‘হামাক দুধ বেচার ব্যবস্থা করি দেন’

খামারি রিক্তা আক্তার অন্য খামারিদের মতো দুধ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। ডাঙ্গাপাড়া গ্রাম, তারাগঞ্জ, রংপুর
ছবি:  প্রথম আলো

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের বিড়াবাড়ি ফকিরপাড়া গ্রামের কেরামতুল্লাহর সাত সদস্যের সংসার। আবাদি জমি নেই। সাতটি গাভির ছোট একটি খামার আছে। প্রতিদিন খামার থেকে গড়ে ৪৮ লিটার দুধ পান। দুধ বিক্রি করে গাভির খাবার খরচ বাদে তাঁর দৈনিক আয় হতো ৭০০ টাকা। এ টাকা দিয়েই চলত তাঁর সংসার।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে চলমান লকডাউনে হোটেল, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় কেরামতুল্লাহ দুধ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। লাভ তো দূরের কথা, দুধ বিক্রি করে গাভিকে খাওয়ানোর খরচই তুলতে পারছেন না। তাঁর মতো তারাগঞ্জের শতাধিক খামারি অর্ধেক দামেও দুধ বিক্রি করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

কেরামতুল্লাহ বলেন, ‘ভাইজান, মুই তো গরুর ওপর নির্ভরশীল। দুধ বেচে গরুর খাবার, মোর সংসারের খাবার চলছেলো। কিন্তু লকডাউনে খুব বিপদে পড়ছি। না পাওছি ঠিকমতো গরুর খাবার দিবার, না পাওছি গরুগুলা বেচে ফেলার। গত বছর করোনাত দেড় লাখ টাকা লস খাওয়ার পর সরকার থাকি ১৫ হাজার টাকা পাইছি। এবার তো কোনো উপায় না দেখুছি। প্রতিদিন পাঁচ-ছয় টাকা করি দুধ বেচে লস খাওছি। এমতোন চলতে থাকলে গরুও মরবে, হামরাও মরমো।’

ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের রতনের স্ত্রীর আরেক খামারি রিক্তা আক্তার বলেন, ‘খামারের গরু তো ভাই দেশি নোয়ায় যে খড়-পাতা আর ঘাস খিলিয়া থোয়া যায়। অস্ট্রেলিয়ার বিদেশি গরু গম, বুটের ভুসি ছাড়া তো পানি-খড় খায় না। খাদ্য, ভুসি কিনবার টাকা কোনটে পামো কন, দুধ তো বেচপার পাওছি না। তোমরা হামাক দুধ বেচার ব্যবস্থা করি দেন, গরুগুলোক বাচাই।’

খামারি ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে ছোট-বড় মিলে প্রায় ৯৭টি গরুর খামার রয়েছে। এ ছাড়া গৃহপালিত প্রায় ৮৪ হাজার গরু কৃষকদের ঘরে আছে। করোনায় ২৮ জুন থেকে পরিবহন, হাটবাজার বন্ধ রয়েছে। হোটেল, রোস্তারাঁ খোলার নির্দেশনা থাকলেও ক্রেতা না থাকায় হোটেলমালিকেরা দোকান খুলছেন না। ফলে খামারিদের দুধ সরবরাহের জায়গা বন্ধ হয়ে গেছে।

নিজের খামারে গরুর দুধ দোয়াতে ব্যস্ত লক্ষ্মীপুর গ্রামের আশেক আলী। ছয়টি গাভির ছোট একটি খামার আছে তাঁর। দুধ বিক্রির আয়ের টাকায় তাঁরও চলত ছয় সদস্যের সংসার। আশেক আলী বলেন, ‘ভাইজান, প্রতিদিন তো খামার থাকি গড়ে ৩৭ লিটার দুধ পাওছি। কিন্তু এ দুধ বেচপার কোনো জায়গা নাই। হামরা না হয় উপাষ থাকির পামো কিন্তু গাভিগুলোক তো আর উপাষ থাকির পায় না। খাবার না পাইলে চিৎকার করা শুরু করে। গরুগুলোর হাঁকডাক শুনলে ভেতরটা ফাটি যায়।’

বেলা তিনটার দিকে ইকরচালী বাজার থেকে দুধের বালতি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন পোয়াতুপাড়া গ্রামের ফাত্তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘হামার কষ্ট তো কায়ও বোঝে না, শোনে না। কায়ও কিছু দেয়ও না। যায় দুধ হামারটে কিনি নেয় চার দিন থাকি, তাঁরও দেখা পাওছি না। নিজের গাভির দুধ নিজে দোয়ে বাজারোত বেচপার আলছেনো। ১১টা থাকি মুখোত মাস্ক পরি বসি আছনু। কিন্তু দুধ কেনার লোক পানু না।’

দোহাজারী গ্রামের আরেক খামারি একরামুল হক বলেন, ‘গাভির দুধ বেচে ভালো আয় করেছি। কখনো কল্পনাও করতে পারিনি এমন দিন আসবে। লকডাউন হওয়ায় সেই দুধ ২০ টাকা কেজিতে দিচ্ছি, তবু কেউ নিচ্ছে না। দুধের সঠিক দাম না পাওয়ায় প্রতিনিয়ত লোকসান হচ্ছে।’

খামার থেকে দুধ কিনে তারাগঞ্জ, পাগলাপীর, রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে হোটেল-রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করেন দুধ ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন ৮০০ লিটার দুধ তারাগঞ্জের বিভিন্ন খামার থেকে সংগ্রহ করে বিভিন্ন জায়গায় দিতাম। কিন্তু ২৮ জুনের পর থেকে হোটেলমালিকেরা এক লিটার দুধও নিচ্ছে না।’

জানতে চাইলে পাগলাপীর হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের মালিক বাবুল হোসেন মুঠোফোনে বলেন, ‘ভাই, সরকার তো হোটেল খোলা রাখার নির্দেশ দিছে। কিন্তু কাস্টমার না থাকলে হোটেল খোলা রাখি লাভ কী? আর দুধ কিনেই-বা কাকে খাওয়াব।’

তারাগঞ্জের ডেইরি খামার সমিতির সভাপতি এমদাদুল হক বলেন, দৈনিক প্রায় ৯ হাজার লিটার দুধ উৎপাদিত হচ্ছে তারাগঞ্জের খামারগুলোতে। ব্র্যাক চিলিং ও রংপুর ডেইরি তারাগঞ্জের ক্রয়কেন্দ্রে খামারিরা মাত্র ১ হাজার ৭০০ লিটার দুধ বিক্রি করার সুযোগ পেলেও বাকি দুধ অর্ধেক দামেও বিক্রি করতে পারছেন না।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ফরহাদ নোমান বলেন, ‘খামারিরা দুধ বিক্রি করতে না পারার বিষয়টি আমাদের জানিয়েছেন। তাঁদের ব্র্যাক চিলিং সেন্টারে ও দুধ প্যাকেটজাত করে বিক্রির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। লকডাউনে খামারিরাও দুধ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।’