হাটে গরু বেশি, দাম ও ক্রেতা দুই-ই কম
ন্যার কারণে নওগাঁ, গাইবান্ধা ও বগুড়ার বিভিন্ন হাটে প্রচুর গরু উঠলেও ক্রেতা তেমন নেই। এ ছাড়া গরুর দামও কম। এতে বিপাকে পড়েছেন খামারি ও গরু পালনকারীরা।
নওগাঁ শহরের বিসিক শিল্প এলাকায় ‘নওগাঁ স্পেশাল এগ্রো-ইকোনমিকস জোন লিমিটেড’-এর পরিচালক মণি মজুমদার তাঁর খামারে ৪৩টি ষাঁড় গরু লালন-পালন করেন। ভেবেছিলেন কোরবানির হাটে গরুগুলো বিক্রি করে ভালো আয় করবেন। কিন্তু উল্টো লোকসান দিয়ে গরু বিক্রি করতে হচ্ছে তাঁকে। মণি মজুমদার বলেন, ‘এবার গরুর দাম অস্বাভাবিক কম। লোকসান দিয়ে ইতিমধ্যে ঢাকার ব্যাপারীদের কাছে ১০টি গরু বিক্রি করেছি। প্রতিটি গরু বিক্রিতে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে।’
গত বুধবার থেকে শনিবার নওগাঁর বড় পশুর হাট ছাতড়া হাট, মহাদেবপুর হাট, চৌবাড়িয়া হাট, কোলা হাট ও বটতলী হাট ঘুরে দেখা যায়, হাটগুলোতে প্রচুর গরু উঠেছে। কিন্তু ক্রেতা কম। দেশি গরুর পাশাপাশি কিছু ভারতীয় গরুও উঠেছে। হাটের ইজারাদার ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাটে যে পরিমাণ গরুর সরবরাহ, সে তুলনায় ক্রেতা না থাকায় বেচাকেনা হচ্ছে কম। ক্রেতারাও দাম বলছেন কম। এতে খামারি ও গেরস্তদের লোকসান দিয়ে গরু বিক্রি করতে হচ্ছে। গত বুধবার মহাদেবপুর হাটে দেখা হয় মান্দার বড় বেলালদহ গ্রামের আবদুল জব্বারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এক মাস আগে ব্যাপারী বাড়িত অ্যাসে হামার এই গরুটার দাম কছিল, ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু আজ বাজারে এই গরুটার দাম ৪৫ হাজার টাকার বেশি কেউ কয় না।’
গত শুক্রবার বদলগাছির কোলা হাটের ইজারাদার আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার গরুর দাম অনেক কম। নওগাঁ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা উত্তম কুমার দাস জানান, ‘আগামী তিন-চার দিন ব্যবসায়ীদের গরু কেনার প্রবণতা বাড়তে পারে। তখন গরুর দাম কিছুটা বাড়তে পারে।’
গাইবান্ধার বিভিন্ন পশুর হাটগত শুক্রবার থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতারা ঘোরাফেরা করছেন। কেউ পশুর দাম হাঁকছেন, কেউ দাম যাচাই-বাছাই করছেন। এ সময় সদর উপজেলার দারিয়াপুর হাটে পশু বিক্রি করতে আসা শাহজালাল মিয়া বলেন, ‘একটি গরু বিক্রি করতে এসেছি। ক্রেতারা দেখে যান, দাম করেন না। পাইকাররা দাম করেন ৭৫ হাজার টাকা। গত বছর একই ধরনের গরু ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বিক্রি করেছি।’ দারিয়াপুর গ্রামের খামার মালিক তপন চন্দ্র বলেন, বন্যার কারণে হাটে পশুর আমদানি বেশি। এবার লোকসান গুনতে হবে।
একই উপজেলার খোলাহাটি গ্রামের কৃষক ফজলু মিয়া বলেন, ‘দারিয়াপুর হাটে দুটি গরু বিক্রি করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতার সমাগমই বেশি। দামও কম।’ গতকাল দুপুরে সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর হাটে গিয়েও একই চিত্র দেখা যায়। এই হাটে ছাগল বিক্রি করতে আসা মালিবাড়ি গ্রামের আনাছ মিয়া বলেন, ‘দুপুর থেকে ছাগল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, কেউ দামই করছে না।’ একই গ্রামের কৃষক মফিজল হক বলেন, ‘সগলে খালি গরু বোলে (ছুঁয়ে) দেকেন, দাম কয় কত নিবেন, যেই দাম কই, শুনিয়া আরেক গরু দ্যাকপ্যার যায়।’ এই হাটে গরু কিনতে আসা সাদুল্যাপুরের দামোদরপুর গ্রামের স্কুলশিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এবার গরুর দাম অনেক কম। পলাশবাড়ীর হাটেও একই চিত্র দেখা যায়।
বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার হাটগুলোতে কোরবানির পশুর দাম কম হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন খামারিরা। গতকাল দুপুরে দুপচাঁচিয়া ধাপসুলতানগঞ্জ হাটে গরু বিক্রি করতে আসেন খামারি আবু বক্কর ছিদ্দিক। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছরে ৮০-৯০ হাজার টাকার একটি গরুতে ১৫-১৬ হাজার টাকা এবং ৫০-৬০ হাজার টাকার গরুতে ৮-১০ হাজার টাকা লাভ করেছি। এবার গরুর দাম পড়ে গেছে। যে গরুর দাম ৭০ হাজার টাকা হওয়ার কথা সেটি ৬০ হাজার টাকার ওপরে কেউ বলেননি।’
উপজেলার খানপুর গ্রামের আবদুর রহমান একজন বড় খামারি। তিনি এ হাটে চারটি গরু বিক্রি করতে এনেছেন। তিনি বলেন, ‘কপালে যা-ই থাক, এখন বাজার দর মোতাবেক বিক্রি করব।’ হাটে আসা গরুর স্থানীয় ব্যাপারী আবদুস সোবহান বলেন, গরুর দাম গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার আকারভেদে আট-দশ হাজার টাকা কম। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, ‘বন্যার কারণে খামারিরা গরু রাখতে পারছেন না। তাই দাম তুলনামূলকভাবে একটু কম।’
{প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নওগাঁ, গাইবান্ধা ও দুপচাঁচিয়া (বগুড়া) প্রতিনিধি}