default-image

‘নিশ্চয় এখানে যুদ্ধের প্রশ্ন নেই,’ ভারী চুলের গোছায় আঙুল চালাতে চালাতে আসিফ বলল। ‘প্রত্যেকেই বিপজ্জনক নীতি এমনভাবে অনুসরণ করেছে, যা বিষয়টিকে যুদ্ধ বা ধ্বংসের প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে, এই আর কি। সত্যি সত্যি যা হবে তা হলো, মুজিব তাঁর ছয় দফা দাবি থেকে সরে আসবেন। তারপর পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বদলে দূরবর্তী কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনাও বাদ দেবেন। আর এটা করার পর ইয়াহিয়া তাঁকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানাবেন, আর ঠিক তখন ভুট্টো বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করবেন। আনন্দময় না হলেও এটাই একমাত্র সুস্থ ও যৌক্তিক সমাধান। মুজিব হলেন অহিংসাপরায়ণ বিপ্লবী। আর তা ছাড়া সাধারণ বাঙালি যেটাতেই খুশি হোক না কেন, তারা আদতে উচ্ছৃঙ্খল জনতা। তারা যদি এতটুকু মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চায় আমাদের সেনাবাহিনী তাদের কচুকাটা করবে। তাদের মধ্যে কেউ নিশ্চয় বেঘোরে মরতে চাইবে না,’ বলে নিয়ে অ্যাম্পির ওয়েটারকে হাতের ইশারায় বরফ আনতে বলল সে।

‘দাসত্ব বরণ করতেও চাইবে না কেউ,’ লায়লা আর তার নতুন বরের দিকে হাত নাড়তে নাড়তে মাহিন বলল। লায়লা বরকে নিয়ে তখনই সেখানে এল, নিচের তলার একটা টেবিলে বসল। বলল, ‘ইয়াসমিন, দেখো ওর জামাটা কী সুন্দর না?’

‘কী আর বলব, সে তো বরাবর জমকালো। ওই লোকের ভেতরে কী পেল সে?’ আসিফ মাথা নেড়ে বলল, ‘আর শোনো, মাহিন, দাসত্ব কি একটু বেশি নাটকীয় শব্দ না?’

‘এই শব্দে কোনো নাটকীয়তা নেই,’ আলী বলল, ‘বিশ্বাস না হলে পরিসংখ্যানগুলো দেখো।’

‘আরে রাখো তোমার পরিসংখ্যান,’ হাসতে হাসতে আসিফ বলল।

‘আচ্ছা মানলাম। কিন্তু কেবল ভেবে দেখো, পূর্ব পাকিস্তানেই কিন্তু দেশের বেশির ভাগ লোক থাকে, আর তারপরও…’ কথা থামিয়ে সে নিজের আঙুলে গোনা শুরু করল, ‘ওদিকটায় বিদেশি সাহায্যের মাত্র ৩০ শতাংশ যায়, সরকারি চাকরিতে ওদিকের মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ ঢুকতে সুযোগ পায়, সেনাবাহিনীতে তাদের উপস্থিতি মাত্র ১০ শতাংশের মতো। স্কুল কম ওদিকটায়। বিশ্ববিদ্যালয় আরও কম। দেশের রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৭০ শতাংশ আসে পূর্ব পাকিস্তান থেকে। কিন্তু আমদানির বেলায় তাদের জন্য বরাদ্দ আমাদের সম্পূর্ণ আমদানি খরচের মাত্র ৩০ শতাংশ।

‘নির্বোধ আর অন্যায়ের দোসর রাজনীতিবিদগুলো নিজের ক্ষমতার বলয়ের মধ্যেই ঘুরপাক খায়,’ মেনু খুলে খাবার শেষের মিষ্টির তালিকায় চোখ বোলাতে বোলাতে জাফর বলল। ‘মুজিব আর ভুট্টো কেন ভোর হতেই পিস্তল হাতে নিজেদের মধ্যে মৃত্যুর পাঞ্জা লড়াইয়ে নামে না? নিজেদের মধ্যে যা খুশি করে আমাদের এই সমস্ত গ্যাঞ্জাম থেকে মুক্তি দিলেই পারে।’

‘বিষয়টা তত সহজ না, জাফর,’ ন্যাপকিনটাকে বারবার ভাঁজ করে নিখুঁত একটা চতুর্ভুজ বানাতে বানাতে আলী বলল।

মাহিন তার বাগদত্তার ঘাড় জড়িয়ে বলল, ‘জানু, আসিফ কিন্তু ঠিকই বলেছে। দেখো, আসিফ, আমার আশা ছিল—সত্যি কথা বলতে কি, শুধু আশা নয়, আশা তো বটেই, আমি প্রার্থনাও করি—এসব ঝামেলা সহজে মিটে যাক, কিন্তু যদি তুমি ভাবো যে বাঙালিদের দাবিদাওয়া এমনিতেই থেমে যাবে, তাহলে তুমি এক বিভ্রান্তির মধ্যে আছ। কারণ, আমি ঠিক জানি না তারা আর রাষ্ট্রীয় সংহতিকে কখনো মেনে নেবে কি না। স্বাধীনতা শব্দটি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন রাষ্ট্রজোটের চেয়ে তার অনেক বেশি আবেদন নিয়ে মানুষের আত্মায় আলোড়ন তোলে।’

‘হুম, তবে আমি যা জানি তুমি কিন্তু তা জানো না।’ আসিফ বলল।

‘সেটা কী শুনি?’

‘সেটা হলো, আজকে একটু আগে ইয়াহিয়া সাংবাদিকদের বলেছেন যে মুজিবের সঙ্গে তার আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে, স্থির হয়েছে যে মুজিব পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। তারা দুজনে আলোচনার মাধ্যমে একটা সমঝোতায় পৌঁছেছেন। মাহিন, আমি দুঃখিত, তোমার আত্মা ততটা আলোড়িত না হলেও এভাবে চলতে হবে কোনোরকমে।’

‘আল্লাহর ওয়াস্তে থামো, আসিফ, ও তো সারা জীবন করাচিতে কাটিয়েছে,’ ইয়াসমিন বলতে চেষ্টা করল, ‘কিন্তু সে কিন্তু মোটেও…’

‘সে কিন্তু মোটেও কী?’ মাহিন তার বন্ধুর দিকে ফেরে, ‘সে মোটেও ওদের কেউ না?’

ঠিক তখনই নিচ থেকে একটা আওয়াজ এল। ওয়েটার লায়লার গায়ের ওপরে ড্রিংক ছলকে ফেলে দিয়েছে। তার বর লাফিয়ে দাঁড়ায় আর ওয়েটারের গালে সোজা বসিয়ে দিল এক থাপ্পড়। ‘গর্ধভ কোথাকার! যেখান থেকে এসেছ, সে জঙ্গলে ফেরত চলে যাও না!’

জাফর চট করে উঠে দাঁড়াল। আলী আর আসিফ তাকে ধরে বসিয়ে দিল।

লায়লা তার বরের হাত চেপে ধরে কানে কানে কিছু বলল। তিনি মাহিনের দিকে তাকালেন, রেগে লাল হয়ে বললেন, ‘শাড়িটা নতুন,’ মাহিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য শাড়ির দাগলাগা অংশটা ধরে দেখালেন। ‘আমি হুট করে রেগে গেছি, কিন্তু যা হয়েছে তার জন্য রাগ করা কি অন্যায় হয়েছে? কিছু মনে কোরো না। ঠিক আছে, মাহিন?’

মাহিন অনিচ্ছাকৃতভাবে কাঁধ ঝাঁকাল, ঝোঝা গেল সেটা লায়লার বরকে খুশি করতেই। তিনি চেয়ারে বসলেন, আবারও খাওয়ায় মনোযোগী হলেন। লায়লা একভাবে মাহিনের দিকে তাকিয়ে থাকল কিন্তু মাহিন তার চোখে চোখ রাখল না।

‘ওহ্ আজকাল সবখানে শুধু গুজব,’ ইয়াসমিন জাফরকে বলল, আলোচনার প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যই হয়তো বলল, ‘এইমাত্র শুনলাম ওই হুলো বেড়ালগুলোর একটি নাকি পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ ভবনে বোম লাগিয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে এই কাজ শেষ হবে না আর জাতীয় সংসদ কখনো বসবেও না, অন্যদিকে, মুজিব কখনো প্রধানমন্ত্রীও হবে না। ওরা গুলি করার যে গল্প বলে তা তুমি নিশ্চয় বিশ্বাস করো না, করো নাকি? ডলি আর আনোয়ার যেখানে থাকে, ওই ঘটনা সত্যি হলে থাকতে পারত?’

‘গুজবের কথা যখন উঠলই, আমার মনে হয় আমাদের দুজনকে রেসের ময়দানে একসঙ্গে কেউ দেখলে নতুন একটা গুজব শুরু হবে।’ জাফর যদিও তার দিকে তাকিয়ে হাসল কিন্তু ইয়াসমিন হাসল না। কথাটা বলে কি সে ভুল করল, জাফর দুশ্চিন্তায় পড়ল। তাই তড়িঘড়ি আগে যে বিষয়ে কথা হচ্ছিল সেখানেই ফিরে গেল, ‘শুনলাম ডলি নাকি ওখান থেকে চলে যেতে চায় কিন্তু আনোয়ার এ ব্যাপারে অদ্ভুত ব্যবহার করছে। ওরা বলছিল এ ঘটনার পরও আনোয়ারের চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়েনি। আর দেখো এখন সে কার সঙ্গে বসে আছে। এই যে, বাইনোকুলারের ভেতর দিয়ে দেখো, দেখতে পাচ্ছ ওকে? তুমি যাদের হুলো বেড়াল বলছিলে তাদেরই একটা দলের সঙ্গে বসে আছে দেখো। ওই ঘটনার পর থেকে পুরোনো বন্ধুদের সে এড়িয়ে চলে। আমি এই প্রথম তাকে এ রকম লোকজনের সঙ্গে দেখলাম যাদের উপস্থিতি যেকোনো মানুষকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে তুলতে পারে।’

‘ওরা হয়তো জাতীয় সংসদ ভবনে বোমা ফেলা নিয়ে কথা বলছে।’

‘ভুট্টোর গতকালের ছোট্ট ভাষণটা নিয়েও বলতে পারে,’ দৈনিক পত্রিকার হেডলাইনের ওপরে জাফর আঙুল বুলিয়ে বলল।

‘তাকে ছাড়া জাতীয় সংসদ অধিবেশন বসলে খাইবার আর করাচি থেকে আন্দোলন শুরু হবে। সিদ্ধান্তের ফলাফল হিসেবে সেটাকে অগ্রাহ্য করাই ভালো হবে। কোনো কোনো রাতে আমি সহিংসতার ভয়ে ঘুমাতে পারি না।’ আমিও ঠিক এই অবস্থাতেই আছি, ইয়াসমিন মনে মনে ভাবল। আর মাহিনের কেমন লাগে, বাঙালি হয়েও পশ্চিম পাকিস্তানে পড়ে থাকতে? আর প্রতিদিনই যখন নতুন কেউ দেশের চলমান পরিস্থিতির কবলে ঘোরগ্রস্ত হয়ে মারা পড়ে পড়ে অবস্থা। নতুন কেউ এসে নতুন কিছু এমনভাবে বলে যে আগের সব চিন্তা বদলে যেতে থাকে। আর এটা বলাও কঠিন যে কার চিন্তাটা বেশি খারাপ; মাহিন ঘরে ঢুকতেই যারা মৃতের মতো চুপ করে গেল, তাদের, নাকি যারা কথা বলা চালিয়ে গেল, তাদের।

‘শেষ পর্যন্ত রেসটা এখনই শুরু হচ্ছে,’ জাফর বলল। ইয়াসমিনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা থেকে রেহাই নেই, অন্তত রেসের মাঠে। উদ্বাস্তু হিসেবে সব সময় একটা আশ্রয়ের খোঁজে লেগে থাকা মাহিনের জন্য একধরনের শারীরিক অস্বস্তিও। প্রতিদিনই প্রতারণা আর অবহেলার নতুন নতুন সত্য উন্মোচিত হয়। শুরুতে ব্যাপারটা সহজ ছিল। কী করা যাবে, দুর্ভাগ্য স্বাভাবিকভাবেই এসেছে। কিন্তু এখন, হায় আল্লাহ…এখন তারা কোথায়? সে তার ঘড়ির দিকে তাকাল। আলী তাকে এক ঘণ্টা আগে এখান থেকে তুলে নেওয়ার কথা ছিল।

‘তোমার কী মনে হয়, ওখানে কোনো সমস্যা হয়েছে?’

‘এটা ভেবো না। এটা ভাবতে ভাবতে বিশ্বাস করতেও শুরু কোরো না। কী সমস্যা? আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে?’

‘আমি কিন্তু নিশ্চিত হয়ে বলছি, জাফর। মাহিনের এই দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। যেকোনো একটা কিছু ঘটে যেতে পারে।’

জাফর নিচের দিকে তার হাতের ওপরে চোখ রাখে, ‘তুমি কি হাতের রেখা গণনা করে বলে দিতে পারো?’

ইয়াসমিন তার ঘাড়ের ওপরে হাত রাখল। যে কণ্ঠস্বরে এইমাত্র জাফর কথা বলল তা তার বহুবার শোনা কণ্ঠস্বর নয়। ‘আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি না, কেন এমন বলছ বলো তো?’

‘আমার জানতে ইচ্ছা করে, হাতের রেখা যদি বলে দিতে পারত তোমার কোথায় গিয়ে থাকা উচিত।’ সেদিনের পরে, যেদিন অ্যাম্পিতে লায়লার বর ওয়েটারকে জোরে এক থাপ্পড় মারল, সেদিন সে মাহিনকে বলেছিল যে ওদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। বলেছিল, বিয়ে করে ফেলো আর লন্ডনে চলে যাও। জাফর চেয়েছিল মাহিন যেন যেকোনো মূল্যে ‘না’ বলে, সে সেটাই বলেছিল। কিন্তু জাফর জানে না মাহিনের মুখের ওই ‘না’ সে কতটা নিশ্চিত হয়ে বলেছে আর কতটা জাফর কায়মনে চায় বলে বলেছে। করাচি ছাড়ো! ভাবনাটা উঁকি দিতেই জাফর কেঁপে উঠল। বাড়ি ছাড়ো।

‘করাচি তোমাদের দুজনেরই নিজের বাড়ি,’ ইয়াসমিন বলল।

শুনতেই জাফরের মাথা ঘুরে উঠে বমি পায়। নিশ্চয় আর কথা হলো এই, যখন সে বলে বাড়ি ছেড়ে যাও, তার মানে মাহিন ছেড়ে গেলে পুরো বাড়িটাই তার হয়ে যায়। দ্রুতই তা মাহিনের জন্য হয়ে যায় শত্রুসম্পত্তি। কিন্তু এ তো মাহিনের নিজের বাড়ি। এই কথাটা জাফর কী করে এত দিন ভুলে ছিল? কিন্তু ছিল তো বটেই! নিজের ভুল থেকেও আজকের আগপর্যন্ত সে শিখতে পারেনি। হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ধরে জাফর। কত অবিবেচকের মতো বিভ্রান্তি আর উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে! হায় আল্লাহ, কবে বিষয়গুলো এত জটিল হয়ে উঠেছে?

‘শুনতে পেয়েছ?’ জাফরের শরীরে হেলান দিয়ে মাহিন বলল।

‘কী।’

‘সূর্য সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে। চারদিকটা এত নিস্তব্ধ যে তুমি যদি কান পাতো, তবে পানিতে সূর্যের ছোঁয়ার টগবগ শব্দ শুনতে পাবে।’

জাফর মাহিনকে নিজের বাহুতে জড়িয়ে নিল। ভুলেই গেল যে তারা বহু মানুষের মাঝখানে খোলা জায়গায় বসে আছে। ‘এখানে অনেক শান্তি, তাই না?’

মাহিন ওপর-নিচে মাথা নাড়াল। ‘বিশ্বাস করা কঠিন যে গৃহযুদ্ধ লেগেছে এখানে। দেখে মনে হয় যেন এখানে নয়,’ মাহিন হাসতে হাসতে কাঁপে—‘মনে হয় যেন অন্য কোথাও।’ মাহিন সিগাল পাখিগুলোর দিকে একভাবে তাকিয়ে ছিল। তারা পানির একেবারে কাছে গিয়ে সমান্তরালে ওড়ে আর সেখান থেকে অদ্ভুতভাবে আকাশের দিকে ওঠে, পালক থেকে একফোঁটাও পানি না ঝরিয়ে। ‘লায়লা যেন কোন বিদেশি সাংবাদিকের কাছে শুনেছে যে, ঢাকায় নাকি সেনাবাহিনী হাজারে হাজারে আমার লোককে খুন করছে।’

আমার লোক। জাফর নড়েচড়ে বসল, ‘মাহিন, আমার কথা শোনো।’

‘না, জাফর, আমরা দেশ ছেড়ে যাব না। আমি কিছু অপরিচিত মানুষের মাঝখানে অচেনা হয়ে উপস্থিত হতে চাই না। যুদ্ধ মানুষের মধ্যে আজব সব পরিবর্তন আনে, কিন্তু যুদ্ধ একদিন ঠিকই শেষ হয়। আমি তেমন মিথ্যা বলতে চাই না। কিন্তু তুমি জেনো, যখন এ সবকিছু শেষ হবে—আল্লাহ যেন আমাদের করুণা করে এসব দ্রুত শেষ করেন! তারপর আমরা বিয়ে করব আর আমাদের সন্তানও হবে। তারপর দেখো, একদিন কিংবা প্রতিদিন আমরা তাদের শোনাব কী করে এই নারকীয় অবস্থা থেকে আমরা রক্ষা পেয়েছিলাম।’

জাফর মাথা দোলাল। ‘এ মুহূর্তে বসে আমি বুঝতে পারছি না, এই দেশের প্রতি তোমার একবিন্দুও আনুগত্য থাকবে কেন!’

‘এটা প্রতারণা? আমার দৃষ্টিভঙ্গি কি বিশ্বাসঘাতকের মতো? জাফর চট করে ঘুরে গিয়ে হাত দিয়ে পেছনের দেয়াল চাপড়াতে লাগল।

‘এটা তো একমাত্র তোমার বন্ধুদের মতবাদ,’ আলী নিজের গ্লাস থেকে একটুকরো বরফ বের করে জাফরের লাল হয়ে যাওয়া হাতের ওপরে রাখল। দেশটা অন্ধ আর উদ্ধত হয়ে গেছে—সেনাসদস্যরা মেয়েদের ধর্ষণ করছে, জাফর, ভাবতে পারো ধর্ষণ করছে তাদের। এ মুহূর্তে সারা পূর্ব পাকিস্তানে তাই করছে তারা। আর করাচির বাড়িতে বাড়িতে বসার ঘরে বসে মানুষজন গল্পে গল্পে তাদের বাহবা দিচ্ছে। কারণ, তারা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জিন উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত আছে।’ আলী জাফরের হাত ধরে ঝাঁকাল। ‘তুমি মাহিনকে নিয়ে যদি দেশ না ছাড়ো তাহলে অন্তত এসব শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমাদেরকে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতে হবে।’

‘সেটা মোটেও কঠিন হবে না আমাদের জন্য। তুমি আর ইয়াসমিন, এই দুর্দিনে একমাত্র তোমরা দুজনই আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসো।’

‘যাক, এভাবেই তাহলে এটা শেষ হলো,’ ইয়াসমিন হাত থেকে দৈনিক পত্রিকাটা নামিয়ে রেখে টেবিলের অন্যদিকে গিয়ে আলীর হাত ধরল। ‘ভারতীয় সৈন্যদের কাছে আত্মসমর্পণ।’ ইয়াসমিন চোখ বুজে বসে থাকল। আলী টেবিলের চারপাশটা একবার ঘুরে এসে তার পাশের চেয়ারে বসল।

‘আমার জানতে ইচ্ছে করছে খবরটা জেনে মাহিনের কেমন লাগছে,’ আলী বলল।

‘আমার জানতে ইচ্ছে করছে জাফরেরই বা লাগছে কেমন। অন্তত কিছুটা হলেও তার একরকম খুশিই হওয়া উচিত যে, ঝামেলাটা শেষ হলো।’

‘খুশি হব? আমি খুশি হতে যাব কেন? জাফর স্কোয়াশ কোর্টে হাতে র‍্যাকেট ঝুলিয়ে হুট করে দাঁড়িয়ে পড়ল। ‘তিন দিন আগে আমরা ভারতীয় সেনার কাছে হার মেনেছি। এটা শোনার পর কিছুতেই আমি খুশি হতে পারি না। আমরা দেশের অর্ধেকটা হারালাম আর আত্মার খোয়ালাম প্রায় সবটা। এত কিছুর পরে কোন শালা খুশি হবে? পুরো বছরটাই এক দুঃস্বপ্ন!’

কামিলা শামসি

কামিলা শামসি একজন পাকিস্তানি ও ব্রিটিশ লেখক। তিনি ১৯৭৩ সালে করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। কার্টোগ্রাফি (২০০২) তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। উপন্যাসটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধের কাহিনি। করাচির উচ্চবিত্ত দুই পরিবারকে ঘিরে কাহিনি গড়ে উঠেছে। উপন্যাসটি মূলত যুদ্ধ ও প্রেম-অপ্রেমের আখ্যান। এখানে উপন্যাসটির একটি পর্বের চুম্বক অংশ অনুবাদ করা হলো।

অনুবাদ: আফসানা বেগম

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন