার ভয় ছিল। তা কেটে গেছে। ধান তুলতে শ্বাস ফেলার অবসর মিলছে না কারোরই।

default-image

কাদিরপুর গ্রামের ইরেশ সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বোরো খেতের সম্পর্ক পানির লগে। মেঘ (বৃষ্টি) দিলে ধান ভালা। এবার খরায় ধান বাফাউটা অই গেছে (স্বাভাবিক বিকাশ হয়নি)। খরায় মারি লাইছে। সময়মতো পানি পাইছে না। এক গোছা লম্বা অইছে (হয়েছে), এক গোছা বাট্টি (খাটো)। যেন (যেখানে) কিয়ারও (বিঘায়) ১৫ মণ পাওয়ার কথা। ওখানো মিলের ১০ মণের কম।’

ইরেশ সরকার জানালেন, প্রায় সাত কিয়ার জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। কিছু নিজের, কিছু বর্গা। জমির ধরন অনুযায়ী বর্গা জমির প্রতি বিঘাতে মালিককে দিতে হয় শুকানো আড়াই মণ থেকে পাঁচ মণ ধান। এই জমি আবাদ করতে ঋণ করেছেন ২৫ হাজার টাকা। ধান কম হওয়ায় এই ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

একই গ্রামের শিবু সরকার বলেন, ‘ধান দেখতে ভালা। কিন্তু চিটা বেশি। দেড় কিয়ারে আমি ৬ মণ ধান পাইছি। অন্তত ২৫ মণ পাওয়ার কথা।’ এ ক্ষেত্রে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাঁরা ব্রি-২৮ জাতের ধান চাষ করেছেন। ২৮ জাতের ধান অনেকে কাটছেনই না। খেতে গরু ছেড়ে খাওয়াচ্ছেন। ব্রি-২৯ জাতেও কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের ধানও পানিসংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রিপন বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা মেঘর (বৃষ্টি) আশায় ধান ফলাই। সময়মতো মেঘ নাই। দুই কিয়ারে ১৬–১৭ মণ ধান পাইছি।’

সুমতি বৈদ্য বলেন, ‘ধান পাইছি মোটামুটি। মেঘ দিল না আগে। কিয়ারও ৮ থেকে ১০ মণ মিলছে।’

স্থানীয় কৃষকেরা জানিয়েছেন, একজন কৃষিশ্রমিকের রোজ হচ্ছে কম করেও ৫০০ টাকা। এক কিয়ার জমির পাকা ধান কাটতে গুনতে হয় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। এরপর আছে ধান মাড়াই। এক কিয়ার জমিতে প্রায় পাঁচ হাজার টাকার মতো খরচ। তবে হাওরের সব স্থানেই একই অবস্থা না। যেদিকে পানির ব্যবস্থা ছিল, সেদিকে ধান ভালো হয়েছে। তা ছাড়া শেষের দিকে বৃষ্টি হয়েছে। সে বৃষ্টিও ধানের উপকারে লেগেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজার জানিয়েছে, এ বছর জেলায় ৫৭ হাজার ৫৭০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এরই মধ্যে হাওরাঞ্চলে ৯৮ শতাংশ এবং উঁচু এলাকায় ৬০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক কাজী লুৎফুল বারী ৭ মে প্রথম আলোকে বলেন, বিলম্বে রোপণ করা কিছু ধান ছাড়া ৮-১০ দিনের মধ্যে মোটামুটি সব ধানই পেকে যাবে। এবার খরার সময় যাঁরা পানি দিতে পারেননি, তাঁদের কিছু ক্ষতি হয়েছে। যেগুলোতে পানি ছিল, সেখানে ভালো ধান হয়েছে। খরা না হলে আরও ভালো ধান হতো।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন