হোঁচট খাচ্ছে সরকারের পুকুর খনন প্রকল্প

>• আজ ২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবস।
• এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য: ‘পানির জন্য প্রকৃতি’।
• ৪২ জেলায় ৮০৯টি পুকুর পুনঃখনন করবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
• ৩৭৫ কোটি টাকার দুই বছর মেয়াদি প্রকল্প শেষ হবে ২০১৯ সালের জুনে।
• এ পর্যন্ত কাজ হয়েছে সামান্য।
‘গত বছর ধরে রাখা বৃষ্টির পানি শেষ। দুই মাস ধরে পুকুরের পানি খাচ্ছি। পুকুরের পানিও কমে গেছে। এই পানি খেয়েই কোনো রকমে বেঁচে আছি।’
কথাগুলো উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার খাগড়াঘাট গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আমিরন বিবির।
আমিরনের সঙ্গে ছিলেন গৃহবধূ তাসলিমা বেগম। তিনি বললেন, তিন কিলোমিটার দূরের কাশিপুর গ্রামের একটি পুকুর থেকে তাঁরা পানি আনেন। সাত সদস্যের পরিবারের জন্য দিনে সকাল-বিকেল দুবার পানি নেন। কলস নিয়ে পাড়ি দিতে হয় ১২ কিলোমিটার পথ। দিনে সময় যায় চার ঘণ্টার বেশি।
খাওয়ার পানির জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার এই দৃশ্য উপজেলার হেঞ্চি, তালবাড়িয়া, কাঁঠালবাড়িয়া গ্রামেও দেখা যায়। তবে পানীয় জলের সংকট শুধু এই উপজেলায় নয়, সরকারের সূত্রগুলো বলছে, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার বহু গ্রামে এই সংকট চলছে বছরের পর বছর।
পানীয় জলের সমস্যা মেটাতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে পুকুর পুনঃখনন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বেশ কিছু পুকুর পুনঃখননের কাজ শুরুও হয়েছে। তবে কয়েকটি কারণে জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে আজ ২২ মার্চ পালিত হচ্ছে বিশ্ব পানি দিবস। ১৯৯৩ সাল থেকে জাতিসংঘ এই দিবস পানি দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। জাতীয়ভাবে এই দিবস পালন করা না হলেও জাতিসংঘের অনেক সদস্যরাষ্ট্র দিবসটি পালন করছে। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য: ‘পানির জন্য প্রকৃতি’। একবিংশ শতাব্দীতে পানি সমস্যা মোকাবিলায় প্রকৃতিনির্ভর ব্যবস্থাপনাকেই প্রতিপাদ্যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পুকুর খনন প্রকল্প
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, পানীয় জলের সমস্যা মেটাতে ‘জেলা পরিষদের মালিকানাধীন পুকুর, দিঘি ও জলাশয় পুনঃখনন’ প্রকল্পের আওতায় ৪২টি জেলায় ৮০৯টি পুকুর পুনঃখনন করবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। ৩৭৫ কোটি টাকার দুই বছর মেয়াদি এই প্রকল্প শেষ হবে ২০১৯ সালের জুনে। এ পর্যন্ত কাজ হয়েছে সামান্য।
প্রকল্প পরিচালক মো. শামসুল আলম বলেন, জেলা পরিষদের মালিকানাধীন পুকুর, দিঘি পুনঃখনন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘অনেক পুকুর জেলা পরিষদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। অনেকে নিজের পুকুর বলে দাবি করেন। অনেক পুকুর বেদখল হয়ে সেই জায়গায় মার্কেট হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সরকারের পুকুর সরকারের হাতে ফিরে আসবে।’
প্রকল্প দলিলে বলা আছে, পুনঃখননের পাশাপাশি পুকুরপাড়ে ঘাস ও ফলের গাছ লাগানো হবে। প্রতিটি পুকুরের পাড়ে একটি করে ‘পন্ড-স্যান্ড-ফিল্টার’ বসানো হবে। পুকুরের আশপাশের মানুষ এই ফিল্টার থেকে পানি সংগ্রহ করবে। প্রতিটি পুকুরের জন্য কমিটি থাকবে। মাছ চাষ, গোসল বন্ধে কমিটি কাজ করবে।
অধিদপ্তর সূত্র জানাচ্ছে, এ পর্যন্ত ৫৫০টি পুকুর পুনঃখননের প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪২২টি পুকুরের কাজের অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রণালয়। অনুমোদন পাওয়া পুকুরগুলোর মধ্য থেকে ১৩৯টি পুকুরের জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে ৫০টির মতো পুকুর পুনঃখনন হয়েছে। আর মালিকানার বিরোধে আটকে আছে ৭৪টি পুকুরের কাজ।
প্রকল্পের শ্যামনগরের চিত্র
প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরায় ৫৭টি পুকুর পুনঃখনন করা হবে। এর মধ্যে শ্যামনগর উপজেলায় ৩০টি পুকুর। উপজেলা সহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম পর্যায়ে ১৫টি পুকুর পুনঃখনন করা হবে। প্রথম দুটি খনন করতে গিয়ে পুকুরের মালিকানা নিয়ে জেলা পরিষদের সঙ্গে স্থানীয় ব্যক্তিদের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
শ্যামনগরের ভুরুলিয়া ইউনিয়নের কাটিবারহল গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়–সংলগ্ন পুকুরটি পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় নেয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। জেলা পরিষদ বলেছিল, পুকুরটি তাদের। এখন স্থানীয় কয়েকজন এই পুকুরের মালিকানা দাবি করছেন। এলাকায় গিয়ে জানা যায়, মালিকানার দাবিদারেরা ঠিকাদারদের পুকুরে নামতে দেয়নি। স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি শেখ মহিউদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, এটা তাঁদের পৈতৃক পুকুর।
জেলা পরিষদ কৈখালী ইউনিয়নের খোয়াসখালি দিঘিটি প্রকল্পের জন্য নির্ধারণ করে। এখন স্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, দিঘির মালিকানা নিয়ে ঝামেলা আছে। আদালতে মামলা চলছে। ঠিকাদারেরা এই দিঘিতেও নামতে পারেননি। যেসব পুকুর পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে, সেগুলো ঠিকমতো হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কয়েক দশক ধরে পানীয় জলের সমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পানীয় জলের জন্য পুকুর পুনঃখনন অত্যন্ত জুতসই ব্যবস্থা। অনেকে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে পুকুর বা জমি নিজের বলে দাবি করে। এগুলো কঠোর হাতে দমন করতে হবে। পাশাপাশি শর্ত অনুযায়ী খননসহ আনুষঙ্গিক কাজ হচ্ছে কি না, তা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দেখতে হবে।