বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি গত সোমবার পরিবেশ অধিদপ্তরকে এই কর্মপরিকল্পনা দিয়েছে। এতে দূষণ নিয়ন্ত্রণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। কোম্পানিটি বলছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সবার স্বপ্ন পূরণ হবে এমন একটি শিল্পপার্ক তৈরি সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ট্যানারির মালিক ও শিল্পসংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা দরকার।

যদিও চামড়াশিল্প নগর প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০০৩ থেকে ২০২১ সালের গত জুন পর্যন্ত ১৮ বছর সময় ব্যয় হয়েছে। এ দীর্ঘ সময় লাগানোর পরও কাজ বাকি রেখে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) গত জুনে প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করে। আর সিইটিপি পরিচালনার দায়িত্ব ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানিকে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। এই কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ বিসিক ও ট্যানারির মালিকদের সমন্বয়ে গঠিত। এর চেয়ারম্যান পদটি বিসিকের চেয়ারম্যানের জন্য সংরক্ষিত।

এদিকে বিসিক এখন চামড়াশিল্প নগরের দ্বিতীয় পর্যায়ের নাম দিয়ে আরেকটি প্রকল্প নিচ্ছে। এতে ইউরোপীয় প্রযুক্তিতে আরেকটি আন্তর্জাতিক মানের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার তৈরির কথা বলা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘চামড়াশিল্প নগরকে আন্তর্জাতিক মানের করা হবে, এটা আমরা এক যুগ ধরে শুনে আসছি। ফলে আর নতুন করে আশ্বাস শুনতে চাই না।’ তিনি বলেন, চামড়াশিল্প নগর থেকে মোটেও দূষণ হবে না, এটা আগামী দুই মাসের মধ্যে নিশ্চিত করতে না পারলে শিল্পনগর বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

কী কী সমস্যা

নদীদূষণ বন্ধে ট্যানারিগুলোকে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারে যেতে বাধ্য করা হয় ২০১৭ সালে। সাভারে উৎপাদন শুরুর পরই নদীদূষণের ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি হাজারীবাগের মতো শিল্পনগরে চামড়ার উচ্ছিষ্ট ফেলা হয় খোলা আকাশের নিচে।

এই প্রকল্পে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫২১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে সিইটিপি নির্মাণ ও বর্জ্য পরিশোধনসংক্রান্ত কাজে। এ টাকা সরকার অনুদান হিসেবে দিচ্ছে।

দূষণের দায়ে জাতীয় সংসদের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গত ২৩ আগস্ট চামড়াশিল্প নগরের ট্যানারি সাময়িক বন্ধের সুপারিশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ অধিদপ্তর দূষণ বন্ধে কর্মপরিকল্পনা চেয়ে বিসিককে চিঠি দেয়।

ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি গত রোববার পরিচালনা পর্ষদের বিশেষ সভা করে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে। এতে ট্যানারি মালিকদের সমিতির নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। কোম্পানির দেওয়া কর্মপরিকল্পনায় সিইটিপির বেশ কয়েকটি সমস্যার কথা বলা হয়েছে। যা হলো: ১. ট্যানারিতে পবিত্র ঈদুল আজহার পর দিনে ৩০ থেকে ৪০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য উৎপাদিত হয়। যদিও সিইটিপি নির্মাণ করা হয়েছে ২৫ হাজার ঘনমিটার পরিশোধনের সক্ষমতায়। সিইটিপি বাড়তি বর্জ্যের চাপ নিতে পারে না, শোধন নির্ধারিত মান অনুযায়ী হয় না। ভবিষ্যতে চামড়াশিল্প নগরে বর্জ্য আরও বাড়বে।

২. সিইটিপিতে লবণ পরিশোধনের ব্যবস্থা নেই। এ কারণে পরিবেশ আইনে নির্ধারিত মানে বর্জ্য পরিশোধন সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ আইনে ছাড় দিয়ে লবণাক্ত পানি নদীতে ফেলার সুযোগ চাওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে বিসিকও এ ছাড় চেয়েছিল। তবে পায়নি।

৩. সিইটিপি ও ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিটের জন্য সুসজ্জিত পরীক্ষাগার দরকার। কোম্পানি দায়িত্ব নেওয়ার পর যেসব যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক রি-এজেন্ট পেয়েছে, তা দিয়ে পাঁচটি পরীক্ষা করা সম্ভব। যদিও ১৪টির বেশি পরীক্ষা করতে হয়।

৪. ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিটের সক্ষমতা দিনে ১ হাজার ৫০ ঘনমিটার। যদিও বর্জ্য আসছে ৫ হাজার ঘনমিটারের মতো। বাড়তি বর্জ্যের কারণে ক্রোমিয়ামযুক্ত তরল যথোপযুক্ত সময় ধরে পরিশোধন করা যায় না। আবার কিছু ট্যানারি ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য আলাদাভাবে না দিয়ে সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে ছেড়ে দেয়।

৫. সিইটিপির একটি অংশ (ভোর্টেক্স চেম্বার) ত্রুটিপূর্ণ ও সক্ষমতা কম। এর নকশা সংশোধন করা প্রয়োজন। সিইটিপির অন্যান্য ট্যাংকের আয়তন কম মনে হয়েছে কোম্পানির কাছে।

৬. সিইটিপিতে গাদ অপসারণে সমন্বিত ব্যবস্থা নেই, যা যেকোনো উন্নত সিইটিপিতে থাকে।

৭. সিইটিপির কার্যক্রম চলে ৪০০টির বেশি পাম্প, মোটর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি দিয়ে। যদিও এগুলো দীর্ঘদিন সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। নষ্ট হয়ে গেলে দ্রুত মেরামত করা যায় না, যা বর্জ্য পরিশোধনে বিরূপ প্রভাব ফেলে।

ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানির নথিতে আরও বলা হয়, সিইটিপি এখনো আদর্শ মান অর্জন করতে পারেনি বলে এটি নির্মাণের দায়িত্বে থাকা চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ‘কমিশনিং সার্টিফিকেট’ দেওয়া হয়নি। বিসিক সূত্র জানিয়েছে, ঠিকাদারের কাছ থেকে ২৭ কোটি টাকা কেটে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চামড়ার উচ্ছিষ্ট খোলা আকাশের নিচে ফেলা বন্ধ হবে কবে তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানির কর্মপরিকল্পনায়।

বর্জ্যসীমা বেঁধে দেওয়া হবে

ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি দূষণ রোধে ১ থেকে ১২ মাস মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য স্বল্পমেয়াদি, ১২ থেকে ৩৬ মাস মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য মধ্যমেয়াদি ও ৩৬ মাস থেকে তার বেশি সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলেছে।

স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় ট্যানারিতে বর্জ্য উৎপাদনের সীমা বেঁধে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোম্পানি বলছে, সীমা বেঁধে দেওয়ায় কারখানায় উৎপাদন কমবে। এ ক্ষতি পোষাতে দুই বছরের জন্য ঋণের সুদে ছাড় দেওয়া যেতে পারে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় সিইটিপি ও পাইপলাইন পরিষ্কার করা, তদারকি বাড়ানো, আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াসহ নানা পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় সিইটিপি সংস্কার, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন (বিএমআরই) প্রকল্প নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় চামড়াশিল্প নগরের দ্বিতীয় পর্যায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তাতে নতুন একটি সিইটিপি করার কথা বলা হয়েছে। আর কোনো ট্যানারি নিজস্ব বর্জ্য পরিশোধনাগার করতে চাইলে অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

বিসিকের চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান প্রথম আলোকে বলেন, যেসব কারখানার মালিক নিয়ম মানবেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চার বছর ধরেই বিসিক এ ধরনের কথা বলছে। তাতে কোনো লাভ হয়নি।

‘দূষণ বন্ধ হলে ছাড়পত্র’

চামড়াশিল্প নগরে ১৩২টি ট্যানারি উৎপাদনে রয়েছে। যদিও জমি দেওয়া হয়েছিল ১৫৪টিকে। উৎপাদনে থাকা একটি ট্যানারিকেও পরিবেশ ছাড়পত্র দিচ্ছে না পরিবেশ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের পরিচালক (ছাড়পত্র) মাসুদ ইকবাল মো. শামিম প্রথম আলোকে বলেন, দূষণ বন্ধ হলে তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন