'আসামিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া উচিত'

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি নূর মোহাম্মদ
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি নূর মোহাম্মদ

অত্যন্ত গোপনীয়তায় একটি মামলার বিচার শুরু হয়েছিল ঢাকার কুর্মিটোলা সেনানিবাসের এক সুরক্ষিত কক্ষে। আজ থেকে ৪৯ বছর আগের ঠিক এই দিনে ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন তৎকালীন পাকিস্তান দণ্ডবিধির ১২১-ক ধারা এবং ১৩১ ধারায় শুরু হয়েছিল মামলার শুনানি। আসামি ৩৫ জন। এক নম্বর আসামি শেখ মুজিবুর রহমান। মামলাটি শুরু হয়েছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান গং’ নামে। পরে সরকারের নির্দেশে নাম বদলে আখ্যায়িত করা হয় ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ হিসেবে।

ঐতিহাসিক এই মামলাটির পাঁচ নম্বর আসামি তৎকালীন নৌবাহিনীর সিডিআই নূর মোহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, আগরতলা মামলা ছিল ঐতিহাসিক সত্য। অনেক দিন থেকেই তাঁরা এ কথা বলে আসছেন। যাঁরা এই মামলার আসামি ছিলেন, তাঁদের সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত (এই মামলাটি যে সত্য ছিল, সে দাবি করেছেন অনেকে। কর্নেল শওকত আলী এ নিয়ে বই লিখেছেন। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বইটির নাম সত্য মামলা আগরতলা)।

নূর মোহাম্মদ এখন অশীতিপর। বিক্রমপুরের লৌহজং থানার কুমারভোগ গ্রামে তাঁর জন্ম ১৯৩৪ সালে। বাবার ব্যবসার সুবাদে কৈশোরেই তিনি ফরিদপুরে চলে আসেন। ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট মহল্লার এক নম্বর সড়কে গাছগাছালি শোভিত তাঁর বাড়ি। সেখানেই ৪ জুন কথা হয় দেশের ইতিহাসের এক অন্যতম ঘটনা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি এবং পরে মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার নূর মোহাম্মদের সঙ্গে। গৌরবর্ণ দীর্ঘদেহী মানুষটি এখনো যথেষ্ট শক্ত-সামর্থ্য। এখন মগ্ন বাড়ির ছাদে মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন নিয়ে একটি ব্যক্তিগত জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কাজে।

নূর মোহাম্মদ বিস্তারিত স্মৃতিচারণা করলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায় তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। পাকিস্তান সরকার ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান, সামরিক বাহিনীর সাবেক ও কর্মরত সদস্য, পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের নামে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা করে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভারতের সহায়তায় এই ষড়যন্ত্র হচ্ছে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় এ নিয়ে উভয় পক্ষের বৈঠক হয়েছে। তাই একে বলা হয়েছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা।

পাকিস্তান নৌবাহিনীতে নূর মোহাম্মদ যোগ দিয়েছিলেন ১৯৫২ সালে। তিনি বলেন, ‘তখন করাচির নেভাল বেইজে রণতরিতে শুয়ে শুয়ে হয়তো কোনো একদিন স্বাধীন হয়ে যাব, এই স্বপ্নে বিভোর হয়ে যেতাম। গোপনে গোপনে সমমনাদের খুঁজতে থাকি।’ ১৯৬৪ সালে তিনি ও নৌবাহিনীর লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, সিডিআই সুলতান উদ্দিন আহমেদ, স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান ও লে. মোজাম্মেল হক নিজেদের ভেতরে গোপন শপথ করে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের জন্য ঐক্যবদ্ধ হন।

সুলতান উদ্দিন আহমেদ (৪ নম্বর আসামি) বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ করেন। পরে নূর মোহাম্মদরা পাঁচজন শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি সব কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনে বলেছিলেন, ‘আমার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও বাংলার স্বাধীনতার প্রশ্নে আমি আপনাদের সঙ্গে থাকব। আমার পূর্ণ সাহায্য-সহযোগিতা আপনারা পাবেন।’ পরে তাঁরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেন।

‘আমি গ্রেপ্তার হই ১৯৬৮ সালের ২ জানুয়ারি। ভেবেছিলাম কোর্ট মার্শাল হবে। সাধারণত তা-ই হওয়ার কথা। নির্ঘাত মৃত্যুদণ্ড। বেঁচে থাকার কথা ভাবিনি,’ বলছিলেন নূর মোহাম্মদ। যুদ্ধের শুরুতেই তিনি আগরতলা ও মোলাড় চলে যান। পরে লৌহজং থানা থেকে ১০টি রাইফেল নিয়ে ৩০০ যুবককে প্রশিক্ষণ দেন। তাঁদের নিয়ে ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর জলিলের কাছে চলে যান। কমান্ডার তাঁকে সাব-সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব দেন।

নূর মোহাম্মদকে সবাই ডাকেন ‘ক্যাপ্টেন’ বলে। সলাজ হেসে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর নেতৃত্বে মুগ্ধ হয়ে মেজর জলিল তাঁকে ক্যাপ্টেন বলে সম্বোধন করতেন। সেই থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে মুখে তিনি ক্যাপ্টেন নূর মোহাম্মদ বলেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। লোকে এখনো তাঁর ক্যাপ্টেন পরিচয়টি মনে রেখেছেন।