হাসপাতালে সেবা নিতেও বাধা 'করোনা'
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন হাসপাতালে নন-কোভিড রোগীদের (করোনায় সংক্রমিত নয়) উপস্থিতিও কমে যায়। ৬৬ দিনের ছুটি শেষে গত ৩১ মে থেকে সীমিত আকারে সব সচল হওয়ার পরও এমন রোগীদের উপস্থিতি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখনো অনেক কম। শয্যার সংখ্যা বিবেচনায় ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের পাঁচটি বড় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুব জরুরি না হলে এখনো কেউ হাসপাতালমুখী হচ্ছে না। করোনার আতঙ্কে রয়েছে নন–কোভিড রোগীরাও।
গত রোববার রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও দিনাজপুরের এম আবদুর রহিম মেডিকেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। প্রতিটি হাসপাতালেই বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা এবং অন্তর্বিভাগে ভর্তি থাকা নন-কোভিড রোগীর সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশ কম।
রাজধানীর বাইরের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত রোববার ভর্তি রোগী ছিল ১ হাজার ২০০ জন। করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার আগে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার রোগী ভর্তি থাকত। এখন বহির্বিভাগে দৈনিক ৮০০ থেকে ১ হাজার রোগী আসছে। করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার আগে প্রতিদিন সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ চিকিৎসার জন্য আসত।
হাসপাতালের উপপরিচালক লক্ষ্মী নারায়ণ মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর রোগীর উপস্থিতি একেবারেই কমে গিয়েছিল। এখন রোগীর সংখ্যা কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে।
আগে যেসব রোগী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে যেত, তারাও এখন করোনা আতঙ্কে হাসপাতাল যাওয়া থেকে বিরত থাকছে। তেমন একজন গাজীপুর শহরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী। ষাটোর্ধ্ব এই মানুষ উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। প্রতি মাসে একবার তিনি স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে আসতেন। তাঁর ছেলে আজহারুল সাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, যাদের অন্য শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের করোনার ঝুঁকি বেশি। সে কারণেই আতঙ্কে তাঁর বাবাকে চার মাস হাসপাতালে নেননি তাঁরা।
রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালে গত রোববার রোগী ভর্তি ছিল ৫৬৭ জন। আগে দৈনিক ৮০০ থেকে ৯০০ জন রোগী ভর্তি থাকত। রোববার এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছে ১ হাজার ৩২৫ জন। তবে সেটিও স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কম।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী রশিদ উন নবী প্রথম আলোকে বলেন, রোগীর উপস্থিতি আস্তে আস্তে বাড়ছে। স্বাভাবিক সময়ের মতো হতে কিছুটা সময় লাগবে।
স্বাভাবিক সময়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বহির্বিভাগে দৈনিক দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার রোগী সেবা নিতে আসত। রোববার সেবা নিয়েছে ৫৪২ জন। হাসপাতালের অন্তর্বিভাগে রোগী ভর্তি ছিল ৭৯১ জন। এর মধ্যে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী ১২৭ জন। স্বাভাবিক সময়ে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ রোগী নিয়মিত ভর্তি থাকত।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক কে এম মামুন মোর্শেদ প্রথম আলোকে বলেন, গত ২৭ জুন থেকে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া শুরু হওয়ার পর থেকে বহির্বিভাগে রোগী অনেক কমে যায়। সাত দিন ধরে বহির্বিভাগে রোগী কিছুটা বাড়লেও স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তা অনেক কম।
তবে হাসপাতালে রোগী কম এলেও কেউ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র এবং হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক আয়শা আক্তার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যাদের প্রয়োজন, তারা ঠিকই চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসছে। আর যাদের হাসপাতালে না এলেও চলবে, তারা টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসকদের পরামর্শ নিচ্ছে।
দিনাজপুরের এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত রোববার রোগী ভর্তি ছিল ৩৭৯ জন। স্বাভাবিক সময়ে এই হাসপাতালে ৭৫০ থেকে ৮০০ রোগী ভর্তি থাকত। করোনার আগে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিত। রোববার বহির্বিভাগে ৩২০ জন রোগী সেবা নিয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক নির্মল চন্দ্র দাস বলেন, করোনা ভীতির কারণে মানুষ হাসপাতালে আসা কমিয়েছে।
৫০০ শয্যার খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সব সময় ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার রোগী ভর্তি থাকত। গত রোববার হাসপাতালে রোগী ছিল ৪৯৪ জন। হাসপাতালের উপসেবা তত্ত্বাবধায়ক আছমাতুন নেসা জানান, জরুরি না হলে রোগীরা হাসপাতালে কম আসছে।
মানুষ কেন সেবা নিতে হাসপাতালে যাচ্ছে না, এর সুনির্দিষ্ট কারণ কেউই বলতে পারছেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতা দুই পক্ষের মধ্যেই আতঙ্ক কাজ করছে। রোগে আক্রান্ত হলেও হাসপাতালের সেবা নেওয়া থেকে বিরত থাকছে অনেকে। খুব শিগগির এই সংকট দূর হবে না বলে তাঁরা মনে করছেন।
শুধু নন–কোভিড রোগীরাই নয়, হাসপাতালে সেবা নিতে যাচ্ছেন না করোনা রোগীরাও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, করোনার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর মোট শয্যার ৭২ শতাংশই খালি থাকছে।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইউজিসি অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালে গেলেও চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাবে না, এমন আস্থার সংকটও রয়েছে। হাসপাতালগুলোর এমন পরিস্থিতি শিগগিরই দূর হবে না। হাসপাতালে গিয়ে সেবা নিতে জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরিতে সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।