বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রতিষ্ঠানটি একদিনে আজকের এই অবস্থানে আসেনি। একের পর এক হাতে নেওয়া নানা উদ্যোগ, দেশি-বিদেশি নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাহায্য-সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি বড় হয়েছে। তবে একক ব্যক্তি হিসেবে অধ্যাপক রবিউল হোসেনের অবদান অনেক বেশি। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি এখন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ট্রাস্টি।

১৯ ডিসেম্বর সকালে চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়তলি এলাকায় প্রতিষ্ঠানের হাসপাতালে গিয়ে মানুষের ভিড় চোখে পড়ে। চট্টগ্রাম শহর ছাড়াও আশপাশের এবং দূরের জেলার মানুষ এসেছে চোখের নানা সমস্যা নিয়ে। ভিড় ঠেলে সামনে এগোনো ছিল কঠিন।

অধ্যাপক রবিউল হোসেনের চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি চক্ষুবিজ্ঞানে, বিলেত থেকে। দেশের মানুষের চোখের সমস্যার কথা মাথায় রেখে সরকারি চাকরি ছেড়ে স্বাধীনভাবে সেবার কাজে উদ্যোগী হন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাজ শুরু করি ১৯৭৩ সালে, শহরের আন্দরকিল্লার একটি পরিত্যক্ত ভবনে। ৪০ শয্যার চোখের হাসপাতাল চালু করি। সেখান থেকেই আউটরিচ কর্মসূচিও শুরু হয়। মূলধন ছিল ৩ হাজার ৬০০ টাকা। মনের জোরে কাজ শুরু করেছিলাম।’

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে সরকারের পাশাপাশি অনেক এনজিও ভূমিকা রেখেছিল। রবিউল হোসেন জানান, কারিতাস বাংলাদেশ ওই সময় পাশে দাঁড়িয়ে চক্ষুসেবার কাজে সহায়তা করেছে। এ ছাড়া এক জার্মান দম্পতি আর্থিক সাহায্য ছাড়াও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজে সহায়তা করেছিল। এ রকম উদাহরণ আরও আছে।

আস্থার হাসপাতাল

পাহাড়তলিতে চট্টগ্রাম আই ইনফার্মারি অ্যান্ড ট্রেনিং কমপ্লেক্স যেখানে, সেই জায়গাটি খালি পড়ে ছিল। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করে প্রতিষ্ঠানের জন্য জায়গা চেয়েছিলেন রবিউল হোসেন। পরের বছর সেখানে নতুন হাসপাতালের কাজ শুরু হয়। ১৯৮৩ সালে হাসপাতালের উদ্বোধন হয়।

১০০ শয্যার এই হাসপাতালে বহির্বিভাগে ও জরুরি বিভাগে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মানুষ চিকিৎসা নেয়। ছোট-বড় অস্ত্রোপচার হয় দৈনিক গড়ে ১০০টি। দরিদ্র মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে, নিম্নমধ্যবিত্তের জন্য স্বল্পমূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সেবা পায় যৌক্তিক মূল্যে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ৫০ লাখের বেশি মানুষ এই প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। আড়াই লাখের বেশি মানুষের চোখে অস্ত্রোপচার হয়েছে। এত মানুষের চিকিৎসা নিতে আসার একমাত্র কারণ, হাসপাতালের ওপর মানুষের অগাধ আস্থা।

গণমুখী সেবা ব্যবস্থা

শুধু চিকিৎসাসেবা দিয়ে চোখের সমস্যা দূর করা যাবে না—এটা শুরু থেকেই উদ্যোক্তারা অনুধাবন করেছিলেন। তাই গণমুখী সেবার কথা তাঁরা শুরুতেই ভেবেছিলেন। তাঁরা গড়ে তুলেছিলন জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতি। শহরে ও গ্রামে চক্ষুশিবির ও স্কুলকেন্দ্রিক সেবা এবং প্রচারণা একধরনের সামাজিক আন্দোলনের চেহারা পায়।

প্রথম চক্ষুশিবিরের আয়োজন হয়েছিল কক্সবাজারে, ১৯৭৪ সালে। সেই থেকে চক্ষুশিবির হয়েছে নিয়মিত। চক্ষুশিবির এক দিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত চলে। চক্ষুশিবিরে স্ক্রিনিং বা চোখের রোগ শনাক্ত করা হয়, চোখের ছানিও কাটা হয়। কোনো ক্ষেত্রে দুটিই করা হয়।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ১ হাজার ১৪০টি চক্ষুশিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। সর্বশেষ হয়েছে এ বছর ৩ ডিসেম্বর, চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ডে। সেদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষের চোখ পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা করেন আটজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক।

স্কুলের শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা এবং চিকিৎসারও বড় কর্মসূচি হাতে নেয় সমিতি ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। স্কুল ও গ্রামের এসব কর্মসূচিতে সহায়তার জন্য পাশে দাঁড়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অরবিস।

গুরুত্ব জনবল তৈরিতেও

চোখের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করা, চোখের সমস্যা শনাক্ত করা, চিকিৎসা দেওয়া, অস্ত্রোপচার করা—প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল দরকার। সেই জনবল তৈরির কাজও করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শুধু নিজেদের হাসপাতালের ঘাটতি পূরণের জন্য নয়, জাতীয়ভাবে জনবল তৈরির উদ্যোগেও যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম আই ইনফার্মারি অ্যান্ড ট্রেনিং কমপ্লেক্স।

শিশুদের চোখের সমস্যা আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হলে অনেকাংশে তা নিরাময় সম্ভব। এই শনাক্ত করার কাজে স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষক এবং পল্লি চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের প্রকল্প হাতে নেয় কর্তৃপক্ষ। আটটি স্যাটেলাইট হাসপাতালে এই প্রকল্প এখনো চালু আছে।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসক তৈরির কোর্স এখানে চালু হয়েছে। এতে যুক্ত আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এসব কোর্সের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা চক্ষুবিজ্ঞানের নানা শাখায় উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছেন। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সীমিত পরিসরে হলেও এখানে গবেষণা হচ্ছে, আছে চক্ষুবিজ্ঞান জার্নাল।

জার্মানির সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড ভন ভেইজেকার সস্ত্রীক বাংলাদেশ সফরের সময় চট্টগ্রাম আই ইনফার্মারি অ্যান্ড ট্রেনিং কমপ্লেক্সের কাজ দেখে গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে ১৯৯৪ সালের ২৭ জুন বন শহরে অধ্যাপক রবিউল হোসেনকে সম্মাননা জানান।

সম্মাননা স্মারকে অন্যান্য কথার সঙ্গে জার্মান প্রেসিডেন্ট লিখেছিলেন, ‘আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না, আপনি যেভাবে কাজ করছেন এবং মানুষের প্রতি হাত বাড়িয়ে দিতে যেভাবে আপনি অন্যদের অনুপ্রাণিত করছেন, তা যদি অন্যরা করত, তবে বিষয়টি কত চমৎকার হতো।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন