বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ধরন ও তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ফায়ার সার্ভিস বলছে, বেশির ভাগ অগ্নিকাণ্ডের কারণই বৈদ্যুতিক গোলযোগ। অর্থাৎ নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে সহজেই শর্টসার্কিট হয়ে আগুনের ঘটনা ঘটছে। আবাসিক ভবন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও এখন আগুন লাগার প্রধান কারণ এ রকম নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার। এসব প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগার আরেকটি বিশেষ কারণ হলো বিড়ি-সিগারেট ও রান্নার চুলা।

আগুন কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার সবশেষ উদাহরণ অভিযান–১০ লঞ্চ। ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান–১০ লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৪৫ জন। যারা বেঁচে আছেন তাঁরাও যুদ্ধ করছেন বাঁচার জন্য। যেমন দগ্ধ মা জেসমিন বেগমের (২৮) চিকিৎসা চলছে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। অগ্নিকাণ্ডে তাঁর ৭ বছরের মেয়ে মাহিনুর আক্তার মারা গেছে। ১১ বছর বয়সী আরেক ছেলে তামিম হোসেন গুরুতর অসুস্থ। গর্ভে থাকা ছয় মাসের সন্তানটিকেও বাঁচানো যায়নি।

গত ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস লিমিটেড কারখানায় ভয়াবহ অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটে। প্রায় ২০ ঘণ্টার ওই আগুনে পুড়ে মারা যান কারখানার ৫২ জন শ্রমিক। এই দুর্ঘটনার মাত্র ১২ দিন আগে রাজধানীর মগবাজারে গ্যাস বিস্ফোরণে মারা যান আরও ১২ জন।

default-image

ফায়ার সার্ভিসের তদন্তে অগ্নি দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার নানা বিষয় ওঠে এসেছে। অন্যতম একটি কারণ হলো অগ্নি দুর্ঘটনার বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব। এ ছাড়া ভবন তৈরিতে আইন অমান্য করাও একটি কারণ। ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল থাকায় দুর্ঘটনার সময় হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়।

আগুন লাগার পর তা ভয়াবহ হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে ফায়ার সার্ভিস বলছে, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা ও যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে আগুন সহজে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া ‘আগুন আর বাড়বে না, আমাদের এখানে ছড়াবে না’—এ জাতীয় অবহেলা ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনে।

অগ্নিকাণ্ড এপ্রিলে সবচেয়ে বেশি, জুলাইয়ে সবচেয়ে কম

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটেছে এ বছরের এপ্রিলে। ওই মাসে ২ হাজার ৮৬১ আগুনের ঘটনায় মারা যান প্রায় ১৫০ জন, আহত হয়েছেন ১ হাজার বেশি মানুষ। আর সবচেয়ে কম আগুনের ঘটনা ঘটেছে জুলাইয়ে। প্রাণহানি ছাড়াও এ বছর আগুনের ঘটনায় প্রায় ৩৩০ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রায় ১২৪ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করেছেন।

default-image

অগ্নিকাণ্ড ঢাকায় সবচেয়ে বেশি, বরিশালে কম

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, সবচেয়ে বেশি অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটে ঢাকা বিভাগে এবং সবচেয়ে কম বরিশাল বিভাগে। ঢাকা বিভাগের গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেশি থাকায় বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

আগুন প্রতিরোধের উপায়

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, আগুন যেন না লাগে সেই বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে অফিস-আদালত, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে খোলা আগুন ব্যবহার না করা; জ্বলন্ত সিগারেট, ম্যাচের কাঠি যেখানে-সেখানে না ফেলা। আবাসিক ভবন, অফিস-আদালত ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক তার ও সব ধরনের ইলেকট্রিক সরঞ্জাম নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। ত্রুটি পেলে সঙ্গে সঙ্গে মেরামতের ব্যবস্থা করা জরুরি। বৈদ্যুতিক আগুন নেভানোর জন্য পানি ব্যবহার করা যাবে না। আগুনের ঘটনা টের পেলে সঙ্গে সঙ্গে মেইন সুইচ বন্ধ করে দিতে হবে। এরপরও আগুন লাগলে দ্রুত নিকটবর্তী ফায়ার সার্ভিস কেন্দ্রে খবর দিতে হবে।

default-image

বাণিজ্যিক ভবনে দাহ্য পদার্থ রাখার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করার কথাও বলছে ফায়ার সার্ভিস। প্রতিটি বাণিজ্যিক ভবনে জরুরি সিঁড়ি বা ইমার্জেন্সি ফায়ার এক্সিট রাখতে হবে। ভবনের প্রতি তলায় নিয়মমাফিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা হাতের নাগালে রাখতে হবে। প্রত্যেক কর্মচারীকে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সম্পর্কে মৌলিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

২০০৬ সালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিএসইসি ভবনের ভয়াবহ আগুনের ঘটনার উদাহরণ টেনে ফায়ার সার্ভিস বলছে, আগুন লাগার পর ওই ভবনের ছাদে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন শতাধিক মানুষ। তাঁদের ছাদ থেকে নিরাপদে নামিয়ে এনেছিল ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তাঁরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের সেজান জুস কারখানার শ্রমিকেরা যদি ভবনের ছাদে যাওয়ার সুযোগ পেতেন তাহলে এমন করুণ মৃত্যু হতো না।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) দেবাশীষ বর্ধন প্রথম আলোকে বলেন, অগ্নিনির্বাপণের চেয়ে আগুন যাতে না লাগে সেদিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আইন মেনে ভবন নির্মাণ করলে ও যথাযথ অগ্নিপ্রতিরোধের ব্যবস্থা থাকলে দুর্ঘটনা কমে আসবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন