গৃহ খাতে কর্মী নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে সৌদি আরব। তবে ১২০০ রিয়াল (২৫ হাজার ২০০ টাকা) থেকে ১৫০০ রিয়াল (৩১ হাজার ৫০০ টাকা) বেতনের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত ৮০০ রিয়ালেই (১৬ হাজার ৮০০ টাকা) গৃহকর্মী পাঠাতে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল মঙ্গলবার দুই দেশের মধ্যে এ চুক্তিও হয়েছে।
এত কম বেতনে গৃহকর্মী পাঠানোর চুক্তি করায় এবং নারী গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সৌদি আরবপ্রবাসী বাংলাদেশি এবং অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলো। তারা বলছে, সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যাওয়া মেয়েরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ায় ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশ এখন সেখানে নারী কর্মী পাঠানো প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
অবশ্য প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা বলছেন, সৌদি আরব দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে রাজি হয়েছে। কাজেই চাইলেও তাদের প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ ছিল না। গৃহকর্মী নেওয়ার পর অন্যান্য খাতেও কর্মী নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে দেশটি। বাংলাদেশি মেয়েরা যেন কোনো বিপদে না পড়ে, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে বাংলাদেশ।
ছয় বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর চলতি মাসে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে আবার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দেয় সৌদি আরব। কোন প্রক্রিয়ায় লোক যাবে তা চূড়ান্ত করতেই দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়ে উপমন্ত্রী আহমেদ আল ফাহাইদের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল গত রোববার ঢাকায় আসে। সোমবার সকালে তাঁরা প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তাঁরা।
গতকাল সন্ধ্যায় গৃহ খাতে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। চুক্তিতে সৌদি আরবের পক্ষে আহমেদ আল ফাহাইদ এবং বাংলাদেশের পক্ষে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব খন্দকার ইফতেখার হায়দার স্বাক্ষর করেন।
অথচ সোমবার প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, ১২০০ থেকে ১৫০০ রিয়ালের নিচে কোনোভাবেই কর্মী পাঠাবে না বাংলাদেশ। তবে গতকাল চুক্তি শেষে খন্দকার ইফতেখার হায়দার সাংবাদিকদের বলেন, ‘গৃহ খাতে মোট ১২টি পেশা রয়েছে। তবে এই মুহূর্তে আমরা নারী গৃহকর্মী পাঠানোর জন্য বেতন নির্ধারণ করেছি। সৌদি আরব নারী গৃহকর্মীদের থাকা-খাওয়া ছাড়াও ৮০০ রিয়াল দিতে রাজি হয়েছে।’
চুক্তি তৈরির সঙ্গে জড়িত প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তিনজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে বলেছিল, ১২০০ থেকে ১৫০০ রিয়ালের নিচে কর্মী পাঠাবে না। কিন্তু সৌদি আরব রাজি হয়নি। একপর্যায়ে তাঁরা চুক্তি না করেই চলে যাওয়ার কথা জানান। দর-কষাকষিতে ৮০০ রিয়াল দিতে রাজি হয় সৌদি আরব। দীর্ঘদিন পর যেহেতু বাজার খুলছে, কাজেই বাংলাদেশের রাজি হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। বাংলাদেশ আশা করছে, নারী গৃহকর্মী দিয়ে সৌদি আরবের বাজার চালু হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য খাতে কর্মী যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে।
এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণসচিব বলেন, ‘বেতন ৮০০ রিয়াল হলেও থাকা-খাওয়া ও সব সুযোগ-সুবিধা পাবে কর্মীরা। আর শুধু গৃহকর্মীরাই ৮০০ রিয়াল পাবে। বাকি খাতগুলোতে বেতন এখনো ঠিক হয়নি। আমরা আশা করছি, অন্যান্য খাতের কর্মীরা তাদের যোগ্যতা দিয়ে বেশি বেতন পাবে।’
সৌদি শ্রম উপমন্ত্রী আহমেদ আল ফাহাইদ বলেন, গৃহকর্মীদের অধিকারসহ অন্যান্য অধিকার রক্ষা করা হবে। কেউ আইন ভাঙলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সৌদি আরবের নারী গৃহকর্মীদের অবস্থা নিয়ে ২০১০ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ওই প্রতিবেদনে সৌদি আরবে কর্মরত ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার ১৫০ জন গৃহকর্মীর সাক্ষাৎকার ও অবস্থা তুলে ধরা হয়। সাক্ষাৎকারে তাঁদের বেশির ভাগ বলেছেন, তাঁরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। ওই প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষক নিশা ভারিয়া। পরে একটি সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় এলে আলাপকালে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অন্য দেশে গৃহকর্মীদের সাধারণ সমস্যা ঠিকসময়ে বেতন না হওয়া কিংবা ছুটি না পাওয়া। কিন্তু সৌদি আরবে এর বাইরেও নির্যাতন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। আমরা সেখানে গৃহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে ভয়াবহ এই চিত্র পেয়েছি।’ তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ সেখানে নারীদের পাঠাতে চাইলে অবশ্যই নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা উচিত।
বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বমসা) পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘৮০০ রিয়াল বেতন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। আর আমাদের মেয়েরা এখন অনেক দক্ষ। কাজ শিখে যাচ্ছে। কাজেই বেতন বাড়াতে পারলে ভালো হতো। তার পরও যদি শ্রমবাজার খোলার স্বার্থে কর্মী পাঠাতে হয়, তাহলে সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই যেন পাঠানো হয়। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক নারী কর্মীকে যাওয়ার সময় মোবাইল ফোন দেওয়া হোক। কারণ, মেয়েরো ঘরে কাজ করবে। এ ছাড়া মাসে অন্তত একবার দূতাবাসের পক্ষ থেকে মেয়েদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা উচিত। এ জন্য দূতাবাসে লোকবল বাড়ানো কিংবা প্রয়োজনে বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়া উচিত। কারণ, আমরা চাই না কোনোভাবেই আমাদের মেয়েরা নির্যাতিত হোক।’
এর আগে ২০১১ সালের এপ্রিলে সৌদি ন্যাশনাল রিক্রুটমেন্ট কমিটি (সানারকম) ঢাকায় এসে গৃহকর্মী নিতে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। তবে কর্মী যায়নি। গতকাল আবার বায়রার সঙ্গে একই বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সফররত সানারকমের চেয়ারম্যান সাদ নাহার আল-বাদ্দাহ এবং বায়রার সভাপতি আবুল বাসার এতে স্বাক্ষর করেন। সমঝোতা অনুযায়ী, প্রত্যেক কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া খরচ বাবদ সৌদি নিয়োগকর্তার কাছ থেকে এক হাজার মার্কিন ডলার পাবে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান।
আবুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সানারকমের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনাকালে আমরা নিরাপত্তার বিষয়টি তুলেছিলাম। তাঁরা আমাদের বলেছেন, তাঁরা তাঁদের মা-বোনদের যেমনভাবে নিরাপত্তা দেন, আমাদের মেয়েদেরও সেভাবে নিরাপত্তা দেবেন। আমরা আশ্বস্ত হয়েছি। তার পরও সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো চূড়ান্ত করার আগে আমরা বিষয়গুলো দেখব। আশা করছি, বাজার পুরো চালু হয়ে গেলে এসব সমস্যা থাকবে না। নারী গৃহকর্মী যাওয়া শুরু হলে অন্যান্য খাতেও কর্মী যাওয়া শুরু হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারপারসন তাসনিম সিদ্দিকী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘৮০০ রিয়াল বেতন খুবই কম। তবে বেতনের চেয়েও আমি বেশি উদ্বিগ্ন মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে। এ ক্ষেত্রে গৃহকর্মী পাঠানোর আগেই সেখানে দূতাবাসের শেল্টার হোম করা উচিত, যাতে কেউ বিপদে পড়লে আশ্রয় নিতে পারেন। এ ছাড়া দূতাবাসের উচিত নিয়মিত বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়া। এসব বিষয় নিশ্চিত না করে গৃহকর্মী পাঠানো ঠিক হবে না।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন